হোয়াইটচ্যাপেল রোডের যানবাহনের শব্দ, মাঝে মাঝে ভেসে আসা সাইরেন আর ক্যাফের ভেতরের নিচু স্বরের কথাবার্তার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে চামড়ার চেয়ারের ঘষাঘষির আওয়াজ।
কেউ অফিসের বিরতিতে তাড়াহুড়ো করে চিকেন কারি আর ভাত খাচ্ছেন। কেউ আবার ডিম, বিনস আর টোস্ট খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছেন। নামাজের আগে কেউ কেউ পাশের ইস্ট লন্ডন মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
ক্যাফের মাঝখানে পুরনো কাঠের টেবিলে বসে খালেদ নূর ধীরে ধীরে আদা আর মধুর চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। পেশায় তিনি একজন ব্যারিস্টার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তার মতে, গত কয়েক মাস ধরে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়েই ইস্ট লন্ডনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই এটা চলছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের এই বিষয়টা নিয়ে কথা বলা যেন থামছেই না।’
বহুল প্রতীক্ষিত ভোট
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন। এটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথম নির্বাচন এবং প্রায় দুই দশকের মধ্যে এমন একটি ভোট, যেখানে বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতার আশা করা হচ্ছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচন, বিরোধীদের বর্জন এবং দমন-পীড়নের অভিযোগে দেশের ভেতরে যেমন ভোটার অনীহা তৈরি হয়েছিল, তেমনি দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশিরাও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুটি দলের দ্বন্দ্বে আবর্তিত। একদিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে সাবেক সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপি, পরে যার নেতৃত্ব দেন তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। শেখ হাসিনার সময়ে দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দেখলেও কর্তৃত্ববাদ ও দমননীতির অভিযোগও বাড়তে থাকে।
আরও পড়ুন: দেশে এসেছে প্রায় ৩ লাখ প্রবাসীর পোস্টাল ব্যালট
দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা বিএনপি এবার নতুন করে মাঠে ফিরতে চাইছে বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে। সমর্থকদের চোখে তিনি একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। সমালোচকদের মতে, তার বিরুদ্ধে পুরোনো দুর্নীতির অভিযোগ ও সাজা এখনো প্রশ্নের জায়গা।
এই নির্বাচনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গত ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এটি প্রথম ভোট। এদিকে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করেছে।
এই টালমাটাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছেন। খালেদ নূর বলছিলেন, ‘আমরা বহু বছর ধরে এই অধিকার চেয়ে আন্দোলন করেছি। প্রবাসীরা তাদের স্বীকৃতি চেয়েছিল।’
ভয়, অনীহা আর কাগজপত্রের জট
তবে ক্যাফের আশপাশের টেবিলে বসা অনেকেই কথা বলতে চান না। রাজনৈতিক মত প্রকাশে তারা সাবধান। খালেদ নূর জানান, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত এমন অনেক বাংলাদেশি আছেন, যাঁরা ভোট দেওয়ার যোগ্য হলেও অভিবাসন-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তার কারণে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না। ‘তারা সবকিছু খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে,’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু সামনে আসতে চায় না।’
দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতি বছর দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠালেও ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি। অনেকের মতে, এই বঞ্চনা ছিল রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কারণ বিদেশে থাকা অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন রাজনৈতিক সহিংসতা বা দমন-পীড়নের কারণে। চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন প্রবাসীদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সুযোগ দেয়।
আরও পড়ুন: ২০২৫-২৬ অর্থবছর / ৭ মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৯.৪৩ বিলিয়ন ডলার
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে সাত মিলিয়ন তথা ৭০ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন, যা মোট ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ। ধারণা করা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট দেড় কোটির মতো বাংলাদেশি বসবাস করেন।
কিন্তু যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা মাত্র ৩২ হাজারের কিছু বেশি। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ নিজেদের বাংলাদেশি বা ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেন।
এর বড় অংশই ইস্ট লন্ডনে, বিশেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটসে, যেখানে জনসংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ বাংলাদেশি। এই সংখ্যার সঙ্গে ভোটার নিবন্ধনের ফারাক থেকেই মূল বাস্তবতা স্পষ্ট বোঝা যায়। সাংস্কৃতিক পরিচয় আর নাগরিকত্ব সব সময় এক নয়।
তরুণদের দূরত্ব
হোয়াইটচ্যাপেল রোড মার্কেটে দুই তরুণী রঙিন জালাবিয়ার কাপড় দেখছিলেন। নির্বাচনের কথা বলতেই তারা কাঁধ ঝাঁকালেন অর্থাৎ এ ব্যাপারে তাদের খুব একটা আগ্রহী দেখা গেল না। একজন বললেন, ‘এটা আমাদের প্রভাবিত করে না, তাই না? আমরা তো এখানে থাকি।’
তাদের কাছে ব্রিটিশ রাজনীতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। লেবার পার্টির অবস্থা আর রিফর্ম পার্টির উত্থান নিয়ে তারা বেশি চিন্তিত। খালেদ নূর বলেন, তরুণ ব্রিটিশ বাংলাদেশিদের মধ্যে এমন অনীহা খুবই সাধারণ।
ভোট দিতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক তথ্য এবং একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ‘অনেকের জন্য, বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য, এটা খুব জটিল’, তিনি বলেন।
ভিন্ন চিত্র উপসাগরীয় দেশে
সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। সৌদি আরবে নিবন্ধিত ভোটার ২ লাখ ৩৯ হাজারের বেশি, কাতারে প্রায় ৭৬ হাজার।
বিশ্লেষকদের মতে, এর কারণ ভিন্ন বাস্তবতা। উপসাগরীয় দেশে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি একা থাকেন, পরিবার দেশে। তাই তাদের বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে সংযোগ আরও সরাসরি। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারীদের জীবন অনেক বেশি স্থায়ীভাবে এখানকার সমাজের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
আশা, সন্দেহ আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা
ইস্ট লন্ডনের এক কোণে, মসজিদের কাছে একটি ছোট অফিসে বসে দ্বিভাষিক সাপ্তাহিক পত্রিকা *বাংলা সংলাপ*-এর সম্পাদক মোশাহিদ আলী পাঠকদের পাঠানো বার্তা পড়ছিলেন। ‘মানুষ ভোটাধিকার পেয়ে খুশি,’ তিনি বলেন। ‘কিন্তু প্রক্রিয়াটা পরিষ্কার ছিল না।’
অনেকে শেষ মুহূর্তে এনআইডি পাননি, কেউ অ্যাপ ব্যবহারে সমস্যায় পড়েছেন, কেউ ডাকযোগে ভোটের কথা দেরিতে জেনেছেন। কেউ কেউ আবার সচেতনভাবে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
২৩ বছর বয়সি ছাত্র রাদওয়ান আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় তিনি এই নির্বাচনকে বৈধ মনে করেন না। অন্যদিকে কেউ কেউ বলেন এই নির্বাচন বহুদিন পর পরিবর্তনের সুযোগ। ‘এখন না বদলালে আর কখন?’ নাম প্রকাশ না করা এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি বলেন।
‘এটা আমার দেশ’
আইল অব ডগসের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বসে ৫৮ বছর বয়সি জাহানারা বেগম জানান, তিনি ভোট দিয়েছেন। ‘আমি বহু বছর অপেক্ষা করেছি,’ তিনি বলেন। ‘অনেকদিন পর মনে হচ্ছে, এটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।’
তার চার সন্তান বাংলাদেশে থাকে। ‘আমি শান্তি চাই,’ তিনি বলেন। ‘আমি চাই তারা নিরাপদ থাকুক।’ কিন্তু তার পাশেই বসা মেয়ে নার্গিস আখতার ভোট দেননি। ‘শুধু নির্বাচনেই সব বদলায় না ‘ তিনি বলেন। ‘মানুষের জীবনে নিরাপত্তা আর অধিকার দরকার।’
শেষ কথা
ইস্ট লন্ডনের চা দোকান থেকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পর্যন্ত এক প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে—এই ভোট কি সত্যিই কিছু বদলাবে? কেউ আশা দেখছেন, কেউ সন্দিহান, কেউ দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন।
কিন্তু বহু বছর পর প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাতে ব্যালট পৌঁছেছে। এ কারণেই অনেকের কাছে, এই নির্বাচন শুধু একটি ভোট নয়—এটা অংশগ্রহণের স্বীকৃতি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
]]>
৪ সপ্তাহ আগে
৫







Bengali (BD) ·
English (US) ·