এই নতুন তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা দ্রুত সময়ে এবং আইনিভাবে লবস্টার জীবন্ত সেদ্ধ করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।
ক্ষতিকর কোনো আঘাত করলে লবস্টারের শারীরিক যেসব প্রতিক্রিয়া হয়, সেটা কি সত্যিই ব্যথার অনুভূতি, নাকি নিছক শারীরিক গঠনগত ক্রিয়া— এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছিল।
এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ‘নরওয়ে লবস্টার’ এর ওপর একটি গবেষণা চালান। শরীরে ব্যথানাশক ওষুধ দেয়া হলে এই প্রাণীদের আচরণে কী পরিবর্তন আসে, তা পরীক্ষা করে দেখেন তারা।
গবেষণায় লবস্টারগুলোকে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়, যা মানুষের কাছেও যন্ত্রণাদায়ক। পরে দেখা যায়, যেসব লবস্টারকে ব্যথানাশক দেয়া হয়নি, শক পাওয়ার পর তারা লেজ ঝাপটে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করে। তবে অ্যাসপিরিন ইনজেকশন দেয়া বা পানিতে লিডোকেন (অ্যানেসথেসিয়া) মিশিয়ে দেয়ার পর দেখা যায়, লবস্টারগুলো পালানোর কোনো চেষ্টা করছে না বা লেজও ঝাপটাচ্ছে না। এর অর্থ হলো, তাদের ব্যথা অনুভব করার প্রক্রিয়াটি আমাদের মতোই।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এলেফথেরিওস ক্যাসিউরাস ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলকে বলেন, ‘যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়ার সময় ব্যথানাশকের প্রতি সাড়া দেয়ার অর্থ হলো, তারা যা অনুভব করে তা কেবল সাধারণ রিফ্লেক্সের চেয়েও বেশি কিছু।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব প্রমাণই নির্দেশ করে যে, ডেকাপড ক্রাস্টেসিয়ানরা (দশপদী খোলসযুক্ত প্রাণী) ব্যথা অনুভব করে। যুক্তরাজ্যে যেহেতু তাদের সংবেদনশীল প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাই জীবন্ত সেদ্ধ করার পদ্ধতিটি নিষিদ্ধ করা উচিত।’
এই ফলাফল ও সুপারিশগুলো একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের একটি গবেষণারই প্রতিফলন, যেখানে দেখা গিয়েছিল যে, সামুদ্রিক কাঁকড়াও একইভাবে ব্যথা অনুভব করতে পারে।

এরইমধ্যে অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি রাজ্যে লবস্টার জীবন্ত সেদ্ধ করা বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। যুক্তরাজ্যেও নতুন একটি বিলের অধীনে লবস্টার জীবন্ত সেদ্ধ করা নিষিদ্ধ হতে পারে।
গবেষণার সহ-লেখক এবং অধ্যাপক লিন স্নেডন ডেইলি মেইলকে বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়, খোলসযুক্ত প্রাণীদের জীবন্ত সেদ্ধ করা মোটেও মানবিক নয়। তাই জীবন্ত সেদ্ধ করা নিষিদ্ধ করার ধারণাকে আমি সমর্থন করি।’
আরও পড়ুন: মানব মস্তিষ্কে ‘ইলেকট্রনিক্স’ বসাবে চীন, নেপথ্যে ‘সাজাপ্রাপ্ত’ মার্কিন বিজ্ঞানী!
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সর্বদা মানবিক উপায়ে প্রাণীদের জীবনাবসান ঘটানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা কখনোই একটি গরু বা মুরগিকে জীবন্ত সেদ্ধ করা মেনে নেব না। সুতরাং, এই প্রাণীগুলোর সঙ্গে আমরা কেমন আচরণ করছি, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।’
তাহলে জীবন্ত সেদ্ধ করার বিকল্প কী? হ্যাটফিল্ড মেরিন সায়েন্স সেন্টারের বিশেষজ্ঞরা একটি বিকল্প পদ্ধতির পরামর্শ দিয়েছেন, যা লবস্টারের জন্য তুলনামূলক কম যন্ত্রণাদায়ক বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রথমে লবস্টারটিকে ৩৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (প্রায় ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার ফ্রিজারে ১৫-৩০ মিনিট রেখে অবশ (Stun) করে নিতে হবে। পরে লবস্টারটিকে একটি সমতল ও শক্ত পৃষ্ঠে পেটের ওপর ভর দিয়ে রাখতে হবে। এ অবস্থায় মাথার পেছনে, চোখের প্রায় এক ইঞ্চি পেছনে ছোট ক্রস বা গর্তটি খুঁজে বের করতে হবে। খোলসের ওই জায়গাটি দিয়ে একটি ধারালো ছুরি বা স্ক্রু ড্রাইভার ঢুকিয়ে খোলসের অপর প্রান্তে পৌঁছাতে হবে। এরপর স্নায়ুকেন্দ্রটি ধ্বংস করার জন্য ছুরি বা স্ক্রু ড্রাইভারটি ঘোরাতে হবে। লেজের নিচে থাকা ছোট গর্তটিতেও একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি করতে হবে। মানবিক মৃত্যু নিশ্চিত করতে লবস্টারটিকে পুনরায় ফ্রিজারে রাখতে হবে।
অন্যদিকে, বড় পরিসরে এবং শিল্প কারখানায় লবস্টার মারার জন্য বৈদ্যুতিক শক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
আর যদি পুরো বিষয়টি আপনার কাছে খুব বেশি লোমহর্ষক বা নিষ্ঠুর মনে হয়, তবে লবস্টারের বদলে ‘কিং অয়েস্টার মাশরুম’ বা ‘পাম গাছের মজ্জা’ খাওয়ার কথা ভাবতে পারেন। কোনো রকম অপরাধবোধ, লজ্জা বা অস্তিত্বের সংকট ছাড়াই এগুলো আপনাকে লবস্টারের স্বাদ ও টেক্সচার দেবে!

১ দিন আগে
২








Bengali (BD) ·
English (US) ·