ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু আলোচনা: চুক্তি কি হাতের নাগালে?

২ দিন আগে
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমানের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের তৃতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় সকালে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় বৈঠকে বসেছেন উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা।

ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস। বৈঠকগুলো হচ্ছে ওমানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে উপস্থিত আছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনার।

 

ইরানের পক্ষের বক্তব্য, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি চুক্তি এখনও ‘সম্ভব’। এই সম্ভাবনা নির্ভর করছে, ওয়াশিংটন পূর্ববর্তী গোপন আলোচনায় স্থাপন করা শর্তগুলোর প্রতি অনুগত থাকায়, বলে পশ্চিমা মিডিয়াকে জানিয়েছেন আব্বাস আরাঘচি।

 

‘বড় সমস্যা’: ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় দ্বন্দ্ব

 

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির প্রসঙ্গ বাদ দেয়াকে ‘বড় সমস্যা’ হিসেবে দেখাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডে ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত নতুন ইরান–যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ আলোচনার লক্ষ্য হলো নতুন সংঘর্ষ এড়িয়ে চুক্তি করা এবং কয়েক সপ্তাহের হুমকিকে সমাপ্ত করা।

 

জেনেভা বৈঠকের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সতর্ক করেন যে, ক্ষেপণাস্ত্র বিষয় বাদ দিলে এটি ‘বড় সমস্যা’ তৈরি করবে এবং তা সরাসরি তেহরানের শর্তের সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করবে।

 

আরও পড়ুন: জেনেভায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষ আলোচনা শুরু

 

যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে ২০০৩ সালের পর সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি মোতায়েন করছে, যাকে অনেকেই ‘সামরিক ভুল হিসাব’ হিসেবে অভিহিত করছে, যা বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘর্ষের কারণ হতে পারে। ট্রাম্প বারবার হুমকি দিচ্ছেন যে, চুক্তি না হলে ইরানকে আঘাত করা হবে।

 

তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে তিনি ইরানকে ‘অশুভ পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা অনুসরণ করছে’ বলে অভিযুক্ত করেছেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেছেন, তেহরান ইতিমধ্যেই এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে যা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশে থাকা ঘাঁটিগুলোকে হুমকি দিতে সক্ষম, এবং শীঘ্রই এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে যা যুক্তরাষ্ট্রকেও পৌঁছাবে।ৎ

 

ইরানের ৩ মূল নীতি

 

ইরানি কর্মকর্তারা বলে আসছেন, চুক্তি তিনটি মূল নীতির ওপর নির্ভরশীল করছে:

এক. শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ইরানের অধিকার স্বীকৃতি দেয়া।

দুই. অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদকে পুরোপুরি ধ্বংস না করে হ্রাস বা পাতলা করার অনুমতি।

তিন. ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আলোচনার বাইরে রাখা।

 

কূটনীতিকরা বলছেন, এই ‘অমীমাংসিত’ নীতিগুলো ইরানের মূল স্বার্থকে সুরক্ষার জন্য। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ইরান জানায়, ওমানের মধ্যস্থতায় প্রথম জেনেভা বৈঠকে তারা ‘অগ্রগতি’ অর্জন করেছে এবং পারমাণবিক বিরোধ সমাধানের লক্ষ্যে একমত হয়েছে।

 

আব্বাস আরাঘচি বলেন, পরোক্ষ আলোচনাগুলো ‘গঠনমূলক’ ছিল এবং এখন উভয় পক্ষ তৃতীয় রাউন্ডের আগে বিনিময়ের জন্য চুক্তিপত্র খসড়া করবে। তবে ট্রাম্পের অবস্থান অস্পষ্টই থেকে যায়। 

 

আরও পড়ুন: ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে ইসরাইলে ১২ মার্কিন যুদ্ধবিমান

 

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান ইরানি সূত্রের বরাতে জানায়, আগের পরোক্ষ আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ৫ শতাংশের নিচে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সম্মতি জানান। এই মাত্রা ২০১৫ সালের চুক্তিতে বেসামরিক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত সীমার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অস্ত্রমানের কাছাকাছি নয়।

 

সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচকরা কিছুটা বিস্মিত হন যখন জারেড কুশনার ও উইটকফ আলোচনার শুরুতেই তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেন। তাদের প্রস্তাবের কেন্দ্রে ছিল ৫ শতাংশের নিচে সমৃদ্ধকরণের সীমা বজায় রাখা এবং কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ বেসামরিক কাঠামোয় পুনর্বিন্যাস করা।

 

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের প্রশ্নে অনিশ্চয়তা

 

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে এখনও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো শিথিলতা এলেও তা ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।

 

বৈঠকে যাওয়ার আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার অধিকার থেকেও সরে আসবে না। তার ভাষায়, কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিলে চুক্তি সম্ভব।

 

মার্কিন গণমাধ্যম বিষয়টিকে ট্রাম্পের জন্য এক ধরনের পরীক্ষার মুহূর্ত হিসেবে দেখছে। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের বিপরীতে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের পারমাণবিক ইস্যুতে মনোযোগ আলাদা করে আলোচিত হচ্ছে।

 

বিশ্লেষকেরা ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির সঙ্গে মিল খুঁজছেন। ওই চুক্তিতে ইরান ও পি৫+১ দেশগুলো সমঝোতায় পৌঁছেছিল। তবে দ্রুত নিষেধাজ্ঞা শিথিল না হলে তেহরান পুরোপুরি রাজি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে যাচাই ও তদারকি নিয়ে সম্ভাব্য আপত্তির কথাও সামনে আসছে।

 

আরও পড়ুন: ইরান কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না: আরাঘচি

 

ব্রিটিশ গণমাধ্যম সতর্ক করছে, ভুল পদক্ষেপ বড় সংকট ডেকে আনতে পারে। তারা ২০১৫ সালের চুক্তির মতো সীমাবদ্ধতাকে সময় কিনে নেওয়ার উপায় হিসেবে দেখছে, যাতে বিস্তার রোধ করা যায়।

 

একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যু বাদ পড়লে নিরাপত্তায় ফাঁক তৈরি হতে পারে বলেও আলোচনা হচ্ছে। ইউরোপ পরিস্থিতি শান্ত করে বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার দিকেও নজর রাখছে।

 

নতুন নিষেধাজ্ঞা: তেলের বাণিজ্য ও অস্ত্র নেটওয়ার্কে চাপ

 

বুধবার যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল বাণিজ্য ও অস্ত্র সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ককে লক্ষ্য করে আরেক দফা নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটন একে তাদের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ কৌশলের অংশ বলছে।

 

মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই পদক্ষেপে ৩০টির বেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, তারা অবৈধভাবে ইরানি পেট্রোলিয়াম বিক্রিতে সহায়তা করেছে এবং তেহরানের অস্ত্র কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়েছে।

 

বিশেষভাবে নজর দেয়া হয়েছে ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই জাহাজগুলো গোপনে ইরানি তেল বিদেশি বাজারে পৌঁছে দেয়, যাতে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রফতানি অব্যাহত রাখা যায়। তথ্যসূত্র: গাল্ফ নিউজ। 

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন