সাংবাদিকদের নামে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

১ দিন আগে
সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া ভাউচার ও সই জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে খোদ প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) বিরুদ্ধে। সভা-সেমিনার, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও গণমাধ্যম নিয়ে গবেষণার আড়ালে প্রতিষ্ঠানটিতে গড়ে উঠেছে জালিয়াতির চক্র।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু সাংবাদিকই নয়; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সুশীল সমাজের শতাধিক মানুষের নাম ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে ভুয়া বিল-ভাউচার। স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি বা জোরপূর্বক অবসরে পাঠিয়ে ঘনিষ্ঠদের অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দিয়ে প্রভাবশালী চক্র গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের বিরুদ্ধে।

 

সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মানোন্নয়নে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ। সাংবাদিকদের নাম ব্যবহার করে ভুয়া বিলের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। গত বছরের ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি 'তারুণ্যের উৎসব' আয়োজনের নামে ৪টি অনুষ্ঠান বাবদ খরচ দেখানো হয় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা। যদিও ওই দুদিন এমন কোনো কর্মসূচিই ছিল না সেখানে। অথচ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে টাকা।

 

এসব ঘটনার সত্যতা জানতে নথির সূত্র ধরে কথা হয় সময় টেলিভিশনের এক সময়ের ক্রীড়া সাংবাদিক মাহবুব রিমনের সঙ্গে। বর্তমানে তিনি অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও তার নাম ব্যবহার করে তুলে নেয়া হয় টাকা।

 

আরও পড়ুন: জালিয়াতি করে বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন ১২ জন, উপসচিব পদসহ কর্মরত ৪

 

মাহবুব রিমন বলেন, ‘আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি, আমরা নানা ধরনের প্রতারণার গল্প বলি। কিন্তু যখন আসলেই আমরা প্রতারিত হই… তখন সেটা ভিন্ন। এটি আমার স্বাক্ষর নয়, এবং যে অনুষ্ঠানের কথা বলা হচ্ছে, সেই নামও আমি কখনও শুনিনি।’

 

অংশগ্রহণকারীর তালিকায় নিজেদের নাম ব্যবহারের মাধ্যমে জালিয়াতির ঘটনায় অবাক হয়েছেন আরও কয়েকজন সাংবাদিক। এই তালিকায় শুধু টিভির নয়, পত্রিকার সাংবাদিকরাও রয়েছেন। দৈনিক সময়ের আলোর সহ-সম্পাদক নয়ন কুমার বর্মন বলেন, কাগজে যে সিগনেচার দেয়া হয়েছে, তা আমার স্বাক্ষরের সঙ্গে মিলে না।

 

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের প্রতিবেদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, কাগজে শুধু আমার নাম নয়, সেখানে আরও অনেকের নাম আছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির অনেক বড় সাংবাদিকের নামও আমি দেখেছি।

 

একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদক শফিকুল ইসলাম বলেন, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের অবশ্যই তদন্তপূর্বক বিচার করা উচিত।

 

ভুয়া প্রশিক্ষক ও আলোচকের নাম ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। তালিকায় থাকা বাংলাভিশনের সাংবাদিক মাইনুল ইসলামের খোঁজ নেয়া হলে জানা যায়, ওই নামে কোনো সাংবাদিকই সেই টেলিভিশনে নেই। বাংলাভিশনের এইচআর হেড বলেন, মাইনুল ইসলাম নামে বাংলাভিশনে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী কাজ করেন না।

 

শুধু গণমাধ্যমকর্মী নয়; অনেক সময় পিআইবি অর্থ হাতিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের নাম-পরিচয়ও ব্যবহার করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওবায়দুল হক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদসহ আরও কয়েকজনের নাম ভুয়া ভাউচারে সম্মানী ভাতার জন্য তোলা হয়েছে।

 

সম্মানীর তালিকায় থাকা এমন একজন হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিপন। তিনি মুঠোফোনে সময় সংবাদকে বলেন, ‘এটা আমি নই; নিশ্চিত থাকুন। আমার কাছে কাগজটির ছবি একজন পাঠিয়েছেন। আমি দেখেই খুব হেসেছিলাম।’

 

ঠিক এভাবেই ‘তারুণ্যের উৎসব’ নামে ৪টি আয়োজনে সাংবাদিক, শিক্ষক ও সুশীল সমাজের অন্তত ৪০০ ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কাঠগড়ায় রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান।

 

বরাদ্দের এসব টাকা লেনদেন হয় সোনালী ব্যাংকের ভিকারুননিসা নূন শাখায়। ২০২৫ সালের ২৯ ও ৩০ জুন চারটি চেকের মাধ্যমে প্রায় ২৪ লাখ টাকা তুলে নেন ‘তারুণ্যের উৎসবের’ সমন্বয়কারী পিআইবির পরিচালক গোলাম মুর্শেদ।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘গোলাম মুর্শেদের নামে টাকা তোলা হয়েছে। চেক ক্লিয়ারিং হলে; হিসাবের তথ্যে ক্লিয়ারিং লেখা থাকে। এখানে উনি চারটি চেকই উত্তোলন করেছেন।’

 

টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে গোলাম মুর্শেদ দাবি করেন, ‘তারুণ্যের উৎসব’ নামে কোনো আয়োজনই পিআইবিতে হয়নি। চেকগুলোর উৎপত্তি কোথা থেকে জানি না। কাগজটাই ভুয়া।’

 

তবে এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও মুঠোফোনে সময় সংবাদের কাছে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘যা কিছু আলোচনায় এসেছে, তা পুরোটাই ষড়যন্ত্র। সময় টিভি রেসপেক্টেড ফলে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। না হলে আমি কিছু বলতাম না। এই কাগজের সঙ্গে অনুষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। এই টাকার নামে যে কাগজগুলো প্রডিউস করা হয়েছে; সবই ভুয়া। এটা হচ্ছে ডিজিকে সরানোর লক্ষ্যে; কারণ ডিজি থাকলে তারা লুটপাট করতে পারে না। আমার অনেক ক্ষোভ, রাগ ও কষ্ট আছে। তবে আমি এখনই রেগে যাচ্ছি না; প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেব।’

 

আরও পড়ুন: চেক জালিয়াতি মামলায় বিচারিক এখতিয়ারে পরিবর্তন, অধ্যাদেশ জারি

 

অনুষ্ঠান নিয়ে পিআইবি মহাপরিচালক ও পরিচালকের মধ্যে দ্বিমতের মধ্যেই হঠাৎ হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন সেই প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা। তিনি ফারুক ওয়াসিফের নানা অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করেন।

 

জানা যায়, দুর্নীতি যেন নীতি হয়ে উঠেছিল ফারুক ওয়াসিফের নেতৃত্বে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সাংবাদিকদের যে সম্মানী দেখানো হয়েছে, সেখানে ৪০০ জন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন না এবং যেটি সাক্ষ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, সবই জাল। উনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের নামে সম্মানী প্রদানের ব্যবস্থা করেছেন, অথচ শিক্ষকরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না এবং টাকা গ্রহণও করেননি। বিভিন্ন কোম্পানিকে লাভ লাখ টাকা প্রদানের হিসাব দেখানো হয়েছে, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই।’

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংবাদিকতায় আলো ছড়ানো এই প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ পদের দায়িত্ব পেয়েছিলেন গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন কাজ করা ফারুক ওয়াসিফ। তার নেতৃত্বে এমন অনিয়ম কোনোভাবেই মানতে পারছেন না গণমাধ্যমকর্মীরা। ভুক্তভোগী সংবাদকর্মীরা সরকার ও দুদককে সক্রিয় হয়ে ফারুক ওয়াসিফসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন