ভারত সরকারের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া অত্যাধুনিক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সটি চার বছর ধরে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে অযত্নে পড়ে আছে। ব্যবহার না হওয়ায় লাইফ সাপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের দায়দায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক, আর সংকটাপন্ন রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন জরুরি সেবা থেকে।
নোয়াখালীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের নির্মাণাধীন ভবনের পাশে খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে অত্যাধুনিক একটি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স। অযত্নে-অবহেলায় অ্যাম্বুলেন্সের গায়ে ধুলাবালু জমেছে। ভারত সরকারের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া জীবন রক্ষাকারী অত্যাধুনিক অ্যাম্বুলেন্সটি ২০২২ সালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংকটাপন্ন রোগীকে দ্রুত ও নিরাপদে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যত্র উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানোর কাজে ব্যবহারের কথা ছিল এই অ্যাম্বুলেন্সের। তবে হস্তান্তরের পর থেকে এক দিনের জন্যও এটি ব্যবহৃত হয়নি। দীর্ঘ চার বছর পড়ে থেকে এটির সব যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে।
হস্তান্তরের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সটি চালানোর জন্য চালক থেকে শুরু করে কোনো প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দেয়নি। উল্টো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, অ্যাম্বুলেন্সটি হস্তান্তর হওয়ার পর থেকেই ব্যবহার অনুপযোগী ছিল। তবে অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় এটি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরিকল্পনা ও উদ্যোগ না থাকায় এই স্বাস্থ্য সরঞ্জামটি রোগীদের সেবায় কাজে লাগানো হয়নি।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের নবনির্মিত ভবনের সামনে এক কোণে পড়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সটির গায়ে ধুলাবালুর আস্তরণ জমেছে। এটির গায়ে লেখা রয়েছে—‘ভারতের জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য উপহার।’ উন্নত প্রযুক্তির এই অ্যাম্বুলেন্সটিতে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাসহ (ভেন্টিলেটর) জটিল রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট সরঞ্জাম রয়েছে। কিন্তু ব্যবহার না হওয়ায় এসব যন্ত্রপাতি এখন নষ্ট হয়ে গেছে।
২০২১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ আসেন। ওই সময় তিনি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও তখনকার করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে ১০৯টি লাইফ সাপোর্ট সুবিধাসংবলিত অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেন। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি উপহার পাওয়া ওই অ্যাম্বুলেন্সগুলোর একটি। ২০২২ সালে অ্যাম্বুলেন্সটি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়।
২০২১ সালের ২৬ ও ২৭ মার্চ দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ আসেন। ওই সময় তিনি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও তখনকার করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলার অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে ১০৯টি লাইফ সাপোর্ট সুবিধাসংবলিত অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেন। নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি উপহার পাওয়া ওই অ্যাম্বুলেন্সগুলোর একটি। ২০২২ সালে অ্যাম্বুলেন্সটি নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করা হয়।জেনারেল হাসপাতালের কর্মচারী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হস্তান্তরের প্রথম দিন থেকেই অ্যাম্বুলেন্সটির ঠাঁই হয় হাসপাতালের প্রধান ফটকের পাশে খোলা আকাশের নিচে। সেখানে কয়েক বছর থাকার পর বর্তমানে এটির ঠাঁই হয়েছে নির্মাণাধীন ভবনের পাশে খোলা আকাশের নিচে।
হাসপাতালে এই আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সসহ তিনটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও এখন পুরোপুরি এক অ্যাম্বুলেন্স সচল আছে বলে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রায় শতভাগ রোগী বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেন।
দীর্ঘদিনেও অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করার উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এটি শুরু থেকেই ব্যবহারের উপযোগী ছিল না। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি যোগদান করার পর অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করার লক্ষ্যে একজন চালকে দিয়ে চালিয়ে দেখেছেন। তখন ভেতরে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ আইসিইউর যাবতীয় যন্ত্রপাতিগুলো কাজ করেনি। অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করার বিষয়ে তাঁরা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মেকানিককে দেখিয়েছেন। সংস্কারের জন্য তাঁরা যে হিসাব দিয়েছেন, তাতে ওই টাকা দিয়ে নতুন একটি অ্যাম্বুলেন্স কেনা যাবে।
কাজে এল না উপহারের আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সটি
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালনোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ পাওয়া এবং অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা থেকে নোয়াখালীতে আনাসহ অন্যান্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নোয়াখালী মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলে এলাহী খান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ভারত সরকারের পাওয়া অ্যাম্বুলেন্সটি সম্পূর্ণ আইসিইউ, ভেন্টিলেটর-সুবিধাসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২০২২ সালে তিনিসহ সংশ্লিষ্টরা ঢাকায় গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি গ্রহণ করেছেন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সটি চালু রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। যার ফলে এটি এখন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ একই অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সচল রয়েছে।
অধ্যাপক ফজলে এলাহী খানের মতে, অ্যাম্বুলেন্স চালানোর বিষয়ে জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষে সদিচ্ছাই ছিল না। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করার ইচ্ছা থাকলে জনবল নিয়োগ দেওয়া যেত। কিন্তু বিগত দিনে তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কেউই সে উদ্যোগ নেননি।
ফজলে এলাহী খান, সহযোগী অধ্যাপক, নেফ্রোলজি বিভাগ, নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ‘ভারত সরকারের পাওয়া অ্যাম্বুলেন্সটি সম্পূর্ণ আইসিইউ, ভেন্টিলেটর-সুবিধাসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অ্যাম্বুলেন্সটি চালু রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। যার ফলে এটি এখন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ একই অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সচল রয়েছে।’জেলায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেক সময় সংকটাপন্ন রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় স্থানান্তর করতে হয়। তখন বেসরকারি আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সের উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় সাধারণ মানুষকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি এই বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সটি সচল থাকলে স্বল্প খরচে বা বিনা মূল্যে সাধারণ মানুষ উন্নত সেবা পেত।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), নোয়াখালী শাখার সাধারণ সম্পাদক আবু নাছের এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটি সরকারের সম্পদ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ। এটি রক্ষা করা কিংবা রক্ষণাবেক্ষণ করা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের কর্তব্য। সেটি না করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি করেছেন এবং এটি সুস্পষ্ট দায়িত্বে অবহেলা। জনস্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা, সেটিরও অন্তরায় এটি।








Bengali (BD) ·
English (US) ·