সীমান্ত জনপদে নতুন আতঙ্ক স্থল মাইন

২ দিন আগে
মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে বিপজ্জনক স্থল মাইন বসিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এখন পর্যন্ত ৩০০ মাইন স্থাপনের তথ্য জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। আর এই মাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশি বাসিন্দাদের যেমন অঙ্গহানি হচ্ছে, তেমনি প্রায়ই মারা যাচ্ছে গরু-ছাগলও। যার কারণে সীমান্তবাসীর মাঝে উদ্বেগ বেড়েছে কয়েকগুণ।

সীমান্তের লম্বাবিল সংলগ্ন নাফ নদীতে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন নৌকাটি আছে কিনা গত সোমবার দেখতে গিয়ে আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা মাইনের বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়েছেন সীমান্তের বাসিন্দা মোহাম্মদ হানিফ। বিস্ফোরণে তিনি একটি পা হারিয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।


এ ঘটনায় হানিফের পরিবার চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। হতদরিদ্র পরিবারটি এখন দিশেহারা। তার মা ও স্বজনদের প্রশ্ন-এই ঘটনার দায় কে নেবে, আর তাদের ন্যায়বিচারই বা কে নিশ্চিত করবে?


মাইন বিস্ফোরণে আহত হানিফের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘নাফ নদীতে মাছ ধরে ছেলের আয়ে তাদের হতদরিদ্র সংসার চলত। গোলাগুলি থামার পর নৌকা দেখতে গিয়ে অজান্তে পুঁতে রাখা মাইনে পা দিলে বিস্ফোরণে তার পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এই সংসার চলবে কীভাবে, তার ছেলের দায়িত্ব কে নেবে?’


হানিফের ভাই নুর আহমদ (৩২) জানান, বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় এক থেকে দেড় কিলোমিটার ভেতরে গোলাগুলি ও বোমা হামলার ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে বোমা ও মাইন পুঁতে রেখে চলে যায়, যা স্থানীয় গ্রামবাসীরা জানতেন না।
 

তিনি বলেন, ঘটনার দিন সকাল ১০টার দিকে নৌকা ও জাল দেখতে গিয়ে হানিফ একটি পুঁতে রাখা মাইনের ওপর পা দিলে বিস্ফোরণ ঘটে এবং তার পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে পরিবারটি চরম বিপাকে পড়েছে। নুর আহমদ অভিযোগ করে বলেন, সীমান্ত এলাকায় চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে গেছে এবং জীবিকা ও চিকিৎসা-দুটিই এখন বড় সংকট। তিনি একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রশাসনের কাছে ভাইয়ের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিচার দাবি করেন।


লম্বাবিল সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা আব্দুর শুক্কুর (২৭) বলেন, সম্প্রতি প্রায় দুই কিলোমিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরা মাইন পুঁতে রেখে চলে গেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের চরম লঙ্ঘন উল্লেখ করে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দায়ীদের শাস্তির দাবি জানান। ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানান তিনি।
 


আব্দুর শুক্কুর আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারীরা চরম ঝুঁকি ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতিদিনই জীবনহানির আশঙ্কা নিয়ে থাকতে হচ্ছে, আর এই ঝুঁকি কবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। তিনি দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
 

এরআগে মিয়ানমারের ছোড়া গুলিতে শিশু আফনান গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং মাইন বিস্ফোরণে হানিফের অঙ্গহানির ঘটনায় সীমান্তবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে কয়েকগুণ। যাদের আয়ের প্রধান উৎস নদীতে মাছ ধরা-তারা জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আর নদীতে নামছেন না।
 

মিয়ানমারের ছোড়া গুলি এসে পড়েছে সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দা লায়লা বেগমের ঘরের জানালায়। ছবি: সময় সংবাদ

তেচ্ছিব্রীজ এলাকার বাসিন্দা লায়লা বেগম (৫০) বলেন, ‘সীমান্তে সন্ত্রাসী ও আরাকান আর্মি গোলাগুলি করছে। আমরা তো বেড়িবাঁধের কাছে বসবাস করি। তারা গুলি করলে আমরা কোথায় যাব? আমরা কি খাব, কিভাবে চলব?  আমাদের ভয় হচ্ছে তারা গুলি কবরে, মাইন বসিয়েছে। আমরা যদি নদীতে গিয়ে আয় করতে না পারি তাহলে খাব কি? এখন আরাকান আর্মি মাইন বসানো কারণে মাছের প্রজেক্টে যেতে পারছি না। আজকে (মঙ্গলবার) রাতেও ঘরে গুলি পাওয়া গেছে। এখন কী করব?’
 

একই এলাকার রোজিনা আক্তার (৩০) বলেন, ‘মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পরপর তিনটি বিকট শব্দ শুনেছি, যা আমাদের ঘর থেকেও স্পষ্টভাবে শোনা গেছে। গতকাল সন্ধ্যাতেও গুলির শব্দ পেয়েছি। এভাবে যদি মিয়ানমার থেকে গুলি ছোড়া হয় বা সেখানে গোলাগুলি চলতে থাকে, তাহলে আমাদের দেশের নিরাপত্তা কোথায়? আমরা তো সীমান্তের একেবারে কাছাকাছি বসবাস করি। এই পরিস্থিতিতে আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা চরম উদ্বিগ্ন।’
 

জোসনা আক্তার (২৯) বলেন, ‘এটা মিয়ানমারের নিজস্ব সমস্যা। তারা তাদের দেশে যাই করুক, কিন্তু কেন আমাদের দেশে গুলি ছুঁড়ে আসে? তাদের এই আগ্রাসনের ভয়ে আমাদের ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে বা খেলাধুলা করতে পারছে না। আমার তিনটি সন্তান আছে, এবং তাদের নিয়ে আমি অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় আছি। আমরা শুধু শান্তি চাই, আমরা শান্তিতে নিরাপদভাবে বসবাস করতে চাই।’
 

গুলিবিদ্ধ আফনানের বাবা মোহাম্মদ জসিম (৩৫) বলেন, ‘আমরা কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশে বসবাস করি, যা মিয়ানমার সীমান্ত থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে। কিন্তু মিয়ানমারে যখনই গোলাগুলি শুরু হয়, তখন সেখান থেকে ছোড়া গুলি আমাদের গ্রামের ভেতরে এসে পড়ে। এতে করে আমরা সবসময়ই চরম জীবনঝুঁকিতে আছি। আমার মেয়ে আফনান মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে ঢাকায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এই ঘটনা আমাদের আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা কেউই নিরাপদ নই। যে কোনো সময় মিয়ানমারের আরাকান আর্মি আবার লম্বাবিল গ্রামে গুলি চালাতে পারে। শুধু তাই নয়, আমাদের বেড়িবাঁধের পরবর্তী এলাকায় আরাকান আর্মি মাইন পুঁতে রেখেছে বলেও আমরা জানতে পারছি। এই অবস্থায় আমরা পরিবারসহ চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।’
 

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে বাংলাদেশের সীমান্ত ঘেঁষে বিপজ্জনক স্থল মাইন বসিয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০টি মাইন স্থাপনের তথ্য জানাচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে মাঝেমধ্যেই গোলাগুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে, যার অনেকগুলো এসে পড়ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে।
 


সীমান্তের বাসিন্দা জেলে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ (২২) বলেন, বাংলাদেশের ভেতরে আরাকান আর্মি এসে মাইন পুঁতে রেখেছে। মূলত শাহজাহানের দ্বীপ থেকে খালের মুখ পর্যন্ত ৩’শো মাইন পুঁতে রেখেছে তারা। আর মঙ্গলবার সকালে মাইনে বিস্ফোরিত হয়ে ছাগল মারা গেছে। এখন মাইনের ভয়ে আমরা কেউ কাজে যেতে পারছি না।
 

লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শফিক (১৯) বলেন, এখন সীমান্তের নাফ নদীতে গেলেও বিপদ, আবার না গেলেও জীবন ও জীবিকার সংকট তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চরম আতঙ্কের কথা উল্লেখ করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
 

এরআগে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী সীমান্তে মাইন স্থাপন করলেও, এখন বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিও একই পথ অনুসরণ করছে। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের তোয়াক্কা না করে সীমান্তকে পরিণত করা হচ্ছে মৃত্যুফাঁদে। এই পরিস্থিতিতে জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন সীমান্তবাসী।
 

লম্বাবিল সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সৈয়দ আলম বলেন, আরাকান আর্মির ভয়ে বর্তমানে সীমান্ত এলাকায় স্বাভাবিক চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। আতঙ্কের কারণে স্থানীয়রা সীমান্ত বা আশপাশের এলাকায় যেতে সাহস পাচ্ছেন না, এমনকি মুখ খুলতেও ভয় করছেন।
 

তিনি জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা এলাকায় মাইন পুঁতে রেখে চলে গেছে। এসব মাইন কখন বিস্ফোরিত হবে বা কারা এর শিকার হবে-তা কেউ জানে না। এতে করে স্থানীয়দের জীবন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে নাম নদী এলাকায় চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলে ও নদীনির্ভর মানুষদের জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘নদীতে যেতে না পারলে তারা কী খাবে?’
 

মোহাম্মদ সৈয়দ আলম আরও বলেন, এমনিতেই সীমান্ত এলাকার মানুষ নিত্যদিনের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। এর ওপর আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় তারা কোথায় যাবে বা কীভাবে বাঁচবে-তা নিজেরাও জানেন না।
 

তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রয়োজনে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হোক। সরকার যদি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে, তবে তারা অন্যত্র চলে যেতে প্রস্তুত। ‘এই অবস্থায় আমরা অসহায় হয়ে পড়ে আছি,’-বলেন তিনি।
 

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আলী আহমদ (৩০) বলেন, সীমান্তবর্তী লম্বাবিল এলাকায় বসবাস করায় বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশ করে মাইন পুঁতে যাচ্ছে এবং নির্বিচারে গোলাগুলি চালাচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় সাধারণ মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
 

আলী আহমদ আরও বলেন, ‘আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। একটি দেশের অভ্যন্তরে অন্য দেশের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ও হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি-আমাদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক এবং এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।’
 

এব্যাপারে ৬৪ বিজিবির পক্ষে থেকে জানানো হয়েছে- সীমান্তে স্থল মাইন বসানোর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। আর সত্যতা কতটুকু এটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার পাশাপাশি নজরদারি ও টহল জোরদার করেছে।
 

কক্সবাজারস্থ ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম বলেন, তুমব্রু এলাকায় বিজিবির নিয়মিত নজরদারি রয়েছে। এখনো ওই এলাকায় মাইন পুঁতে রাখার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে স্থানীয় জনগণকে সতর্ক করার পাশাপাশি পাশের দেশকে কঠোরভাবে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সীমান্তজুড়ে জোরদার করা হয়েছে টহল ও নজরদারি।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন