গাইবান্ধা সদরের বোয়ালী এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী মৌসুমী বেগম গোয়ালের গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করে এখন নিশ্চিন্তে রান্না করছেন। তিনি জানান, বায়োগ্যাস ব্যবহারের ফলে তার মাসিক খরচের তালিকা থেকে এলপিজি সিলিন্ডারের বড় একটি অংশ বাদ পড়েছে। এছাড়া মাটির চুলার তুলনায় এটি অনেক বেশি সুবিধাজনক।
মৌসুমী বেগম বলেন, ‘মাত্র তিন থেকে চারটি গরুর গোবর দিয়ে একটি ছোট পরিবার অনায়াসে দুটি চুলা ব্যবহার করতে পারে। একটি প্লান্ট স্থাপনে খরচ হয় প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, যা একবার বিনিয়োগ করলেই বছরের পর বছর সুবিধা পাওয়া যায়। এই গ্যাসে রান্না করলে পাতিল কালি হয় না, অতটা পরিশ্রম করা লাগে না। সময় বাঁচে, বিদ্যুৎ বিল বাঁচে, এলপি গ্যাসও বাঁচে। সরকার থেকে যদি কোনো ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে গ্রামের মানুষ খুব সহজেই বায়োগ্যাস তৈরি করে প্রয়োজন মেটাতে পারবে।’
শুধু রান্নার গ্যাসই নয়, বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে উপজাত হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সার। সুজন মিয়া নামে স্থানীয় এক কৃষক জানান, গ্যাস উৎপাদনের পর যে অবশিষ্টাংশ বা জৈব সার পাওয়া যায়, তা জমির জন্য খুবই কার্যকর। এই সার ব্যবহার করলে জমিতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন অনেক কমে যায়।
বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং পিকেএসএফের কারিগরি সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা এসকেএস ফাউন্ডেশন গ্রামে গ্রামে মানুষকে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করছে। এক্ষেত্রে ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভর্তুকিও দেয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি পর্যায়ে এমন ভর্তুকি ও সহায়তা বাড়ানো গেলে এর প্রসার আরও দ্রুত হবে।
আরও পড়ুন: চুয়াডাঙ্গায় বাজারের বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস, জ্বলছে চুলা
এসকেএস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি বাহারাম খান বলেন, ‘সরকারও যদি এরকম ছোট ছোট ভর্তুকি দিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে সাপোর্ট দেয়, তাহলে দেখবেন যে এটার ব্যাপক প্রসার ঘটবে। আমরা যেমন এক হাজার মানুষের সঙ্গে কাজ করছি, সরকার ইচ্ছা করলে এক লাখ মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারে।’
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে প্রায় আড়াই কোটি গরু রয়েছে। এই পরিমাণ গবাদিপশুর গোবর ব্যবহার করে প্রায় ৮৩ লাখ পরিবারের রান্নার গ্যাসের জোগান দেয়া সম্ভব। গত বছর দেশে প্রায় ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করতে হয়েছে, যার জন্য ব্যয় হয়েছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়লে এই আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
পরিবেশ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মির্জা শামীম আহসান হাবীব বলেন, ‘যাদের গরুর বা মুরগির খামার আছে, তাদেরকে বাধ্যতামূলক বায়োগ্যাসের আওতায় আনা দরকার। এটা করতে পারলে দেশের ইকোনমিক লোড অনেক কমে যাবে। এছাড়া এই বায়োগ্যাসকে যদি পরিশোধিত করে ক্ষতিকর গ্যাসগুলো সরানো যায়, তবে তা যানবাহন চলাচলেও ব্যবহার করা যেতে পারে।’
অবসরপ্রাপ্ত গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘মানুষের কাছে এটিকে আরও বেশি জনপ্রিয় করতে পারলে আমরা যেমন বিদেশি নির্ভরশীলতা কমাতে পারব, পাশাপাশি আমরা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে যে জৈব সার পাই, সেটিও পরিবেশবান্ধব হবে এবং রাসায়নিক সারের চাপ কমাবে।’
গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং মানুষের মধ্যে আরও বেশি জনপ্রিয় করতে পারলে বিদেশি নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারিভাবে কাজ চলছে।’
]]>
১ সপ্তাহে আগে
৪








Bengali (BD) ·
English (US) ·