দেশের শেভিং ব্লেডের বাজারে অবৈধ পণ্যের দাপট ক্রমেই বাড়ছে। কোটি কোটি টাকার চোরাই ব্লেডে ছেঁয়ে গেছে পাইকারি ও খুচরা বাজার। সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের তৎপরতায় অবৈধভাবে আসছে এসব পণ্য।
সূত্র জানায়, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বেল ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিলেট ইন্ডিয়ার সঙ্গে অফিশিয়াল ডিস্ট্রিবিউশন চুক্তি বাতিল করে। এরপর বৈধ আমদানি বন্ধ থাকলেও বাজারে জিলেট শেভিং ব্লেডের সরবরাহ কমেনি। বরং সীমান্তের বৈধ ও অবৈধ পথে চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে ঢোকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সীমান্তবর্তী যশোরের বিভিন্ন অঞ্চলের খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে এসব অবৈধ ব্লেড। বৈধ আমদানি বন্ধ থাকা সত্ত্বেও পাইকাররা কীভাবে এসব পণ্য সংগ্রহ করছেন, সে বিষয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি দোকানদাররা।
আমদানিকারক উজ্জল জানান, যারা নিয়ম মেনে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কাঁচামাল আমদানি করে দেশে উৎপাদন করছে। সেই দেশীয় প্রস্তুতকারকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অবৈধ পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তারা টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
আরও পড়ুন: কসবা ও ব্রাহ্মণপাড়া সীমান্তে সাড়ে ৩ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ
বেনাপোল বন্দরের আমদানিকারক ইদ্রিস আলী বলেন, ‘দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই কালোবাজার আরও বিস্তৃত হবে এবং দেশীয় শিল্পের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব খাতেও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
বেনাপোল কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার সাকিব রায়হান জানান, গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে বাংলাদেশগামী একটি ভারতীয় ট্রাক তল্লাশি করে ১৫ কোটি টাকার মিথ্যা ঘোষণার পণ্যের চালান আটক করে পেট্রাপোল কাস্টমস। পণ্যের আমদানিকারক ছিল বেনাপোলের ব্যবসায়ী হাসানুজ্জামানের মারিকাধীন মেসাস জামান ট্রেডার্স। ভারতীয় কাগজপত্রে ১৬টি চালানকে মোটরসাইকেল পার্টস হিসেবে রফতানির ঘোষণা করা হলেও ট্রাকগুলোতে ছিল জিলেট ব্লেডের বড় চালান।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ‘জিলেট’ বাংলাদেশে তাদের অফিসিয়াল ডিস্ট্রিবিউশন কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। তবে ব্র্যান্ডটির নাম ব্যবহার করে ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ব্লেড দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন, পাশাপাশি বাজারে নকল ও অননুমোদিত পণ্যের বিস্তার বাড়ছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে চোরাচালানের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়েছে। গত বছরের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দ করা হয়। এছাড়া ২৬ এপ্রিল সিলেটে সেনাবাহিনীর অভিযানে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকার এবং বিজিবির পৃথক অভিযানে ৬ কোটি টাকার চোরাই মালামাল উদ্ধার করা হয়। একদিনেই মোট ৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার অবৈধ পণ্য জব্দের ঘটনা আলোচনার জন্ম দেয়। এসব পণ্যের মধ্যে শেভিং ব্লেডও ছিল।
আরও পড়ুন: বিজয়নগর সীমান্তে সাড়ে ৯ কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব অভিযান বিচ্ছিন্ন; বাজার পর্যায়ে নজরদারি দুর্বলই রয়ে গেছে। পাইকারি বাজারে প্রকাশ্যেই চোরাই ব্লেড বিক্রি হলেও কার্যকর তদারকি খুব একটা দেখা যায় না। ফলে চোরাকারবারিরা আরও সংগঠিত হয়ে নতুন কৌশলে পণ্য পাচার করছে—কখনো পাথরের নিচে লুকিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করানো হচ্ছে ব্লেডের চালান।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন ও যোগাযোগ বিভাগের প্রধান বলেন, ‘বংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) গবেষণা অনুযায়ী দেশের কসমেটিকস বাজারের আকার প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শেভিং পণ্যের বাজার ২০২৬ সালের মধ্যে ১,০০০ থেকে ১,২০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে বাজারের প্রায় অর্ধেকই অবৈধ পণ্যের দখলে থাকায় প্রকৃত আকার আরও বড় হতে পারে।
অবৈধ আমদানির কারণে সরকার প্রতিবছর কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। শেভিং ও কসমেটিকস পণ্যে উচ্চ হারে শুল্ক ও ভ্যাট থাকলেও চোরাই পণ্য কোনো কর ছাড়াই বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল’র হিসাব অনুযায়ী, শুধু তাদের পণ্যের অবৈধ আমদানির কারণেই বছরে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চোরাচালান বন্ধ করা গেলে একাধিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকার শুল্ক ও ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারবে, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে, বাড়বে কর্মসংস্থান। পাশাপাশি ভোক্তারা নকল ও মানহীন পণ্যের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পাবেন।
আরও পড়ুন: কুড়িগ্রামের সীমান্ত থেকে ৪২ লাখেরও বেশি টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের দাবি, অবৈধ আমদানি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং বাজারে নিয়মিত অভিযান জরুরি। তা না হলে সম্ভাবনাময় এই শিল্প খাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে।

১ সপ্তাহে আগে
২








Bengali (BD) ·
English (US) ·