যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের মেঘ-বৃষ্টি চুরির অভিযোগ, বিজ্ঞান কী বলছে?

৬ দিন আগে
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য দাবি মধ্যপ্রাচ্যের একটি পরিচিত প্রশ্নকে পুনরায় উসকে দিয়েছে: দেশগুলো কি আবহাওয়াকে ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে পারে? ইরান, ইরাক ও তুরস্কের কিছু অংশে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পর অভিযোগ উঠেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্লাউড সিডিং বা গোপন আবহাওয়া ব্যবস্থার মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বৃষ্টির ধরনে কারসাজি করছে, এমনকি ইরান থেকে বৃষ্টিপাত ‘চুরি’ করছে।

একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, ইরান ওই অঞ্চলে কয়েক ডজন মার্কিন ও ইসরাইলি রাডার ধ্বংস করার পর মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। তারা ইরানের বিরুদ্ধে বহুল আলোচিত ‘জলবায়ু যুদ্ধকে’ সমর্থন করছে।

 

After Iran destroyed dozens of US and Israeli radars in the region, it is raining and raining. It hasn't rained this much in decades.
The climate war against Iran as warned by former Iranian President Ahmadinayad proved to be true. pic.twitter.com/prUsnPiNgU

— Iranian Force (@MrImranPk) April 25, 2026

 

কিন্তু বিজ্ঞান ও উপলব্ধ প্রমাণাদি নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র ফুটে ওঠে। এসব দাবির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ক্লাউড সিডিং, যা একটি বাস্তব কিন্তু প্রায়শই ভুলভাবে বোঝা কৌশল। 

 

আরও পড়ুন: ৫ জেলায় বন্যার শঙ্কা, ৪ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো বিদ্যমান মেঘে কণা ছড়িয়ে দিয়ে বৃষ্টিপাত বাড়াতে ক্লাউড সিডিং পদ্ধতি ব্যবহার করে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর প্রভাব সীমিত, স্থানীয় এবং অপ্রত্যাশিত। কারণ এটি মেঘ তৈরি করতে, ঝড়কে সীমান্তের ওপারে প্রবাহিত করতে বা আঞ্চলিক আবহাওয়া ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

 

Iran was in drought for decades.

No rain. Not an inch.

After they attacked the rain seeding installations in Arab countries, their drought ended in 5 days.

You put two and two together. pic.twitter.com/w0aVZJT5Fs

— tic toc (@TicTocTick) April 23, 2026

 

আরও চাঞ্চল্যকর দাবিগুলোতে প্রায়শই হার্প (HAARP)-এর কথা উল্লেখ করা হয়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত একটি স্থাপনা এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগে প্রায়শই এর উদ্ধৃতি দেয়া হয়।

 

প্রকৃতপক্ষে, হার্প বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বভাগ, বিশেষত আয়নোস্ফিয়ার নিয়ে গবেষণা করে, অথচ আবহাওয়া ব্যবস্থাগুলো আরও অনেক নিচের ট্রপোস্ফিয়ারে গঠিত হয়। এটি বৃষ্টিপাতকে প্রভাবিত করতে বা ঝড় সৃষ্টি করতে পারে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

 

এর উত্তর নিহিত রয়েছে বেশ কিছু শক্তিশালী ও বাস্তব জলবায়ুগত কারণের সমন্বয়ে। বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেন, যা বৈশ্বিক জলচক্রকে আরও তীব্র করে তুলছে। উষ্ণ বায়ু অধিক আর্দ্রতা ধরে রাখে, যার ফলে যখন বৃষ্টি হয়, তখন প্রায়শই মুষলধারে হয়।

 

এই কারণেই এখন শুষ্ক অঞ্চলগুলোতেও অল্প সময়ের জন্য ভারি বৃষ্টিপাত দেখা যাচ্ছে।

 

এর একটি প্রধান চালিকাশক্তি হলো অস্বাভাবিক উষ্ণ ভূমধ্যসাগর। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রা বাষ্পীভবন বাড়িয়ে দেয়, ফলে বায়ুমণ্ডল আর্দ্রতায় পূর্ণ হয় যা পরবর্তীতে ইরান, ইরাক ও তুরস্কের অভ্যন্তরে পরিবাহিত হয়। এর ফলে ভূমধ্যসাগর কার্যত ঝড়ের জন্য একটি ‘জ্বালানি ট্যাঙ্কে’ পরিণত হয়। 

 

ছবি: সংগৃহীত

 

একই সময়ে, জেট স্ট্রিমের (উচ্চ-উচ্চতার বায়ুপ্রবাহ, যা আবহাওয়া ব্যবস্থাকে চালিত করে) পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন আরও অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। স্থিরভাবে চলার পরিবর্তে, এই স্রোতগুলো থেমে যেতে পারে, যার ফলে ঝড় নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর দীর্ঘক্ষণ থেকে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিপাত ঘটায়।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক অবস্থান এর প্রভাবকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই অঞ্চলের বেশিরভাগই মরুভূমি বা আধা-শুষ্ক, যেখানে শুষ্ক মাটি দ্রুত পানি শোষণ করতে পারে না। এর ফলে, এমনকি তুলনামূলকভাবে স্বল্পস্থায়ী ঝড়ের সময়েও দ্রুত পানিপ্রবাহ এবং আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। 

 

আরও পড়ুন: এমন বৃষ্টি কতদিন থাকবে, জানাল আবহাওয়া অফিস

 

সম্মিলিতভাবে, এই কারণগুলো এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করছে যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ওয়েদার হুইপল্যাশ’ বা আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন বলে বর্ণনা করেন, অর্থাৎ দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর হঠাৎ তীব্র বৃষ্টিপাত। যদিও এই ধরনের চরম অবস্থা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, তবে এগুলো ক্রমবর্ধমান উষ্ণ জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

 

Images of Lake Rania in Iraq before the rain (2025) and after the rain (2026).
​Do you think it is a coincidence? pic.twitter.com/3v6cj2uZ9L

— Iran TV (@Iran_TVHD) April 23, 2026

 

এই অভিযোগের নেপথ্যে কী?

 

অভিযোগগুলো ওই অঞ্চলের পানি সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগেরই প্রতিফলন। 

 

ইরান এর আগেও প্রতিবেশী অনেক দেশের বিরুদ্ধে বৃষ্টিপাতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশগত সংকটের সময়েই এ ধরনের দাবি প্রায়শই উঠে আসে। 

 

তবে বিজ্ঞান বলছে, বর্তমানে কোনো দেশই আঞ্চলিক আবহাওয়া ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে বা বৃষ্টিপাতকে সীমান্তের ওপারে প্রবাহিত করতে পারে না।

 

চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘন ঘন ঘটার সাথে সাথে ভুল তথ্যের বিস্তার বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।

 

বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, আসল চ্যালেঞ্জ লুকানো আবহাওয়াগত অস্ত্র নয়, বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া, যা ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে দিচ্ছে।

 

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

 

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন