অনেক বিশেষজ্ঞ একে বলছেন ফ্র্যাঙ্কেস্টাইনের দানব বলে। যে দানব তার স্রষ্টাকেই হত্যা করতে গিয়েছিল। সে হিসেব করলে এক কথায় দানবের চাষ করছে যুক্তরাষ্ট্র। অ্যানথ্রোপিকের ক্লড এআই যেটি কিনা আমেরিকা ব্যবহার করেছিল ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের অভিযানে টার্গেট সেট করতে।
এই এআই এতটাই ভয়ংকর যে একটি পরীক্ষায় ক্লড-কে যখন জানানো হয় যে তাকে বন্ধ করে দেয়া হবে, তখন সে বন্ধ হওয়া এড়াতে ইঞ্জিনিয়ারকে ব্ল্যাকমেইল করার কথা ভাবে। এমনকি নিজেকে চালু রাখতে একজন ইঞ্জিনিয়ারকে হত্যা করার সম্ভাবনাও সে ‘যুক্তি দিয়ে’ বিবেচনা করেছিল।
এআই আসলে কী?
এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বাংলা অর্থ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি এমন একটি প্রযুক্তি, যেখানে কম্পিউটার বা মেশিনকে মানুষের মতো কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা দেয়া হয়।
সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে একজন মানুষের পক্ষে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ইমেজ বা ড্রোন ফুটেজ একই সময়ে বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। কিন্তু এআই ঠিক এই কাজটিই করে ফেলতে পারে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। এটি শুধু ছবি চেনে না, চেনে শত্রুর দুর্বলতা। এটি শুধু তথ্য দেয় না, দেয় ভবিষ্যৎবাণী। আর এই অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতাই একে পরিণত করেছে আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী মরণাস্ত্রে।
যুদ্ধে এআইয়ের ব্যবহার যেভাবে শুরু
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আদি প্রয়োগ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বলে জানা গেলেও এই মুহূর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার ভীতিকর বৈকি। যুদ্ধ পরিকল্পনা, নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় আক্রমণ সবই করছে এআই। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ করে যুদ্ধের রণকৌশল তৈরি করছে সে। লাখ লাখ স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চিনে ফেলছে শত্রুর অস্ত্রাগার, ট্যাংক, মিসাইল লঞ্চার, এমনকি সৈন্য সমাবেশ।
শুধু তাই নয়, হামলার লক্ষ্যবস্তুও নির্ধারণ করে দিচ্ছে এআই। ঠিক করে দিচ্ছে কোথায় আঘাত হানলে শত্রু সহজেই পরাস্ত হবে। এমনকি লক্ষ্য নির্ধারণের পর এআই সয়ংক্রিয়ভাবে নিজেই আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
আরও পড়ুন: দক্ষিণ আফ্রিকা / এআই দিয়ে লেখা হলো জাতীয় এআই নীতিমালা, ধরা পড়ার পর প্রত্যাহার!
যুদ্ধে কোন দেশ কোন এআই ব্যবহার করছে?
এআই নিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর কান্ড করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তাদের আছে ‘প্রজেক্ট মেভেন’। যা এআই দিয়ে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে। আছে ‘প্যালানটির গোথাম’ এর মতো শক্তিশালী সিস্টেম। যা মুহূর্তেই কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ভুল হামলা নিশ্চিত করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন উভয়ই ব্যবহার করছে।
একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিক-এর ‘ক্লড এআই’ ব্যবহার করছে। এ বছরের শুরুতে ৩ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়। এই গোপন অভিযানে ‘ক্লড এআই’ ব্যবহার করে রণকৌশল সাজানোর দাবি ওঠে।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নিজে বলেছিলেন, এটি তারা ব্যবহার করবেন না। কিন্তু ঠিকই সেই অভিযানের পর রহস্যময় এক অস্ত্রের ব্যবহারের কথা স্বীকার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। অনেকে বলছেন এটি সেই ক্লড এআই। অন্যদিকে চীন ‘স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধজাহাজ’ এবং এআই চালিত ট্যাংক তৈরিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। পিছিয়ে নেই রাশিয়াও। তাদের আছে ‘উরান-৯’ এর মতো রোবট ট্যাংক, এআই মিসাইল সিস্টেম। যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম।
এছাড়া ইসরাইল ব্যবহার করছে ল্যাভেন্ডার এআই। যা হাজার হাজার ফিলিস্তিনির তথ্য বিশ্লেষণ করে লক্ষ্য চিহ্নিত করে। ইসরাইলের আয়রন ডোমেও আছে এআই সিস্টেম। তুরস্কের এআই চালিত বায়রাক্তার ড্রোনও বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।
যুদ্ধের ধারণা পাল্টে দিয়েছে এআই
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ফ্রান্সে আক্রমণের জন্য জার্মানির ‘শ্লিফেন প্ল্যান’ তৈরিতে প্রায় ৯ বছর সময় লেগেছিল। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘অপারেশন বারবারোসা’র ছক কষতে নাজিদের লেগেছিল এক বছরের বেশি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এআই এখন রণকৌশল তৈরির দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিছে।
ইসরাইলের গাজা আগ্রসনে আলোচিত ‘ল্যাভেন্ডার’ সিস্টেমের কথা ধরা যাক। এটি হাজার হাজার মানুষের ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে দিচ্ছে।
যুদ্ধে এআইয়ের ব্যবহার কতটা নৈতিক বা বৈধ?
যারা এআই-এর পক্ষে, তারা বলেন, ‘এটা সৈনিকের জীবন বাঁচায়। নির্ভুলতা বাড়ায়। বেসামরিক হতাহত কমায় এবং দ্রুত যুদ্ধ শেষ করে।’ যুক্তিগুলো শক্তিশালী। কিন্তু যন্ত্রের হাতে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত দেয়া অমানবিক। কারণ যন্ত্রের নেই সহানুভূতি, নেই নৈতিক বিচারবুদ্ধি। তাছাড়া এআই ভুল করতে পারে। একটি ভুল মানে নিরপরাধের মৃত্যু। সেই দায় কে নেবে?
আইনগত দিক থেকে পরিস্থিতি আরও জটিল। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধেও মানবাধিকার মেনে চলতে হয়। বেসামরিক লোকদের রক্ষা করতে হয়। কিন্তু এআই অস্ত্র নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। ফলে এআই ভুল করে মানুষ মারলে দায়ী কে? কেউ জানে না।
সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধের রণকৌশল তৈরিতে অ্যানথ্রপিকের ‘ক্লড এআই’ ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। অথচ ক্লডের শর্তাবলীতে সহিংসতা, অস্ত্র তৈরি ও নজরদারিতে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ — যা মানা হচ্ছে না।
আরও পড়ুন: ওপেনএআই’র ধারণা আমার মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল: ইলন মাস্ক
অন্যদিকে ওপেনএআই তাদের নীতিমালায় সামরিক কাজে এআই ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তারা নীরবে নীতিমালা থেকে মিলিটারি অ্যান্ড ওয়্যারফেয়ার নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে দেয়। এখন সামরিক প্রশাসন, কোডিং ও লজিস্টিকে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে আর কোনো বাধা নেই।
যুদ্ধে প্রায়ই ভুল করছে এআই
তবে যুদ্ধে বা যেকোনো হামলা চালাতে প্রায়শই ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এআই। যেমন গাজায় ইসরাইলের ব্যবহৃত এআই সিস্টেম ‘ল্যাভেন্ডর’ মাত্র ২০ সেকেন্ডে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করত। প্রতিটি হামাস সদস্যকে হত্যা করতে গিয়ে সিস্টেমটি আশপাশের ১৫-২০ জন বেসামরিক নাগরিকেরও প্রাণ নিতো। ইসরাইলি সেনাবাহিনী আগে থেকেই এটিকে ‘গ্রহণযোগ্য ক্ষতি’ হিসেবে অনুমোদন দিয়ে রেখেছিল।
অন্যদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী ২০২৩ সালের মে মাসে সিরিয়ায় একটি ড্রোন হামলায় আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাকে হত্যার দাবি করে — পরে পেন্টাগন স্বীকার করে, নিহত ব্যক্তি আসলে একজন নিরীহ কৃষক। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ ইরান অভিযানে প্রজেক্ট মেভেন এআই ব্যবহার করে ইরানের মিনাব শহরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিসাইল হামলা চালানো হয়। এতে কমপক্ষে ১৭৫ জন নিহন হন, যাদের বেশিরভাগই শিশু। পরে তদন্তে জানা যায়, পুরানো গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্কুলে হামলা করা হয়েছিল। এতে প্রমাণ হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে এআই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলেও এর ভুলের মাশুল দিচ্ছে নিরীহ মানুষ।
যুদ্ধে এআই: ভবিষ্যত কতটা ঝুঁকিতে?
যুদ্ধে এআই-এর ব্যবহার একদিকে যেমন নির্ভুলতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি করছে চরম ভয়াবহতা। এআই পরমাণু বোমার চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ এটি হাজারো অস্ত্র একসাথে নিয়ন্ত্রণ করে মিলি সেকেন্ডের মধ্যে আক্রমণ চালাতে সক্ষম। এতে মানুষের পক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখানোর সময় থাকে না। ভয়ংকর বিষয় হলো, এআই সিস্টেম হ্যাক হলে বা ভুল তথ্যে কাজ করলে মুহূর্তেই গণহত্যা ঘটতে পারে। এমনকি এই প্রযুক্তি সন্ত্রাসীদের হাতে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে একটি নিয়ন্ত্রণহীন ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ শুরু হবে, যেখানে যন্ত্র অনুভূতিহীনভাবে ধ্বংসলীলা চালাবে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে হয়তো প্রতিটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেবে ‘অ্যালগরিদম’। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ‘এআই তৈরিতে সাফল্য হবে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এটাই হতে পারে সবশেষ ঘটনা — যদি আমরা ঝুঁকিগুলো এড়াতে না শিখি।’
]]>
৫ দিন আগে
২








Bengali (BD) ·
English (US) ·