মাদক বিক্রির নিরাপত্তায় সড়কজুড়ে সিসি ক্যামেরা!

৫ দিন আগে
লালমনিরহাটের বোডের হাট। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত লাগোয়া ছোট্ট এই গ্রামের প্রায় প্রতি দুই-এক ঘর পরপরই কেউ না কেউ মাদক কারবারে জড়িত। নিভৃত এই পল্লীর একটি বাড়ির চারপাশে এবং সড়কজুড়ে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে স্বাভাবিকভাবেই যে কারও চোখ কপালে ওঠার কথা!

বাড়ির সামনে যেতেই দেখা যায়, দামি মোটরসাইকেলে করে একের পর এক যুবক আসছেন আর বিভিন্ন নেশাজাতীয় সিরাপ কিনছেন। এদের বেশিরভাগই রংপুরসহ উত্তরের বিভিন্ন জেলা শহর থেকে আসা। ঘরের ভেতর থেকে দরজা আটকে জানালা দিয়ে চলছে মাদকের রমরমা বিকিকিনি।

 

বাড়ির বাইরে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর কারণ জানতে চাইলে এক মাদকসেবী জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতেই মাদক ব্যবসায়ীর এই অভিনব পদ্ধতি। চারদিকের রাস্তা মনিটরিং করার জন্য ঘরের ভেতরে রয়েছে মনিটর ও ‘ওয়াচ ম্যান’ বা পাহারাদার।

 

গত এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি রংপুরের ৬টি সীমান্ত জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে অন্তত এক সপ্তাহ ঘুরে মাদক চোরাকারবারিদের ওপর নজর রাখে সময় সংবাদ। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো মোটরসাইকেলে ঘুরে বেশ কিছু মাদকের রুট সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

 

আরও পড়ুন: উত্তরে নিখোঁজ ৫০ নদী!

 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের বেশ কিছু সীমান্ত পথে রক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে ঢুকছে বিভিন্ন মাদক। এই ৬ জেলার প্রায় ৭০০ কিলোমিটার সীমান্ত পথের বেশ কিছু অংশ অরক্ষিত। সেই সব সীমান্ত দিয়েই বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে মাদক ঢুকছে এপারে।

 

তবে মাদক ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকসেবীদের কাছে একসময় তুমুল জনপ্রিয় ভারতীয় সিরাপ ‘ফেনসিডিল’র উৎপাদন ওপারে বন্ধ থাকায় অন্তত এক বছর ধরে তা আসা বন্ধ আছে। তবে এর বিকল্প হিসেবে বাজারে এসেছে একই ধরনের নেশাজাতীয় সিরাপ ‘ফায়ারডিল’ ও ‘স্ক্যাফ’। এগুলোও সীমান্তের ওপার থেকে আসছে। পাশাপাশি ভারতীয় মদ, গাঁজা এবং ইয়াবাও ঢুকছে এপারে। সীমান্ত গলে ঢুকে পড়া এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে উত্তরের সীমান্ত জেলা এমনকি রাজধানীতেও।

 

রংপুর বিভাগের ৮টি শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে উত্তরের নিভৃত গ্রামের পথঘাট সবখানেই যেন মরণনেশার ছড়াছড়ি। মাদকসেবী আর কারবারিদের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ।

 

স্থানীয়রা জানান, দুপুরের পর থেকে মিনিটে অন্তত ৮ থেকে ১০টি মোটরসাইকেল ছুটে যায় সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর দিকে। শুক্রবার বাইকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। প্রতিটি মোটরসাইকেলে কমপক্ষে দুজন, আবার কোনো ক্ষেত্রে তিনজনও থাকেন। রংপুর শহর থেকে লালমনিরহাটের বোডের হাট সীমান্তের দূরত্ব অন্তত ৪০ কিলোমিটার। শহর থেকে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত মহিপুর ব্রিজ পাড়ি দিয়ে মোটরসাইকেলগুলো বোডের হাট, দইখাওয়া, দলগ্রামসহ বিভিন্ন সীমান্তে যায়।

 

আরও পড়ুন: যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে?

 

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশের ১৮টি সীমান্ত জেলার মধ্যে ৬টিই রংপুরে। রাতের আঁধারে কখনো নদীপথে ভাসিয়ে, কখনো কাঁটাতার গলে মাদক পাচার করেন চোরাকারবারিরা। মাঝে মাঝে চুনোপুঁটি চোরাকারবারিরা ধরা পড়লেও গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ‘ম্যানেজ’ করেই এই কারবার চলছে বলে দাবি করেছেন সীমান্তের একাধিক বাসিন্দা।

 

রংপুর শহরের এক মাদক ব্যবসায়ী জানান, বর্তমানে শহরে মাদকের সবচেয়ে বড় স্পট বৈরাগীগঞ্জ। এ ছাড়া নগরীর লালবাগ, কেডিসি রোড এবং হারাগাছেও মাদকসেবীদের আড্ডা জমে।

 

উত্তরের কয়েকশ কিলোমিটার সীমান্ত ঘুরে জানা যায়, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও আদিতমারী সীমান্ত দিয়ে মাদক কারবারিরা যাতায়াত করেন। কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী, রাজীবপুর ও রৌমারী উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ভারতীয় মাদক প্রবেশ করে। দিনাজপুর ও পঞ্চগড় সীমান্তের হিলি, বোচাগঞ্জ এবং বাংলাবান্ধা সংলগ্ন সীমান্ত এলাকাগুলোও মাদক চোরাচালানের অন্যতম রুট।

 

শহরের তুলনায় সীমান্ত এলাকায় মাদকের দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় বিকেল বা সন্ধ্যায় এসব এলাকায় কারবার জমে ওঠে।

 

দিনাজপুরের হিলি সীমান্তের একজন ভ্যানচালক জানান, এখন সারা বছরই উত্তরের জমিগুলোতে কোনো না কোনো আবাদ হয়, তাই কাজহীন কেউ বসে থাকেন না। তবে মাদক ব্যবসায় লাভ বেশি হওয়ায় ঝুঁকি জেনেও অনেকে এ পেশায় ঝুঁকছেন। তার মতে, মাদকের কারণে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে চুরি, ডাকাতি ও খুনখারাবি মারাত্মক হারে বাড়ছে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন