বৈশাখেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই ইলিশের, নেপথ্যে কী

২ দিন আগে
বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ। বছরের প্রথম দিনে এই খাবার শুধু রুচির নয়, বরং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও প্রতীক। তবে এবারের বৈশাখকে ঘিরে সেই চেনা আনন্দে ভর করেছে অনিশ্চয়তা। জ্বালানি সংকটে ইলিশ আহরণ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। ফলে এবার বাঙালির পাতে পান্তা-ইলিশ উঠবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

আগামীকাল মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) বাংলা নববর্ষ। এর ঠিক আগ মুহূর্তে দেশের অন্যতম বড় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পটুয়াখালীর আলিপুর ও মহিপুরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জ্বালানি সংকটের কারণে চলতি মৌসুমে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না অধিকাংশ জেলে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটে অনেক ট্রলারই ঘাটে বাঁধা পড়ে আছে। ফলে ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।

 

আলিপুর মৎস্য আড়তের ব্যবসায়ী মো. জলিল বলেন, ‘প্রতি বছর বৈশাখের আগে আমাদের আড়তে ইলিশে ভরে যেত। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা আসত। কিন্তু এবার সেই চিত্র একেবারেই নেই। জেলেরা সাগরে যেতে পারছে না, তাই মাছও আসছে না। চাহিদা থাকলেও আমরা সরবরাহ দিতে পারছি না।’

 

মহিপুরের আড়তদার কাওসার মৃধা বলেন, ‘বৈশাখকে কেন্দ্র করে আমরা সাধারণত বেশি মাছ মজুত রাখি। কিন্তু এবার মাছই নেই। বাজারে যা আসছে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। ফলে দামও বাড়ছে।’

 

আরও পড়ুন: বরিশালের বাজার থেকে হঠাৎ করেই যেন উধাও ইলিশ!

 

খুচরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ইলিশের দাম এখন আকাশছোঁয়া। এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। মাঝারি আকারের ইলিশ কিনতেও গুনতে হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা। বড় আকারের ইলিশের দাম প্রায় ৫ হাজার টাকার কাছাকাছি।

 

পটুয়াখালী শহরের বাসিন্দা নাসিমা আক্তার বলেন, ‘প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে আমরা পান্তা-ইলিশ খাই। এটা আমাদের পরিবারের একটা ঐতিহ্য। কিন্তু এ বছর যে দাম, তাতে ইলিশ কেনা সম্ভব না। হয়তো অন্য কিছু দিয়েই দিনটা কাটাতে হবে।’ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় উৎসবের আনন্দ থাকলেও পান্তা-ইলিশ এখন অনেকটাই প্রতীকী হয়ে যাচ্ছে।

 

জেলেদের জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। মহিপুরের জেলে আবুল কালাম বলেন, ‘জ্বালানির কারণে আমরা সাগরে যেতে পারছি না। ট্রলার চালাতে খরচ বেশি, কিন্তু মাছ নেই। আয় না থাকায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।’

 

আরেক জেলে রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বৈশাখের আগে এই সময়টা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এবার মাছ ধরতে না পারায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছি। সামনে আবার নিষেধাজ্ঞা আসছে, তখন তো পুরোপুরি বসে থাকতে হবে। সব মিলিয়ে জেলেদের কষ্ট পিছু ছাড়ছে না।’

 

আরও পড়ুন: ইলিশের দাম নাগালে আসবে যেভাবে, জানালেন মৎস্যমন্ত্রী

 

এ পরিস্থিতির বিশ্লেষণে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একোয়াকালচার বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বর্তমান সংকটটি একক কোনো কারণে তৈরি হয়নি। জ্বালানি সংকটের কারণে জেলেরা সাগরে যেতে পারছেন না, ফলে উৎপাদন কমেছে। একই সময়ে বৈশাখকে কেন্দ্র করে চাহিদা বেড়ে গেছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা। সব মিলিয়ে ইলিশ এখন একটি উচ্চ মূল্যের দুষ্প্রাপ্য পণ্যে পরিণত হয়েছে।’

 

তবে পটুয়াখালীর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে জেলেদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। কিছু ট্রলার ইতোমধ্যে সমুদ্রে গিয়ে মাছ শিকার শুরু করেছে। আশা করছি, ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে সামনে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকায় দীর্ঘমেয়াদে একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা খুবই জরুরি।’

 

আগামী বুধবার (১৫ এপ্রিল) থেকে শুরু হচ্ছে ইলিশ শিকারে ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। তার আগে দীর্ঘ সময় মাছ ধরতে না পারায় জেলেদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। একদিকে বাজারে ইলিশের আকাল ও চড়া দাম, অন্যদিকে জেলেদের জীবন-জীবিকার সংকট; এই দুই বাস্তবতার মাঝেই আসছে পহেলা বৈশাখ।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন