হামে বাড়ছে শিশুমৃত্যু, দেশজুড়ে উদ্বেগ

২ সপ্তাহ আগে
হঠাৎ হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ও মৃত্যুর ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই ভর্তি করা হচ্ছে হাম আক্রান্তদের।

ইতোমধ্যে অন্তত ১০টি জেলায় হামের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। মূলত হামের টিকা না দেয়া, শিশুদের মায়ের বুক দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই হামের প্রকোপ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।


ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। গত ১২ দিনে এ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত হয়ে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সবশেষ শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে ও রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে দুই শিশু। রোববার সকাল ১০টা পর্যন্ত হাম আক্রান্ত ৬৬ শিশু ময়মনসিংহ মেডিকেলে ভর্তি আছে।


চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে ১২ শিশু ভর্তি হয়েছে। এসব রোগীকে শিশু ওয়ার্ডের পৃথক একটি কর্নারে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ রোগী কক্সবাজার অঞ্চলের বলে জানা গেছে। তাদের বয়স ১৫ মাসের কম।


চিকিৎসকরা জানান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের আগের ডেঙ্গু কর্নারটিকে হাম কর্নারে পরিণত করা হয়েছে। নতুন ভর্তি হওয়া রোগীদের সেখানেই রাখা হয়েছে। ভর্তি হওয়া ১২ শিশুর মধ্যে ২ জনের বয়স ৬ মাসের কম, বাকিদের বয়স ৭ থেকে ১৫ মাসের মধ্যে। ওই কর্নারে অন্য কোনো রোগীকে রাখা হচ্ছে না।


রাজশাহী

মার্চ মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউয়ে মারা গেছে ৯ জন। অন্যদিকে সাধারণ ওয়ার্ডের কোনো খবর জানা যায়নি।


রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্র জানায়, অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ হাম রাজশাহী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। আক্রান্তের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। তার মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও পাবনায় সংক্রমণ বেশি হয়েছে।


আরও পড়ুন: রাজশাহী মেডিকেলের পরিচালককে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো উচিত: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

১ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) পর্যন্ত রাজশাহীতে ৮৪ জন হামের রোগীকে আইসিইউয়ে নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে আইসিইউয়ে নেয়ার পরও ৯ জন ও আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাবনায় শনিবার (২৮ মার্চ) সকাল পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ২৬ শিশু ‘হাম ওয়ার্ডে’ চিকিৎসাধীন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে গত তিন মাসে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালে হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৭০ শিশু।


শুধু ময়মনসিংহ, রাজশাহী বা চট্টগ্রাম নয়, দেশের অন্তত ১০টি জেলায় হাম রোগ উদ্বেগজনকভাবে সংক্রমিত হয়েছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঁচ শিশু এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। 



এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘গত ১৫ দিনে হামের প্রবণতা বেড়েছে। তবে এখনও আমাদের সক্ষমতা রয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএনসিসি হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা কর্নার করা হয়েছে।’


তিনি বলেন, ‘কোনো সরকার গত ৮ বছর হামের টিকা দেয়নি। এ কারণে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তবে এ সংকট সমাধানে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে টিকা ক্রয় করা হচ্ছে।’


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টিকার সংকট দূর না করা এবং বিভিন্ন দাবিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলন।


চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং ভাইরাসজনিত উচ্চ সংক্রামক রোগ হওয়ায় হাঁচ-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, চোখ-মাথায় প্রদাহে আক্রান্ত হয় শিশু। এসব শিশুকে হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনায় রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।


আরও পড়ুন: আইসিইউ না পেয়ে ১৪ দিনে ৪৪ শিশুর মৃত্যু


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলায় সংক্রমণ বেশি।


রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউ-প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, গত ১০ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪৪ শিশু আইসিইউতে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে মারা গেছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এরা হামসহ অনান্য রোগে আক্রান্ত ছিল।


হঠাৎ কেন এভাবে হাম বাড়ছে, এমন প্রশ্নে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কাকলী হালদার বলেন, হাম বাড়ার প্রধান কারণ হলো টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই থেকে বাদ পড়ে যাওয়ায় তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং অপুষ্টির কারণেও ভাইরাসের বিস্তার দ্রুত ঘটে। টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী ঝুঁকির মুখে থাকে, যা প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ।

 

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন