লাইফগার্ড থেকে শুরু করে ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার-সবাই সময় পার করছেন অপেক্ষায়। ব্যবসায়ীদের আশা, ঈদের ছুটিতে আবারও প্রাণ ফিরে পাবে এই সৈকত, জমে উঠবে পর্যটন বাণিজ্য।
শনিবার সকাল ১০টা, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবনী পয়েন্ট। এক কিলোমিটারজুড়ে কয়েক'শ চেয়ার-ছাতা সাজানো। কিন্তু পর্যটক আছেন মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। ঢেউ ভাঙছে, বাতাস বইছে-অথচ পানিতে নামার মানুষ নেই। দূরে একটি জেটস্কি ভাসছে, চালক অপেক্ষায়, যাত্রী নেই।
জেড স্কী চালক সোনা মিয়া বলেন, ‘সকাল ৯টা জেড স্কী সাগরের নোনাজলে নামানো হয়েছে। কিন্তু পর্যটকের সাড়া নেই। হাতে গোনা কয়েকজন পর্যটক লাবনী পয়েন্টে এসেছে। কিন্তু তারা কেউ জেড স্কীতে চড়েনি। এখন অপেক্ষা করছি, কখন জেড স্কীতে চড়তে পর্যটক আসবে।’
এক কিলোমিটারজুড়ে কয়েক'শ চেয়ার-ছাতা সাজানো। কিন্তু পর্যটক নেই। ছবি: সময় সংবাদ
দুপুর পর্যন্ত সৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা, সিগাল ও শৈবাল পয়েন্ট ঘুরেও একই চিত্র। চিরচেনা ৩ কিলোমিটার সৈকতজুড়ে হাতেগোনা কয়েকজন পর্যটক।
পর্যটক না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে সৈকতকেন্দ্রিক সহস্রাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কয়েক'শ ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার ক্যামেরা হাতে বেকার সময় পার করছেন। ঘোড়া অলস দাঁড়িয়ে আছে, শতাধিক বিচ-বাইক এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। শামুক-ঝিনুক ও সামুদ্রিক পণ্যের দোকানেও নেই কোনো ক্রেতা।
পর্যটকের অপেক্ষায় ঘোড়াওয়ালা। ছবি: সময় সংবাদ
ঘোড়াওয়ালা মো. রুবেল বলেন, ‘সকাল ৯টার দিকে এসে ঘোড়া নিয়ে সৈকতে বসে আছি। কিন্তু কোনো রকম আয় হচ্ছে না। ঘোড়ার খাবারের টাকাটাও তুলতে পারছি না। রোজার সময়ে সাধারণত ভিন্ন ধর্মের মানুষ এখানে আসেন, কিন্তু এ বছর তারা আসছেন না। জানি না কেন, সৈকতে একদম লোকজন নেই। ফলে ঘোড়ার খাবারের খরচ জোগাড় করাটাই খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।’
সৈকতের ফটোগ্রাফার গফুর উদ্দিন বলেন, আমরা ফটোগ্রাফাররা সাধারণ সময়ে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার টাকার মতো আয় করি। কিন্তু রমজান মাসে ব্যবসা-বাণিজ্য একেবারেই কমে গেছে। তিনটি বিচ মিলিয়ে প্রায় ১০০-১৫০ জন ফটোগ্রাফার কাজ করছি, অথচ এখন কাজ খুবই কম। তাই আমরা যারা আছি, তারা কোনোভাবে স্থানীয় কিছু কাজ বা বাইরে থেকে আসা অল্প কয়েকজন পর্যটক নিয়ে সময় পার করছি। মোট কথা, খুব কষ্টে কোনোরকমভাবে দিন চলছে। যেহেতু পর্যটকের আগমন একদম হাতে গোনা।
পর্যটক না থাকায় গল্প করে সময় কাটাচ্ছেন ফটোগ্রাফাররা। ছবি: সময় সংবাদ
বার্মিজ পণ্য ও শামুক-ঝিনুক বিক্রেতা রবিউল আলম বলেন, এখন তো রমজান মাস, তাই পর্যটকও আসছে না। বিক্রিরও একেবারেই নেই। এমন অবস্থা যে বিদ্যুৎ বিল পর্যন্ত পরিশোধ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তবুও প্রতিদিন দোকান খুলে বসে থাকি-এই আশায় যে হয়তো কিছু বেচা-বিক্রি হবে।
এদিকে সাগরের নীল জলরাশিতে সমুদ্রস্নানে নেই পর্যটক। এতে ব্যস্ততাও নেই অর্ধ-শত লাইফ গার্ড কর্মীর। এই সুযোগে তারাও বেকার সময় পার করছেন।
পর্যটকশূন্য হোটেল। ছবি: সময় সংবাদ
সী সেফ লাইফ সংস্থার সিনিয়র লাইফ গার্ড কর্মী মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, ‘বরাবরের মতোই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত-এ রমজান মাসে পর্যটক সংখ্যা খুবই কম। তাই এই সময়টা আমাদের একটু একঘেয়ে লাগে। আমরা সাধারণত জমজমাট পরিবেশে কাজ করতে অভ্যস্ত। আমরা লাইফগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করি এবং পানিতে নামা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। কিন্তু এ সময় পানিতে মানুষ কম নামায় আমাদের কাজও তুলনামূলক কম, ফলে ভালো লাগে না। আমরা চাই বেশি বেশি পর্যটক কক্সবাজারে আসুক, সমুদ্রে গোসল করুক, আনন্দ করুক-আর আমরা তাদের নিরাপত্তা দিয়ে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পারি। এটিই আমরা সত্যিকারের উপভোগ করি।’
এখন রমজান উপলক্ষে ৫ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট কক্ষভাড়ায় সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করেছে। অনেক হোটেলের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষের ভাড়া নেমে এসেছে ৫০০ টাকায়। কিন্তু রোজা শুরুর পর থেকে সেই ছাড়েও মিলছে না প্রত্যাশিত সাড়া। ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সৈকত প্রায় পর্যটকশূন্য।
সৈকতপাড় ঘেঁষে তারকামানের হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের ব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, রমজান মাসকে আমরা কখনোই ব্যবসায়িক মাস হিসেবে দেখি না। বরং এই সময়টা মূলত সারা বছরের প্রস্তুতির অংশ-বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে রেনোভেশন, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়। কারণ এই মাসে স্বাভাবিকভাবেই পর্যটক ও গেস্টের সংখ্যা অনেক কম থাকে। তবুও মাঝেমধ্যে কিছু গেস্ট আসেন, তাই তাদের সুবিধার কথা চিন্তা করে আমরা সর্বোচ্চ ডিসকাউন্ট অফার দিয়ে থাকি। সাধারণ মানের হোটেলগুলোতে ৫০০-১০০০ টাকায়ও রুম পাওয়া যায়। আর আমরা যারা তারকামানের হোটেল পরিচালনা করি, তারাও সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে থাকি, যেন অল্পসংখ্যক গেস্টও সন্তুষ্ট থাকেন। আসলে রমজান মাসকে স্বাভাবিকভাবেই একটু ধীরগতির সময় হিসেবে মেনে নিতে হয়। এই সময়টা আমাদের জন্য মূলত ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার সময়-যাতে ঈদের ছুটিতে বেশি সংখ্যক পর্যটক এলে আমরা তাদের সর্বোচ্চ সেবা দিতে পারি এবং একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে পারি।’
লাবনী বীচের দোকানগুলোতেও ক্রেতা নেই। ছবি: সময় সংবাদ
মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতি সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘রমজান উপলক্ষে পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট কক্ষভাড়ায় সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করেছে। দুই হাজার টাকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ নেমে এসেছে ৫০০ থেকে ১০০ টাকায়। কিন্তু রোজা শুরুর পর থেকে সেই ছাড়েও মিলছে না প্রত্যাশিত সাড়া। সৈকত প্রায় পর্যটকশূন্য।’
মুকিম খান আরও বলেন, রমজানে পর্যটক কম আসে, এটা নতুন নয়। বর্তমানে পাঁচ শতাধিক হোটেল-রিসোর্টের ৯৮ শতাংশ কক্ষ খালি। তবে আমরা সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছি ঈদ পরবর্তী সময়ের জন্য। আশা করি, ঈদের ছুটিতে চিরচেনা সমুদ্রসৈকত ফিরে পাবে তার প্রাণ।
রমজানে ছাড়, নির্জনতা আর প্রকৃতির অন্যরকম রূপ- সব মিলিয়ে কক্সবাজার এখন এক ভিন্ন চিত্র। ব্যবসায়ীরা অপেক্ষায় ঈদের ছুটির। তাদের আশা, তখন আবারও প্রাণ ফিরে পাবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত।

৬ দিন আগে
২







Bengali (BD) ·
English (US) ·