তেহরান ওয়াশিংটনের দেওয়া ১৫ দফার একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর এই বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসছে।
গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তেহরানও এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। তারা জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সেনাদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তারা।
আসলে কী ঘটেছে? এই ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালী’ আসলে কী, যা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে ইরান? আর এমন পদক্ষেপ নিলে তার ফলাফলই বা কী হতে পারে?
আসলে কী ঘটেছে?
ইরান বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে নৌযান চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরানের একটি সামরিক সূত্র সতর্ক করে জানিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের ‘খার্গ দ্বীপ’ বা অন্য কোনো ভূখণ্ডের ওপর অভিযান চালায়, তবে এর জবাবে বাব আল-মান্দেব প্রণালীসহ বিভিন্ন এলাকা অবরুদ্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
বুধবার (২৫ মার্চ) ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ এজেন্সি’ এই সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ‘‘শত্রুপক্ষ যদি ইরানের কোনো দ্বীপ বা ভূখণ্ডের কোনো অংশে স্থল অভিযানের চেষ্টা করে, কিংবা পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে নৌ-তৎপরতার মাধ্যমে ইরানের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালায়, তবে আমরা ‘সারপ্রাইজ’ বা চমক হিসেবে নতুন সব রণক্ষেত্র খুলে দেব।’’
সূত্রটি বিশেষভাবে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কথা উল্লেখ করেছে। সেখানে আরও বলা হয়,
আমেরিকানরা যদি হরমুজ প্রণালী নিয়ে কোনো অবিবেচকের মতো কাজ করতে চায়, তবে তাদের সতর্ক হওয়া উচিত যেন তাদের চ্যালেঞ্জের তালিকায় নতুন আরেকটি প্রণালী যুক্ত না হয়।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের একটি সতর্কবার্তার পর এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, তেহরানের কাছে তথ্য আছে যে তাদের ‘শত্রুরা’ আঞ্চলিক কোনো দেশের সহায়তায় ইরানের একটি দ্বীপ দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘‘আমাদের বাহিনী শত্রুদের সমস্ত গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে। তারা যদি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে সংশ্লিষ্ট ওই আঞ্চলিক রাষ্ট্রের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আমরা অবিরাম এবং কঠোর হামলা চালাবো।’’
তিনি আঞ্চলিক দেশটি বলতে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ইঙ্গিত করেছেন বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।
আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধ কি শেষের পথে?

বাব আল-মান্দেব প্রণালী কী?
হরমুজ প্রণালীর মতোই বাব আল-মান্দেবও একটি সরু সামুদ্রিক পথ। আরবরা একে 'গেটস অফ টিয়ার্স' বা 'অশ্রুধার' বলা হয়। এই প্রণালীটি এর সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া।
বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর এবং আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। এটি ইয়েমেন এবং হর্ন অব আফ্রিকা খ্যাত দেশ জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। হরমুজ প্রণালীর মতো এটিও বিশ্ববাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট। এটি মূলত ইউরোপ, আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়াকে একে অপরের সাথে যুক্ত করে।
সিএনএন-এর তথ্যমতে, বিশ্বে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ তেল বাণিজ্য হয় তার প্রায় ১২ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বড় অংশ প্রতি বছর এই বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে পার হয়। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই রুট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৮ লাখ ব্যারেল তেল এবং বিশাল পরিমাণ এলএনজি পরিবাহিত হয়েছে। এছাড়া সুয়েজ খালের দিকে যাওয়া জাহাজগুলোর জন্যও এটি একটি প্রধান প্রবেশপথ।
লোহিত সাগরের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১২০ লাখ কোটি টাকারও বেশি) মূল্যের পণ্য আদান-প্রদান হয়। এই অঞ্চলে ইরানের অন্যতম প্রধান মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা গাজা যুদ্ধের সময় থেকেই লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলা শুরু করে। ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা এখন পর্যন্ত শতাধিকবার এ ধরনের হামলা চালিয়েছে।
আরও পড়ুন: ঝাঁকে ঝাঁকে কামিকাজে: ইরানের সস্তা অস্ত্র বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের বাস্তবতা
‘দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র তথ্যমতে, আমেরিকা এবং ইউরোপীয় দেশগুলো জাহাজগুলোকে সুরক্ষার চেষ্টা করলেও হুতিরা লোহিত সাগরে চারটি জাহাজ ডুবিয়ে দিতে সক্ষম হয়।
নৌ-বিশ্লেষক জশুয়া ট্যালিস এই পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘এটি ছিল (হুতিদের জন্য) একটি কৌশলগত ও অপারেশনাল বিজয় এবং এটি যদি কৌশলগত পরাজয় নাও হয়, তবে অন্তত একটি কৌশলগত ড্র বা অমীমাংসিত অবস্থা।’’
ইতিমধেই অনেক শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগরের এই রুটটি এড়িয়ে চলছে। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশেষজ্ঞরা হুথিদের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখছেন। তাদের মতে, হুতিরা পূর্ণশক্তিতে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার।
ইয়েমেনের হুতিদের জব্দ করা বাণিজ্যিক জাহাজ গ্যালাক্সি লিডারের ডেকে মানুষ নাচছে। স্থান: ইয়েমেনের আল-সালিফ উপকূল, ৫ ডিসেম্বর ২০২৩। ছবি: রয়টার্স
বাব-আল মান্দেব বন্ধ করলে কী হতে পারে?
হরমুজ প্রণালীর মতো যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালীও যাতায়াতের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তবে জাহাজগুলোকে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ হয়ে অনেক দীর্ঘ পথ ঘুরে আসতে হবে। এর ফলে যে পথ পাড়ি দিতে ২০ থেকে ২৫ দিন সময় লাগত, তা বেড়ে ৩০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই এতে জাহাজ ভাড়া বা শিপিং খরচ অনেক বেড়ে যাবে, যার প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম আরও আকাশচুম্বী হবে।
গত ১ মার্চের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই রুটটি অনিরাপদ হয়ে ওঠার আশঙ্কায় শিপিং জায়ান্ট ‘মার্সক’ ইতিমধ্যেই লোহিত সাগর দিয়ে তাদের কিছু জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।
ডেনমার্কের কন্টেইনার শিপিং গ্রুপ মার্সক জানিয়েছে, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আমরা আপাতত বাব আল-মান্দেব প্রণালী হয়ে সুয়েজ খালের দিকে আমাদের পরবর্তী যাত্রাগুলো স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এরই প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। বাব-আল মান্দেব বন্ধ হয়ে গেলে দাম আরও বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
আরও পড়ুন: শীর্ষ নেতাদের হত্যার পরও যুদ্ধের ময়দানে কীভাবে টিকে আছে ইরান
ইন্ডিয়া টুডের বরাতে লেবানিজ-অস্ট্রেলিয়ান পডকাস্ট হোস্ট মারিও নফাল হুথিদের এই হুমকির প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন,
যুদ্ধটা আরও বড় এবং আরও কুৎসিত রূপ নিতে যাচ্ছে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘‘হুতিরা যদি ইরানের সাথে পূর্ণ সামরিক জোটে যোগ দেয় এবং আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ (বাব আল-মান্দেব) বন্ধ করে দেয়, তবে লোহিত সাগর সম্পূর্ণ একটি ‘নো-গো জোন’ বা নিষিদ্ধ এলাকায় পরিণত হবে। এতে তেলের দাম আবারও আকাশচুম্বী হবে এবং বিশ্ববাণিজ্য আরও মারাত্মকভাবে থমকে যাবে’’
তিউনিসের কলাম্বিয়া গ্লোবাল সেন্টারের পরিচালক ইউসেফ শেরিফ মনে করেন, হুথিদের এই বাব আল-মান্দেব অবরোধের হুমকি মূলত ইরানের ‘তিন ধাপের’ একটি কৌশলের অংশ।
তিনি এক্স-এ ব্যাখ্যা করেছেন,
প্রথমত, ইরানের হামলার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, লেবাননে হামলার মাধ্যমে ইসরাইলকে অন্যমনস্ক রাখা। আর এর পরের ধাপেই আসবে হুতিরা, যারা বাব আল-মান্দেব অবরুদ্ধ করে দেবে।
তবে সবকিছুর পরেও, বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব হরমুজ প্রণালীর সাথে তুলনীয় নয়। কারণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। কুয়েত পেট্রোলিয়ামের সিইও শেখ নাওয়াফ সৌদ আল-সাবাহ যেমনটা বলেছেন, "হরমুজ প্রণালীর কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক আইন এবং বাস্তব প্রেক্ষাপট, উভয় দিক থেকেই এটি বিশ্বের প্রধানতম জলপথ।"
সোর্স: ফাস্টপোস্ট
]]>
৪ সপ্তাহ আগে
৮








Bengali (BD) ·
English (US) ·