৬ বছরে হাঁটতে শেখা, এরপর ২ যুগ ধরে অবিরাম দৌড়াচ্ছেন শাহিন

২ দিন আগে
জন্মের পর সাধারণ শিশুরা এক-দেড় বছরের মধ্যেই হাঁটতে শেখে। কিন্তু শাহিন আলীর লেগেছিল দীর্ঘ ছয় বছর। তবে একবার যখন তিনি হাঁটতে শিখলেন, তখন যেন হাঁটার কথা ভুলেই গেলেন; শুরু করলেন দৌড়। সেই যে দৌড় শুরু হয়েছে, গত ২৪ বছরে তাতে এক মুহূর্তের জন্যও ছেদ পড়েনি। হাতে নিজের তৈরি একটি বিয়ারিংয়ের গাড়ি আর বিরামহীন পা- এই নিয়েই চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান ৩০ বছর বয়সী এই 'অদম্য দৌড়বিদ'।

মানসিক ও বাক্‌প্রতিবন্ধী শাহিন আলীর বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কসবা ইউনিয়নের মহিষপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের হতদরিদ্র ভূমিহীন কৃষক তৈবুর রহমানের বড় ছেলে। স্থানীয়দের কাছে শাহিন এক বিস্ময়ের নাম। রোদ-বৃষ্টি কিংবা হাড়কাঁপানো শীত, কোনো কিছুই তার এই গতিরোধ করতে পারে না।


বিয়ারিং গাড়িই তার প্রাণ শাহিনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী কাঠ ও লোহা দিয়ে নিজের হাতে তৈরি একটি বিয়ারিংয়ের গাড়ি। স্থানীয়রা জানান, শাহিন অন্য আর দশজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের মতো অস্বাভাবিক আচরণ করেন না। কারও সঙ্গে ঝগড়া বা মাতলামিও করেন না। তবে তার সব আবেগ যেন মিশে আছে ওই ছোট্ট গাড়িটিতে।


গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি আমিরুল আলম বলেন, 'শাহিনের কাছ থেকে সব টাকা নিয়ে নিলেও সে কিছু বলে না, কিন্তু বিয়ারিংয়ের গাড়িতে হাত দেওয়া যাবে না। এটাই তাঁর জান-প্রাণ। এমনকি খেতে বসলেও গাড়ির দড়ি আগলে রাখেন তিনি।'


বিরামহীন ২৪ বছর মহিষপুর গ্রাম থেকে দৌড় শুরু করে কখনো নাচোল উপজেলা সদর, আবার কখনো পাশের গোমস্তাপুর উপজেলায় পৌঁছে যান শাহিন। সারাদিন মাইলের পর মাইল দৌড়ালেও দিনশেষে ঠিকই নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। স্থানীয় বাসিন্দা মো. সুমন আলী জানান, শাহিন সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন না, কারো ক্ষতিও করেন না। নিজের মনে বিভোর হয়ে বিয়ারিং গাড়ি নিয়ে ছুটে চলাই যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। দীর্ঘ দুই যুগ ধরে তাঁকে কেউ কখনো হাঁটতে বা কোনো যানবাহনে চড়তে দেখেনি।


চিকিৎসার অভাবে থমকে আছে সুস্থতা শাহিনের মা সাজেদা বেগম ও ভাবী স্বপ্না খাতুন জানান, ৩০ বছর বয়স হলেও শাহিনের আচরণ এখনো শিশুর মতো। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা, তাই ঠিকমতো চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পেলেও তা চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত নয়।


আরও পড়ুন: অন্ধত্বকে জয় করে হস্তশিল্পে দক্ষ সামাদ তালুকদার


প্রতিবেশী সেমাজুল ইসলাম বলেন, 'শাহিনের পরিবার অত্যন্ত অসহায়। সরকার যদি উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করত, তবে হয়তো ছেলেটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারত।'


সহযোগিতার আশ্বাস শাহিনের এই অদম্য দৌড়ের খবর পৌঁছেছে স্থানীয় প্রশাসনের কানেও। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক সিদ্দিকা সোহেলী রশীদ বলেন, 'শাহিন বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। তাঁর বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। খোঁজখবর নিয়ে তাকে আর কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'


২৪ বছর ধরে বিরামহীন ছুটে চলা শাহিন কি তবে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন? সেই আশায় পথ চেয়ে আছে তার পরিবার। আপাতত বিয়ারিং গাড়ির চাকার ঘর্ঘর শব্দ আর শাহিনের দ্রুতগামী পায়ের শব্দই বলে দিচ্ছে তাঁর অস্তিত্বের কথা।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন