২৭ বছরেও মেলেনি যশোর উদীচী হামলার বিচার, নীরবে কাঁদছেন স্বজনরা

১ দিন আগে
ভয়াল সেই বোমা হামলার ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও মেলেনি ন্যায়বিচার। চিহ্নিত করা যায়নি হত্যাকারী ও নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের। বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশায় দিন কাটছে নিহতদের স্বজন এবং বর্বরোচিত এই হামলার শিকার হওয়া আহত মানুষদের।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ গভীর রাতে যশোর টাউন হল ময়দানে উদীচীর দ্বাদশ সম্মেলনের শেষ দিনে চলছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এ সময় পরপর দুটি শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে রূপ নেয় অনুষ্ঠানস্থল। দিকবিদিক ছুটে চলা মানুষের বাঁচার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। বর্বরোচিত ওই হামলায় প্রাণ হারান ১০ জন; গুরুতর আহত হন আড়াই শতাধিক নিরীহ দর্শক ও সাংস্কৃতিক কর্মী। দেশে বোমা হামলার কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল মূলত এই ঘটনার মধ্য দিয়েই।

 

নিহতরা হলেন- নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রানী ঘোষ, নূর ইসলাম, ইলিয়াস মুন্সী, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম মিলন, মোহাম্মদ বুলু, রতন কুমার বিশ্বাস, শাহ আলম পিন্টু ও বাবু রামকৃষ্ণ।

 

স্বজনদের কান্না

 

টাউন হল ময়দানের রওশন আলী মঞ্চের পাশে উদীচী হামলায় নিহতদের স্মরণে পরবর্তীতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। মার্চ মাস এলেই নিহত তপনসহ ১০ সাংস্কৃতিক কর্মীর স্মৃতিতে তৈরি সেই স্তম্ভে এসে সময় কাটান বিউটি আক্তার। অজান্তেই তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে বেদনার অশ্রু। একবুক হতাশা নিয়ে বিলাপ করেন তিনি। ভাই হারানোর বেদনার চেয়ে ২৭ বছরেও বিচার না পাওয়ার কষ্টটাই যেন তাকে বেশি পোড়ায়।

 

নিহত তপনের বোনের আক্ষেপ, তার মা সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। তিনিও এখন অসুস্থ; ভাই হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয়ে আছেন।

 

আরও পড়ুন: উদীচীর ঢাকা অফিসে আগুন, নিয়ন্ত্রণে চার ইউনিট

 

দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন আহতরা 

 

বোমা হামলার ঘটনায় আহত উদীচী কর্মী সুকান্ত দাস আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি। হামলায় এক পা হারিয়েছেন তিনি; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাত ও কান। দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করছেন তিনি। সুকান্ত দাসের অভিযোগ, সরকার আসে-যায়, কিন্তু কেউ বিচার করেনি। সবাই বিচারের নামে প্রহসন করেছে।

 

ঘটনার সময় সুকান্ত ছিলেন টগবগে তরুণ। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এখন নানা রোগও বাসা বেঁধেছে শরীরে। একটি পা কেটে ফেলতে হওয়ায় কৃত্রিম পা লাগিয়ে হাঁটতে হয় তাকে। ২০২২ সালে ভারত থেকে কানের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। প্রতিনিয়ত পায়ে যন্ত্রণা করে, বেশি হাঁটতে পারেন না। ডান হাত দিয়ে লিখতে পারেন না বলে ২৭ বছর ধরে বাম হাত দিয়েই খাওয়া, লেখাসহ যাবতীয় কাজ করতে হয়। ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন, '২৭ বছর রহস্য উদ্ঘাটন করা যায়নি; এমনকি মামলাটার কী অবস্থা সেটাও আমরা কেউ জানি না। এত কষ্টের পরেও এটা বলতে লজ্জা লাগে, এখনও বিচার পেলাম না।'

 

ক্ষুব্ধ সাংস্কৃতিক অঙ্গন 

 

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, 'সরকারের পর সরকার পরিবর্তন হলো, আমাদের সহকর্মীদের হত্যার বিচার পেলাম না। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়নি। কারা এই জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছিল, তা-ও উদ্ঘাটিত হয়নি। একতরফা বিচার চাইতে চাইতে এখন আর ভালো লাগে না। বিচার পাই না বলেই এখন আর বিচার চাই না।'

 

উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, 'বিচার না পাওয়াতে নিজেদের অসহায় মনে হয়। আহতরা এখনও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের মানবেতর জীবনযাপন আমাদেরও অসহায় করে তোলে। পাশাপাশি স্বজন হারানো ১০টি পরিবারও বিচারের জন্য আমাদের তাগিদ দেয়। বহুবার বিভিন্ন জায়গায় দাবি জানালেও রাষ্ট্র আমাদের সহকর্মী হত্যার বিচার করেনি।'

 

আরও পড়ুন: যশোরে উদীচী হত্যাকাণ্ড: ২৬ বছরেও হয়নি কূলকিনারা, আর কবে?

 

আইনি মারপ্যাঁচে আটকে আছে বিচার 

 

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাবেরুল হক সাবু জানান, সিআইডির ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত থেকে খালাস পেয়ে যান এই মামলার সব আসামি। পরে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়।

 

খালাস পাওয়া আসামিরা ফের আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছেন। কিন্তু শুনানি আজও শেষ হয়নি। আপিল শুনানি শেষ না হলে এই মামলা গতি পাবে না বলে জানান তিনি।

 

আজকের কর্মসূচি 

 

এমন হতাশার মধ্য দিয়েই নানা কর্মসূচিতে আজ পালিত হচ্ছে উদীচী ট্র্যাজেডি দিবস। ২৭তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে উদীচী যশোরের উদ্যোগে আজ শুক্রবার (৬ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় প্রতিবাদী সমাবেশ ও সন্ধ্যায় শহীদদের স্মরণে মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নিহতদের স্মরণ করার পাশাপাশি ন্যায়বিচারের দাবি জানানো হবে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন