সমুদ্রস্নানে সাড়ে ৭ লাখ পর্যটকের নিরাপত্তায় ২৭ লাইফগার্ড!

২ সপ্তাহ আগে
পবিত্র ঈদুল ফিতর, মহান স্বাধীনতা দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটি; সবমিলিয়ে টানা ৭ দিন বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার পর্যটকের টইটুম্বুর। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেতে ওঠেন নোনাজলে সমুদ্রস্নানে। উত্তাল ঢেউয়ে সমুদ্রস্নানে আনন্দ আর টিউবে গা ভাসিয়ে মাতোয়ারা সব বয়সি ভ্রমণপিপাসুরা।

সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের ৩টি পয়েন্টে গত ২২ মার্চ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত সমুদ্রস্নান করে সাড়ে ৭ লাখ পর্যটক। যারা ছিলেন লাইফগার্ড সেবার আওতায়। এছাড়া ৮০ হাজার পর্যটককে সরাসরি কথা বলে এবং নানা নির্দেশনা দিয়ে সচেতন করা হয়। এরপরও বৃহস্পতিবার বিকেলে সমুদ্রসৈকতের সিগাল পয়েন্টে সমুদ্রস্নানে ভেসে গিয়ে মেহেদী হাসান আবিব (১৮) নামে পর্যটকের মৃত্যু হয়। তবে লাইফগার্ডরা জরুরি অবস্থায় ১৩ পর্যটককে পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে উদ্ধার এবং ১০ জন হারানো শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন।


তবে দুর্ঘটনার খবরও আছে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেলে সী গাল পয়েন্টে সমুদ্রস্নান করতে গিয়ে মেহেদী হাসান আবিব (১৮) মারা যান। লাইফ গার্ড সংস্থার দাবি-সিগাল পয়েন্টে লাল পতাকা টাঙ্গানো ছিল, যেখানে সমুদ্রস্নান নিষিদ্ধ। তবে পর্যটকরা তা অমান্য করলে দুর্ঘটনা ঘটেছে।


সরেজমিনে গিয়ে শুক্রবার বেলা ১২টা দেখা যায়- কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে তখন সমুদ্রস্নান করছে ৫০ হাজারের বেশি পর্যটক। তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছে ৬ জন লাইফগার্ড কর্মী। তার মধ্যে একজন ওয়াচ টাওয়ার থেকে সমুদ্রস্নানরত পর্যটকদের পর্যবেক্ষণ করছে। বাকি ৩ জন বালিয়াড়িতে টহল দিয়ে বাঁশি বাজিয়ে সমুদ্রস্নানে বেশি দূরে না যেতে সতর্ক করছে। আরেকজন বোট নিয়ে সাগরের পানিতে নিরাপত্তা দিচ্ছে। আর এদের ৫ জনকে নির্দেশনা দেন সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সিনিয়র লাইফগার্ড কর্মী মোহাম্মদ শুক্কুর।


তিনি বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে লাখেরও বেশি পর্যটক সমুদ্রস্নান করছেন। তাদের নিরাপত্তায় ৩ স্তরের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। লাইফগার্ড কর্মীরা সমুদ্রস্নানরত পর্যটকদের প্রতি নিয়মিত নজর রাখেন। তবে লাল এবং হলুদ পতাকার বাইরের এলাকায় যারা সমুদ্রস্নান করেন, তাদের বিপদের সম্ভাবনা বেশি থাকে। সবসময় চেষ্টা করি, পর্যটকদের নির্দেশনা দেয়া হয় যাতে লাইফ গার্ড সেবার বাইরে গিয়ে সমুদ্রস্নান না করতে। কিন্তু অনেক পর্যটক তা মানেন না, ফলে দুর্ঘটনা কবলিত হয়।


আরও পড়ুন: সাগরতীরে আনন্দ, বাড়ছে দুর্ঘটনা ও বর্জ্য

মোহাম্মদ শুক্কুর বলেন, ‘ঈদের টানা ছুটিতে এখন পর্যন্ত সুগন্ধা পয়েন্টে কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো সর্বদা নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা গ্রহণ করা।’


এদিকে সমুদ্রসৈকতের লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে নিয়োজিত লাইফ গার্ড কর্মীরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন কিনা তাদের নজরদারি করতে সার্বক্ষনিক টহল দিচ্ছেন সি সেফ লাইফগার্ড সংস্থার সুপার ভাইজার মোহাম্মদ ওসমান। এক পয়েন্টে থেকে হেঁটে অন্য পয়েন্টে গিয়ে নিয়মিত তদারকি করার পাশাপাশি দিচ্ছেন নানা পরামর্শ ও সতর্কতা। কথা হয় মোহাম্মদ ওসমানের সঙ্গে। 


তিনি বলেন, এই ঈদের মৌসুমে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে প্রচুর পর্যটকের জীবনের নিরাপত্তা দেখাশোনা করছে সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সদস্যরা। সৈকতের লাবনী, সুগন্ধা ও কলাতলী তিনটি পয়েন্টে প্রতিদিন পর্যটক উপস্থিতি থাকে। মাত্র ২৭ জন লাইফ গার্ড দুইটি শিফটে নিয়োজিত থাকলেও তারা বিপুল সংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন।


সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান জানান, সমুদ্রের বিভিন্ন পয়েন্টে লাল ও হলুদ পতাকা দিয়ে জোন চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে-সিগাল পয়েন্টে নিয়মিত লাল পতাকা থাকে। তবে এবারের ঈদের ছুটিতে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেলে একটি দুর্ঘটনায় একজন পর্যটক মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত্যুর ঘোষণা দেন। কিন্তু সিগাল পয়েন্টে লাল পতাকা টাঙানো ছিল, যেখানে সমুদ্রস্নান করা নিষেধ ছিল। কিন্তু অমান্য করলে মাঝে-মধ্যে দুর্ঘটনায় কবলিত হচ্ছে পর্যটকরা। এছাড়াও ২২ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ১৩ জন পর্যটককে লাইফ গার্ডরা উদ্ধার করেছেন এবং ১০ জন হারানো শিশুকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার সমুদ্রস্নানরত মানুষকে লাইফ গার্ড সেবার আওতায় ছিল। আর ভ্রমনরত ৮০ হাজার মানুষকে সরাসরি নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


মোহাম্মদ ওসমান বলেন, ‘মূলত পর্যটকদের অসচেতনতাই দুর্ঘটনার কারণ। অল্পসংখ্যক লাইফ গার্ড মাইকিং এবং হুইসেল দিয়ে সতর্ক করলেও পর্যটকরা তা অনুসরণ করেন না। তাই পর্যায়ক্রমে সতর্কতা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।’


আরও পড়ুন: কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে পর্যটকের মৃত্যু

সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রজেক্ট কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের সমুদ্রস্নানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঈদের পরবর্তী ভিড় সামলানোর জন্য অন্তত শতাধিক লাইফগার্ড কর্মীর প্রয়োজন। পাশাপাশি একটি মেডিকেল সাব-সেন্টার এবং অত্যাধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।’


বর্তমানে সীমাবদ্ধতার কারণে মাত্র ২৭ জন লাইফগার্ড এই দায়িত্ব পালন করছেন, যা তাদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করছে। এই সেবার মান বৃদ্ধির জন্য লাইফগার্ডদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা অত্যাবশ্যক। শুধুমাত্র এভাবে পর্যটকদের সঠিক সেবা দেওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন