ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন ওসমান মিয়াকে। এরপর দুই পরিবার থেকেই আলাদা হয়ে যান ওসমান ও উর্মি। সেই থেকেই শুরু হয় উর্মির সংগ্রামী জীবনের গল্প।
৪ বছর আগে স্বামীর ব্যবসায় লোকশানের পর সংসারে নেমে আসে তীব্র অভাব। সেই থেকে ঘরে বসে একটা আয়ের পথ খুঁজতে থাকেন গৃহবধূ উর্মি। ইউটিউবে ভিডিও দেখে সেলাইয়ের কাজ শিখে শুরু করেন পথচলা। এরপর ফেসবুকে 'হাতের ছোঁয়া' নামে পেজ খুলে নিজের তৈরি পাঞ্জাবি, থ্রি পিস, ওড়না, হিজাবসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাকের অনলাইন ব্যবসায় নামেন। অভাব ও সংগ্রামকে শক্তিতে রুপ দিয়ে উর্মি গড়ে তুলেছেন নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার এক সফল উদ্যোগ। তার সুঁইয়ের প্রতিটি ফোঁড় আর সুতার টানে বোনা হচ্ছে বদলে যাওয়ার গল্প।
সানজিদা আক্তার উর্মি বলেন, আমার স্বামীর কাপড়ের দোকান ছিল। ২০২২ সালে হঠাৎ ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসানে পরতে হয় আমাদের। ভালোবেসে বিয়ে করায় পরিবারের কেউ আমাদের সাহায্য করেনি। তীব্র অভাবের কারনে ঘরে বসে একটা আয়ের পথ খুঁজতে থাকি। সেই সময় ইউটিউবে ভিডিও দেখে সেলাইয়ের কাজ শিখি। এরপর তৈরি করতে থাকি থ্রি পিস, সেলোয়ার-কামিজ, ওড়না, হিজাবসহ মেয়েদের বিভিন্ন ধরনের পোশাক। হাতের কাজ করা পোশাকগুলো প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা পছন্দ করেন। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি।
আরও পড়ুন: ঢাকায় ৬ মাসের মধ্যে নারীদের জন্য ইলেকট্রিক বাস নামানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
উর্মি আরও বলেন, তৈরি করা পোশাক বিক্রির জন্য নিজের দোকান না থাকায় ফেসবুকে 'হাতের ছোঁয়া' নামে পেজ খুলে পোশাকের ছবি আপলোড করি। সেখান থেকেই শুরু হয় অনলাইন ব্যবসা। এরপর ধীরে ধীরে চাহিদা বাড়ায় স্থানীয় নারীদের কাজ শিখিয়ে নিজের ব্যবসায় যুক্ত করি। এখন আমার অধীনে কাজ করছে ৪০ থেকে ৫০ জন নারী।
সাতমাথা বীরভদ্র এলাকায় উর্মির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বিরাট কর্মযজ্ঞ। উর্মির বাড়ি আঙ্গিনায় সুঁই সুতা দিয়ে নকশা তৈরিতে ব্যস্ত গ্রামীণ নারীরা। সেলাই করা পোশাক গুলোতে কেউ কেউ নকশা আর্ট করছেন কেউ আবার সুঁই আর সুতা দিয়ে জীবন্ত করে তুলছেন সেই নকশাগুলো।
জানা যায়, প্রতিদিন এভাবেই সেলাইয়ের কাজ করেন ৪০ থেকে ৫০ জন নারী। বর্তমানে একেকটি কাজে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান তারা। মাস শেষে সেলাইয়ের কাজ করে সংসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন একসময়ের বেকার বসে থাকা নারীরা।
কথা হয় সুঁই সুতো নিয়ে হাতের কাজে ব্যস্ত থাকা গৃহবধূ নুরবানুর সাথে। তিনি বলেন, সাংসারিক কাজের শেষে বেকার সময় কাটাতে হতো। তাই অভাবের সংসারে আমিও যে সাহায্য করতে পারবো তা কখনো চিন্তাও করতে পারিনি। দুই বছর আগে এখানে এসে কাজ শিখি এখন প্রতিমাসে যে আয় হয় তা দিয়ে সাংসারে ভালো উপকার হচ্ছে।
আরেক গৃহবধূ সুমাইয়া বলেন, স্বামীর অভাবের সংসার। এই কাজে যে আয় হয় তা দিয়ে দুই বাচ্চার পাড়া-লেখা, নিজের হাত খরচ বাদেও সংসারের বিভিন্ন সমস্যায় কাজে লাগাতে পারছি। বাড়তি এই আয়ের ব্যবস্থা সংসারে স্বচ্ছলতা এনে দিয়েছে।
সুলতানা নামে আরেক নারী বলেন, তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি। হাতের কাজ করে যে আয় হয় তা দিয়ে সংসারে অনেক সাহায্য হয়। তাছাড়া অভাবের সংসারে নিজের হাত খরচ পাওয়াটা খুব মুশকিল। এখন এই কাজের মাধ্যমে নিজের হাত খরচ, সন্তানদের প্রাইভেট, স্কুলের খরচসহ স্বামীর বিপদেও সাহায্য করতে পারি।
গৃহবধূ জান্নাতি বলেন, এখানে কাজের উপরে টাকা। ছোট কাজ করলে টাকা কম। তবে বড় ডিজাইনের কাজ করলে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। সবমিলিয়ে মাস শেষে সাংসারিক কাজের অবসরে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হয় যা গ্রামীণ সংসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শুন্য থেকে শুরু করা উর্মি এখন প্রতিমাসে ব্যবসা করছেন আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা। যেখান থেকে কারিগরদের মজুরিসহ অন্যান্য খারচ বাদেও মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় হয় তার। সরকারি-বেসরকারি সুযোগ সুবিধা পেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা তার।
আরও পড়ুন: চলছে নারী উদ্যোক্তাদের জমজমাট ঈদমেলা
সানজিদা আক্তার উর্মি বলেন, বর্তমানে আমার তৈরি করা পোশাকের সারাদেশে ব্যাপক চাহিদা। তবে পূঁজি না থাকায় ব্যবসার প্রসার সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি ও বেসরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পেলে নিজ গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের বেকার নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ব্যবসার আরও প্রসার ঘটাতে পারবো।
রংপুরের সাতমাথা বীরভদ্র এলাকার উদ্যোক্তা সানজিদা আক্তার উর্মির ব্যতিক্রমী সংগ্রাম এখন আশপাশের কয়েকটি গ্রামে নারীদের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।
]]>

১ দিন আগে
২







Bengali (BD) ·
English (US) ·