বাংলাদেশ সীমান্তে কেন কুমির-সাপ ছাড়তে চায় ভারত?

৫ দিন আগে
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তার নামে নজিরবিহীন পরিকল্পনা করেছে নয়াদিল্লি। নদীপথে কাঁটাতারের বদলে কুমির ও বিষধর সাপ ছাড়বে মোদি প্রশাসন। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এমন প্রস্তাব ঘিরে উঠেছে মানবাধিকার, পরিবেশ ও আঞ্চলিক রাজনীতির তীব্র বিতর্ক। সীমান্তের বাস্তবতা আর আসন্ন ঝুঁকি সব মিলিয়ে এটি কি নিরাপত্তা কৌশল নাকি নতুন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।

দীর্ঘ ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত। এটি বিস্তৃত পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যজুড়ে। এর প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও বাকি অংশে রয়েছে নদী, জলাভূমি ও সীমান্তঘেঁষা বসতি। আর এসব জায়গায় কাঁটাতার বসানো অনেকটা অসম্ভবই বলা চলে।

 

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানায়, নদীপথের এই ফাঁকফোকর পূরণেই গত ২৬ মার্চ ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ এর অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় ইউনিটগুলোকে বলা হয় সরীসৃপ মোতায়েনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে এবং কি কি পদক্ষেপ নেয়া যায় তা জানাতে।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্বীকার করেছে ভূপ্রকৃতির কারণে জমি অধিগ্রহণ জটিলতা এবং স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে সীমান্ত সুরক্ষা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

তবে এই পরিকল্পনা ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। এ পদক্ষেপকে অযৌক্তিক এবং রাজনৈতিক সহিংসতা আখ্যা দিয়ে একজন গবেষক বলেছেন, কুমির বা বিষধর সাপ কখনোই পার্থক্য করতে পারবে না কে বাংলাদেশি আর কে ভারতীয়।

 

আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী

 

একজন ভারতীয় মানবাধিকারকর্মীর মতে, এটি আইনগত প্রক্রিয়া এড়িয়ে বিচারবহির্ভূত পদ্ধতিতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা। অভিযোগ রয়েছে অবৈধ অভিবাসনের অজুহাতে ভারতীয় মুসলিমদেরও বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে অতীতে। আসামে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে বহু মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণে বাধ্য করা হচ্ছে। যেখানে কাগজপত্র না থাকলে বিদেশি ঘোষণা হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

এই নীতির পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে অবৈধ অভিবাসন ভারতের জনসংখ্যার গঠন বদলে দিচ্ছে। সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্য ব্যবহার করে, বিশেষ করে পূর্ব ও উত্তর পূর্বাঞ্চলে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। ১৯৪৭ সালের বিভাজনের পরও দুই দেশের সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির মিল থাকলেও বর্তমান নীতিতে সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতা অনেকটাই বদলে যাচ্ছে।

 

এ পদক্ষেপের পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তের বেশিরভাগ নদীপথে কুমির স্বাভাবিকভাবে বাস করে না। সুন্দরবন এলাকায় কুমির থাকলেও তা সীমিত কিছু অঞ্চলে রয়েছে। এমনকি আসামের কিছু জলাভূমিতেও এর সীমিত উপস্থিতি আছে। নতুন এলাকায় ছেড়ে দিলে তারা টিকে থাকতে পারবে না। দ্রুত মারা যাবে এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।

 

আরও পড়ুন: সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে: প্রণয় ভার্মা

 

বিষধর সাপের ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা রয়েছে। বন্যা প্রবণ এই অঞ্চলগুলোতে সাপ ছড়িয়ে পড়লে জেলেসহ স্থানীয় মানুষের জীবন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, খোলা প্রবাহমান নদীতে এ ধরনের পরিকল্পনা প্রযুক্তিগতভাবেও অকার্যকর।

 

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও এই ধারণা প্রায় নজিরবিহীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সীমান্তে সাপ বা অ্যালিগেটর ব্যবহারের ধারণা তুললেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে ফ্লোরিডার অ্যালিগেটর আলকাট্রাজ নামে পরিচিত একটি আটক কেন্দ্র। যেখানে জলাভূমির প্রাকৃতিক বিপদকেই নিরাপত্তা হিসেবে ধরা হয় মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পরিবেশ ক্ষতির অভিযোগে ব্যাপক সমালোচিত।

 

সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই সীমান্ত সুরক্ষার নামে প্রকৃতিকে অস্ত্র বানানোর এই কৌশল কি বাস্তবসম্মত। নাকি এটি মানবাধিকার ও পরিবেশের জন্য এক নতুন হুমকি। বিশেষজ্ঞদের মতে কুমির সাপ কোনো সমাধান নয়, এটি সীমান্ত রাজনীতির এক বিপজ্জনক ও অমানবিক মোড়।

 

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন