আলোচনায় ইরানের অবস্থান কি আগের চেয়ে শক্তিশালী?

৪ সপ্তাহ আগে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েকদিন ধরে বলে আসছেন, ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চালাচ্ছে। তবে প্রকাশ্যে ইরানি কর্মকর্তারা ট্রাম্পের এই দাবি নাকচ করেন এবং এটিকে ‘ফেক নিউজ’ বলে আখ্যা দেন। ট্রাম্প মূলত তেলের দাম কমানোর উদ্দেশ্যে এই দাবি করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তারা।

তবে পর্দার আড়ালে কয়েকটি মধ্যস্থতাকারী দেশ—যেমন মিশর, তুরস্ক ও পাকিস্তান—মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের চ্যানেল স্থাপন করেছে, যা আল জাজিরার দুটি জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

 

তবে এমন ছোট একটি কূটনৈতিক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক এবং সন্দীহান। কারণ যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষগুলোর অবস্থান এখনও অনেক দূরে এবং তাদের দাবির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর যৌথভাবে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। ওইদিন দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কী ধরনের ছাড় আদায় করা হবে, সে বিষয়ে ইরানি নেতৃত্বের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল জোর দিয়ে বলছে যে, গত প্রায় চার সপ্তাহ ধরে তাদের অবিরাম হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ‘ক্ষুণ্ণ’ করেছে। পেন্টাগনের মতে, ইরানের ৯০ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু ইরান দেখিয়েছে যে, তারা চাইলে এখনও নির্ভুলভাবে গোলাবর্ষণ করতে পারে।

 

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা: উভয় পক্ষের দাবিগুলো কী, চুক্তি কি সম্ভব?

 

হরমুজ প্রণালীতে – যে জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল রফতানির এক-পঞ্চমাংশ যায় – শত শত জাহাজ এখনও অচল হয়ে আছে। এবং সমগ্র অঞ্চলজুড়ে ইরান প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে এবং যেকোনো হুমকির পর পাল্টা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি গ্রহণ করেছে।

 

গত সপ্তাহেই ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলি হামলার পরপরই ইরানি বাহিনী কাতারের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালায়, যা দেশটির রফতানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

 

ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার পর দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর আরাদ ও দিমোনায় আঘাত হানে এবং এতে ১৮০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের লক্ষ্য এখন শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, বরং এমন একটি যুদ্ধোত্তর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যা প্রতিরোধ ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে।

 

ইরানের নতুন শর্তসমূহ

 

ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বলেছেন যে, তারা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের অর্থ, ইরান আর আক্রান্ত হবে না এমন দৃঢ় নিশ্চয়তা এবং হরমুজ প্রণালীতে যাতায়াতের জন্য একটি নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো চান।

 

ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, তেহরান নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি, ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের পাশাপাশি নিজেদের শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে চাইবে।

 

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব হাতে পাওয়ার কথা জানালো ইরান

 

মোর্তাজাভি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালীর ওপর এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি এখন তাদের মাথায় নতুন ধারণা দিচ্ছে – ‘হয়তো আমরা বিশ্বের অন্য কিছু জায়গার মতো যাতায়াতের জন্য মাশুল নিতে পারি’ – ইরানে এ নিয়ে আলোচনা চলছে।’

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় ধরনের ছাড় ছাড়া ইরান এই সুবিধা ছেড়ে দেবে না। বিষয়টি বিশেষভাবে সত্য, কারণ ইরান মনে করে যে, এই যুদ্ধ তাদের এমন কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে সাহায্য করেছে যা তারা কূটনীতির মাধ্যমে পায়নি। তেলের দাম কমানোর প্রচেষ্টায় গত শুক্রবার (২০ মার্চ) ট্রাম্প প্রশাসন সমুদ্রপথে ১৪ কোটি ব্যারেল ইরানি তেল কেনার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র কী চায়?

 

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার ন্যায্যতা প্রমাণ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো- তেহরানকে পারমাণবিক বোমা অর্জন থেকে বিরত রাখা – যদিও গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধের সময় তিনি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার দাবি করেছিলেন।

 

গত সোমবার (২৩ মার্চ) ট্রাম্প বলেন, তিনি এখনও চান ইরান যেন পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি মানের ৪০০ কেজিরও বেশি ইউরেনিয়াম ত্যাগ করে। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে এই মজুত চাপা পড়ে আছে।

 

আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিলো পাকিস্তান

 

অতীতে যুক্তরাষ্ট্র আরও দাবি করেছিল, তেহরান যেন তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ভেঙে দেয় এবং এই অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করা বন্ধ করে। আল জাজিরাকে দেয়া দুটি সূত্রের মধ্যে একটির মতে, ওয়াশিংটন এখন প্রস্তাব দিয়েছে যে, ইরান যেন তার অস্ত্রাগারে ১ হাজার কিলোমিটারের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাখে, যা আগের দাবিগুলোর তুলনায় একটি পরিবর্তন।

 

কিন্তু যেকোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি ইরানের পক্ষ থেকে আস্থার সম্পূর্ণ অভাবের মধ্যেই হতে হবে। ট্রাম্প তার দূতরা ইরানি প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করার সময় দুইবার ইরানে বোমা হামলা চালিয়েছেন – একবার জুন ২০২৫ সালে এবং আরেকবার চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে– এবং তিনি বারবার বলেছেন যে, তার লক্ষ্য হলো শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন।

 

ইরানের আলোচকদের নিয়ে প্রশ্ন

 

মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় আলি লারিজানির (ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান) মতো ইরানের নেতৃত্বের বিশিষ্ট সদস্যরা নিহত হওয়ার পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আলোচনার দায়িত্বে ইরানের কে থাকবেন, তা-ও স্পষ্ট নয়। উল্লেখ্য, লারিজানিই ছিলেন অন্যান্য দেশের অনেক মধ্যস্থতাকারীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী।

 

গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) ইরান মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদরকে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ করেছে। যুলঘাদর ইরানের সামরিক বাহিনীর বিশেষ শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) একজন সাবেক কমান্ডার এবং ২০২৩ সাল থেকে উপদেষ্টা পরিষদ এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সচিব ছিলেন।

 

ইরান-বিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বাবাক ভাহদাদ বলেছেন, তার এই নিয়োগ ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের যেকোনো আলোচনা আইআরজিসি-র হুমকি উপলব্ধি এবং অগ্রাধিকারের সাথে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত হতে চলেছে। ভাহদাদের কথায়, ‘স্পষ্ট করে বললে: এটাকে আপোসের জন্য প্রস্তুত একটি ব্যবস্থার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত পরিচালনার জন্য প্রস্তুত একটি ব্যবস্থার মতো বেশি মনে হচ্ছে।’

 

কিছু বিশেষজ্ঞ যুক্তি দিয়েছেন যে, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের ওপর হামলা স্থগিত করার পেছনে ট্রাম্পের উদ্দেশ্য ছিল তেলের দাম কমানো, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মার্কিন মেরিন সেনা পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষা করাও অন্যতম উদ্দেশ্য।

 

আরও পড়ুন: মার্কিন সেনারা নেতানিয়াহুর বিভ্রমের শিকার হবে: ইরানের স্পিকার

 

গত সপ্তাহে একটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজসহ ২ হাজা ৫০০ মেরিন সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন জাপান-ভিত্তিক ইউএসএস ত্রিপোলি নামক আরেকটি উভচর আক্রমণকারী জাহাজ মোতায়েনের নির্দেশ দেয়, যেটাতে আরও কয়েক হাজার মেরিন সেনা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

স্থলে অভিযানের জন্য সেনা পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন কি না, সে বিষয়ে ট্রাম্প অস্পষ্ট বা নিরুত্তর থেকেছেন। এ থেকে এটা স্পষ্ট যে, তিনি উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলের বিষয়টি বিবেচনা করছেন, যেখান থেকে ইরানের ৯০ শতাংশ তেল রফতানি করা হয়।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহ বলেন, ‘কূটনৈতিক আলোচনা এক জিনিস; আর আমি বাস্তবে যা দেখছি তা অন্য জিনিস।’ 

 

আবদুল্লাহ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদাররা এমন কোনো পরিস্থিতি কখনোই মেনে নেবে না যেখানে ইরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে – যা অদূর ভবিষ্যতে উপসাগরীয় জ্বালানি রফতানিতে ইরানকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে।

 

আরও পড়ুন: যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরাইলকে ইরানের কঠোর ৫ শর্ত

 

আর যেহেতু তেহরান প্রণালীটির ওপর থেকে তার প্রভাব ছাড়বে এমন সম্ভাবনা কম, তাই কূটনৈতিক সমাধানও খুব কমই অবশিষ্ট আছে: ‘এটি পুনরুদ্ধার করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব, এবং তা করার একটিই উপায় আছে, সামরিক উপায়,’ বলেন আবদুল্লাহ। 

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন