জাতিসংঘ এ ঘটনাকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে মানবপাচারবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে। পরবর্তীতে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী হাজারো মানুষকে উদ্ধার ও ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি ট্রলার দুর্ঘটনা আবারও সেই বিভীষিকাময় অতীতের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা জাগিয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারে প্রায় ২৮০ জন যাত্রী—যাদের মধ্যে স্থানীয় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিক ছিলেন—নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। মাঝসমুদ্রে খাবার ও পানির সংকটকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, ট্রলারের গোপন কক্ষে আটকে রেখে অন্তত ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়। পরে আন্দামান সাগরে ট্রলারটি ডুবে গেলে আরও দুই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান।
বেঁচে ফেরা যাত্রীদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৬ এর রফিকুল ইসলাম (২৭) জানান, কাজের প্রলোভনে তাকে টেকনাফে এনে একটি গুদামে আটক রাখা হয়। পরে গভীর রাতে ছোট ট্রলারে করে মাঝসমুদ্রে বড় ট্রলারে তোলা হয়। ট্রলারে ভয়াবহ খাবার ও পানির সংকট ছিল। পানি চাইলে মারধর করা হতো। প্রতিবাদ করলে গোপন কক্ষে ঢুকিয়ে রাখা হতো।
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবি: নিখোঁজদের স্বজনদের দীর্ঘশ্বাস আর দালালের মিথ্যা আশ্বাস
৭ এপ্রিল রাতে পানির দাবিতে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে দালালরা প্রায় ৪০ জন করে যাত্রীকে একেকটি কক্ষে আটকে দেয়। শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তিনটি কক্ষ খুলে অন্তত ৩৩ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় বলে জানান রফিকুল। লাশগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এর কিছুক্ষণ পরই উত্তাল ঢেউয়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। রফিকুল প্রায় দুই দিন এক রাত সাগরে ভেসে থাকার পর একটি জাহাজের মাধ্যমে উদ্ধার হন। তার ভাষায়, ‘চারদিকে শুধু ভাসছিল লাশ—নারী ও শিশুরাও ছিল সেই তালিকায়।’
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়ায় ‘গ্যাং বোরহান’ সাম্রাজ্যে হানা, বাংলাদেশিসহ আটক ২৭
একই ঘটনার বর্ণনা দেন রাহেলা বেগম (২৫)। তিনি জানান, ট্রলারে থাকা ২০ জন নারীর মধ্যে একমাত্র তিনিই জীবিত ফিরে এসেছেন। কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে দুই দিন ভেসে থাকার পর তাকে উদ্ধার করা হয়।
এ ট্রলারডুবির ঘটনায় কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া ও বাঁশখালী এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিখোঁজদের স্বজনরা দিশেহারা হয়ে প্রিয়জনের খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছেন।
পেকুয়ার অন্তত ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন, রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়ার পাড়া এলাকার আব্দু রহিমের ছেলে মো.বেলাল উদ্দিন, আহমদ ছবির ছেলে মো. এহেসান, আব্দুল মালেকের ছেলে রহিম, হাজিরপাড়ার শহিদুল ইসলামের ছেলে সোহেল, নুরুল আমিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, নতুন ঘোনা গোদারপাড়ার বাদশা মিয়ার ছেলে রহুল কাদের, শহিদুল্লাহর ছেলে মানিক এবং আব্দুল হক কোম্পানির এক আত্মীয়। এছাড়া টৈটং ইউনিয়নের পেন্ডারপাড়া ও হিরাবুনিয়াপাড়া থেকে আরও ২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজ এহেসানের মা মোহসেনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলের সাথে শেষ কথা হয়েছিল ট্রলারে ওঠার পর। সে বলেছিল মা, চিন্তা করো না, পৌঁছে ফোন দিব। সেই ফোন আর আসেনি। এখন শুধু অপেক্ষা করছি, আমার ছেলেটা ফিরে আসুক।’
সোহেলের বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ছেলেটা পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। ভালো একটা জীবনের আশায় গেছে। এখন তার কোনো খোঁজ নেই আমরা বাঁচব কিভাবে?’
নিখোঁজ রহিমের স্ত্রী আজবাহার বেগম বলেন, ‘যাওয়ার সময় বলছিল তোমাদের ভালো রাখব। এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব? ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর মুখের দিকে থাকাতে পারি না।’
আরও পড়ুন: মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবি: সেই ‘গোপন কক্ষ’ ও ৩৩ লাশের রহস্য
রাশেদুল ইসলামের নানী ছফুরা খাতুন বলেন, ‘নাতিটা আমার চোখের সামনে বড় হইছে। বিদেশে গিয়ে কিছু করবে এই স্বপ্ন নিয়া ছিল। আল্লাহর কাছে একটাই দোয়া আমার নাতিরে যেন আমার বুকে ফিরায়া দে।’
অন্যদিকে, বেলালের মা ছালেহা বেগম ও স্ত্রী সুমি আক্তার বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনরা জানান, বেলাল সংসারের হাল ধরতেই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়িয়েছিলেন।
এদিকে একই ট্রলারে থাকা হামিদা বেগমের ছেলে মো. হাসান জীবিত ফিরে আসায় তাদের পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে নিখোঁজদের পরিবারের মাঝে এখনো অজানা শঙ্কা আর কান্না থামছে না।
পেকুয়ার বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমার ভাই মোহাম্মদ আলী ওই ট্রলারে ছিলেন। এখনো তার কোনো খোঁজ পাইনি। মা কান্না করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, এ ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র জড়িত। তারা দরিদ্র ও হতাশাগ্রস্ত মানুষকে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সাগরপথে পাঠায়।
রাজাখালী ইউপির সদস্য নেজাম উদ্দিন নেজু জানান, নিখোঁজদের পরিবারের পাশে তারা সার্বক্ষণিক আছেন এবং তাদের খোঁজে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি দালালদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলম জানান, পেকুয়া থানা এলাকার রাজাখালী ইউনিয়নের কয়েকজন লোক সাগর পথে মালেশিয়া যাওয়ার সময় নৌ ডুবির ঘটনা ঘটে যা আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জেনেছি । তাদের সাথে বর্তমানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নিখোঁজ পরিবারের পক্ষ থেকে কোন অভিযোগ পাইনি। তবে এবিষয়ে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় ও গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করে তথ্য অনুসন্ধান চলছে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শরীফ বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লেঙ্গুর বিল এলাকার ২৭ বছর বয়সী মোস্তাক আহমদও নিখোঁজদের একজন।
স্ত্রী ইসমত আরা জানাচ্ছিলেন, দালালকে দেওয়ার জন্য প্রথমে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। কিন্তু টাকা জোগাড়ের আগেই নিখোঁজ হয়ে যান মোস্তাক। শেষবার ফোনে শুধু বলেছিল, দোয়া করো। এরপর আর কোনো খবর নেই। এ কথা শেষ না করতেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না ইসমত।
আরও পড়ুন: টেকনাফে মালয়েশিয়া পাচারের নামে জিম্মি ৪ রোহিঙ্গা উদ্ধার, আটক ২
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছে, বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে এমন মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি প্রায় দুই শতাধিক মানুষের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো অজানা।
আন্দামান সাগরের নোনা জলে হারিয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোর স্বজনরা এখনো অপেক্ষায়—কেউ ফিরে আসবে, অথবা অন্তত কোনো খোঁজ মিলবে—এই আশায়।

১৫ ঘন্টা আগে
২







Bengali (BD) ·
English (US) ·