বুধবার (১ এপ্রিল) সুন্দরবনে মধু আহরণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। একই সঙ্গে মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি সুন্দরবনে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযানেরও সূচনা করবেন। এই ঘোষণার পর উপকূলীয় অঞ্চলের মৌয়ালদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও শঙ্কা পুরোপুরি কাটছে না।
নদীতে কুমির আর জঙ্গলে বাঘের ভয় উপেক্ষা করে জীবনবাজি রেখে সুন্দরবনের মূল্যবান মধু সংগ্রহ করেন মৌয়ালরা। এতদিন এই প্রাকৃতিক বিপদই তাদের প্রধান শঙ্কা ছিল। কিন্তু এবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে বনদস্যু আতঙ্ক।
মৌয়ালরা জানান, সুন্দরবনের গহিনে কয়েকটি দস্যু দল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। দাবি অনুযায়ী টাকা না পেলে শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হতে হচ্ছে। এ কারণে এবার অনেকেই মধু আহরণে যেতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের একাধিক মৌয়াল জানান, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে সুন্দরবনে দস্যুদের হাতে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে। পরিবার-পরিজনের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা বনে যাওয়ার উৎসাহ হারাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: পর্যটকের পদচারণায় মুখর সুন্দরবন, ষাটগম্বুজসহ বিনোদন কেন্দ্রগুলো
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকে দেখছি, মৌয়ালরা জঙ্গলে যাওয়ার সময় বাঘ-কুমিরকে তেমন ভয় পেতেন না। কিন্তু এখন বনদস্যু আতঙ্ক মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। একবার দস্যুদের হাতে ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। তাই ভয়ে এবার অনেকেই মধু কাটা বাদ দিয়ে এলাকায় দিনমজুর খাটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।’
মুন্সিগঞ্জের মৌখালী গ্রামের মৌয়াল আক্কাস আলী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বাপ-দাদার পেশা হিসেবে সুন্দরবনে মধু কাটতে যাই। কখনো পিছপা হইনি। আগে বেশ কয়েক বছর বনে বনদস্যুদের চাপ ছিল না, নির্বিঘ্নে মোম-মধু কেটে আনতে পেরেছি। কিন্তু এবার শুনছি জঙ্গলে দস্যুতা বেড়েছে। ভয়ে সুন্দরবনে যাওয়া ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, গত বছর তারা যে নৌকায় ৭ জন মিলে মধু সংগ্রহে গিয়েছিলেন, এবার সেই নৌকায় ৭ জনও জুটছে না। অধিকাংশ মৌয়ালই এবার বনে না যাওয়ার কথা ভাবছেন।
উপকূলীয় অঞ্চলের বনজীবীদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস সুন্দরবন। পরিবারের মুখের দিকে তাকিয়ে বাধ্য হয়েই অনেককে দাদন বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গহিন জঙ্গলে যেতে হয়। কিন্তু বনদস্যুদের হাতে পড়লে মুক্তিপণ দিতে গিয়ে সব হারিয়ে নিঃস্ব হতে হয় তাদের। মাঝে থেকে ঋণের বোঝা মাথায় চেপে বসে।
আরও পড়ুন: অপহরণের ১০ দিন পর দস্যুদের জিম্মি থেকে ৬ জেলে উদ্ধার
বনদস্যু আতঙ্কে মৌয়াল কমে যাওয়ায় এবার মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে শুরু হওয়া মধু সংগ্রহের এই মৌসুম চলবে টানা দুই মাস। এ বছর সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১ হাজার ১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে সুন্দরবন থেকে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু আহরণ করা হয়। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮ কুইন্টালে, আর ২০২৩ সালে হয় ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টাল। ২০২৪ সালে তা কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল হলেও, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে মধু আহরণ প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে যায়। এর প্রভাব পড়েছে মৌয়ালদের সংখ্যাতেও। ২০২৪ সালে যেখানে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল মধু আহরণে নিয়োজিত ছিলেন, ২০২৫ সালে তা কমে প্রায় ৫ হাজারে নেমে আসে।
মৌয়ালরা বনে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঝেমধ্যে চালানো অভিযান স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছে না। বনদস্যু নির্মূলে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে বন বিভাগ বলছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘মৌয়ালদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ড যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
]]>
২ সপ্তাহ আগে
৩








Bengali (BD) ·
English (US) ·