হলফনামা সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ বিএনপি প্রার্থীর সম্পদ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ প্রার্থী লাখপতি হলেও কয়েকটি আসনে তাদের মধ্যেও কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন। তবে উভয় দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক কম দামে জমি, ফ্ল্যাট ও স্বর্ণের মূল্য ঘোষণাসহ নানা অসঙ্গতি দেখা গেছে। একাধিক প্রার্থীর স্ত্রী গৃহিনী বা আয়ের কোনো উৎস না থাকলেও তাদের নামে কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী–তানোর):
এ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দিন কোটিপতি। হলফনামা অনুযায়ী তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ২৪ লাখ ২ হাজার ৫৪৭ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ২ কোটি ৬৮ লাখ ২৭ হাজার ৯৭১ টাকা। তার হাতে নগদ রয়েছে ২১ লাখ ৮৩ হাজার ৭২৫ টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকে জমা রয়েছে প্রায় ৪৬ লাখ টাকা। স্থায়ী আমানত রয়েছে ৩০ লাখ টাকা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ ১৪ লাখ ৭ হাজার টাকা। তিনি সাড়ে ১৩ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ির মালিক।
তবে তার ঘোষিত স্থাবর সম্পদের মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকার মীরপুরে ১০ কাঠা জমির মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৪০ লাখ টাকা। বনানীতে ৩ কাঠার বাড়ির মূল্য দেখানো হয়েছে ২৫ লাখ টাকা এবং মীরপুরে ৪ কাঠার একটি বাড়ির মূল্য (অর্জনকালীন) মাত্র সাড়ে ৪ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে ৬ আসনে ৩৮টি মনোনয়নের ১৮টি বাতিল, স্থগিত ১
তার স্ত্রী হেলালুন নাহার গৃহিনী হলেও তার নামে ৪০ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত রয়েছে। আয়ের কোনো উৎস উল্লেখ না থাকলেও স্ত্রীর মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। এছাড়া তিনি উপহার হিসেবে ৮৮ ভরি স্বর্ণ পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করেছেন।
অপরদিকে একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মো. মুজিবুর রহমান লাখপতি। হলফনামা অনুযায়ী তার বার্ষিক আয় ৬ লাখ ২ হাজার ৬৮৪ টাকা। রাজনীতি ও বই বিক্রির রয়্যালটি তার আয়ের উৎস। তার মোট সম্পত্তি ৩৬ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৩ টাকা। তার হাতে নগদ রয়েছে ৩১ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬১ টাকা, তবে ব্যাংকে জমা আছে মাত্র ৮ হাজার ৯১৯ টাকা। তার গৃহিনী স্ত্রীর নামে রয়েছে ১০ ভরি স্বর্ণ ও আড়াই লাখ টাকার সম্পদ।
এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. সুলতানুল ইসলাম (তারেক) কোটিপতি। তার বার্ষিক আয় ৫৪ লাখ ৮৪ হাজার ৬০১ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ৫ কোটি ১৭ লাখ ৯৩ হাজার ৮৮ টাকা। তার স্ত্রী ও সন্তানের নামেও কোটি টাকার সম্পদের তথ্য রয়েছে।
রাজশাহী-২ (সদর):
এ আসনে বিএনপি প্রার্থী মো. মিজানুর রহমানের বার্ষিক আয় ৮ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ৯৬ লাখ ৬২ হাজার ৮৭৫ টাকা। তবে তার স্ত্রী সালমা শাহাদত কোটিপতি। স্ত্রীর বার্ষিক আয় ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫২১ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ১ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার ২৩৩ টাকা।
হলফনামায় স্বর্ণ ও স্থাবর সম্পদের মূল্য ঘোষণায় বড় অসঙ্গতি দেখা গেছে। মিনুর নিজের নামে থাকা ১০০ ভরি স্বর্ণের মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা এবং স্ত্রীর ৫০ ভরি স্বর্ণের মূল্য দেখানো হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। পাঁচটি ফ্ল্যাটের মূল্য (অর্জনকালীন) দেখানো হয়েছে মাত্র ৪২ হাজার ৬০০ টাকা।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর কোটিপতি। তার বার্ষিক আয় ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬৯ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ২ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৭৭ টাকা। তার নামে তিনতলা ভবনের মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, যা বাজারমূল্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
রাজশাহী-৩ (পবা–মোহনপুর):
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলনের বার্ষিক আয় ২১ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৩ টাকা। তার মোট সম্পত্তি ১ কোটি ৪৬ লাখ ৪৩ হাজার ২৫১ টাকা। তার স্ত্রীর আয় ১৮ লাখ ৮ হাজার ২৭৪ টাকা এবং সম্পদ ১ কোটি ২৮ লাখ ৪০ হাজার ৪২ টাকা। স্ত্রীর নামে ২৫ ভরি স্বর্ণের মূল্য (অর্জনকালীন) দেখানো হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
আরও পড়ুন: রাজশাহীর দুই আসনে ৬ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল
জামায়াতের প্রার্থী মো. আবুল কালাম আজাদের বার্ষিক আয় ৭ লাখ ১০ হাজার টাকা। তার মোট সম্পত্তি ৪১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮০ টাকা। তবে তার হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে—তিনি ২ কোটি টাকার এবং তার স্ত্রী ৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদের মালিক, যা ঘোষিত আয়ের তুলনায় প্রশ্ন তুলছে।
রাজশাহী-৪ ( বাগমারা)
এ আসনে বিএনপি প্রার্থী ডিএমডি জিয়াউর রহমানের বার্ষিক আয় ১৪ লাখ ৭৬ হাজার ৫০২ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার ৫৮ টাকা। তার স্ত্রীর সম্পদ ২৯ লাখ ৭১ হাজার ২২৮ টাকা।
জামায়াতের মো. আব্দুল বারী সরদার কোটিপতি। তার বার্ষিক আয় ১৮ লাখ ৯ হাজার ৫৭৯ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ২ কোটি ৭৮ লাখ ৮৮ হাজার ৫৮৪ টাকা।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর)
এ আসনে বিএনপির অধ্যাপক নজরুল ইসলামের বার্ষিক আয় ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং মোট সম্পত্তি ১ কোটি ৩১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর সম্পত্তির পরিমাণ ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮৯ হাজার ১৬ টাকা।
জামায়াতের মনজুর রহমানের বার্ষিক আয় ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং মোট সম্পত্তি ৫৫ লাখ ২৮ হাজার ৯৭৬ টাকা।
রাজশাহী-৬ (বাঘা–চারঘাট):
এ আসনে বিএনপির মো. আবু সাইদ চাঁদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং মোট সম্পত্তি ৩২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। জামায়াতের মো. নাজমুল হকের বার্ষিক আয় ১০ লাখ ১ হাজার ৪৯৯ টাকা এবং মোট সম্পত্তি ২৯ লাখ ৯৬ হাজার ৯৯২ টাকা।
নির্বাচনী হলফনামা প্রার্থীদের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তবে ঘোষিত আয় ও সম্পদের মধ্যে এ ধরনের বড় অসঙ্গতি ভোটারদের মধ্যে প্রশ্ন সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত এসব হলফনামা আরও কঠোরভাবে যাচাই করা।
এ বিষয়ে প্রার্থীরা দাবি করেছেন, হলফনামায় দেওয়া সব তথ্য আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী সঠিকভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে এবং কোনো তথ্য গোপন করা হয়নি।

১ সপ্তাহে আগে
৬








Bengali (BD) ·
English (US) ·