খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খোকন মিয়ার পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্মীপুরে হলেও তার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের করুইন গ্রামে। স্ত্রী ও দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময়টুকু তাকে কাটাতে হয়েছে চরম অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ মার্চ গুরুতর সংক্রমণ (সেলুলাইটিস) নিয়ে পুলিশ তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। দীর্ঘ ৩৮ দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারি সংগঠন বাতিঘরের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসক ও নার্সরা তার সেবায় নিরলস চেষ্টা চালান। হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের ইনচার্জ তাহমিনা আক্তারসহ সিনিয়র স্টাফ নার্সরা দিনরাত চেষ্টা করেছেন তাকে বাঁচিয়ে রাখতে। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
মৃত্যুর আগে খোকন মিয়া স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারতেন না। তবে অস্পষ্ট কণ্ঠে শুধু নিজের নাম, বাবার নাম এবং কুমিল্লার একটি ঠিকানার কথা বলেছিলেন। সেই সূত্র ধরে জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। যোগাযোগ করা হলে তার স্ত্রী নিলুফা আক্তার এবং দুই ছেলে রাজু ও রানা চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি মৃত্যুর আগেই তারা জানিয়ে দেন, মরদেহও তারা গ্রহণ করবেন না।
পরিবারের সদস্যরা স্পষ্টভাবে মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় মৃত্যুর পর পাঁচ দিন হাসপাতালের মর্গে পড়ে থাকে খোকন মিয়ার নিথর দেহ। যেন শেষবারের মতো অপেক্ষা করছিল, কেউ একজন আসবে! কিন্তু কেউ আসেনি।
আরও পড়ুন: ঋণের টাকায় ধান চাষ করেছিলেন আহাদ মিয়া, তলিয়ে যেতে দেখে জমিতেই মৃত্যু
পরে বাতিঘরের পক্ষ থেকে খোকন মিয়ার ছোট ছেলে রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই, বাবার মরদেহ দাফন করে ফেলতে। অথচ এর আগে রোববার (৩ মে) বাতিঘরের পক্ষ থেকে বুঝিয়ে ছেলে রানাকে রাজি করানো হয়েছিল, যেন অন্তত শেষবারের মতো এসে বাবার মরদেহ গ্রহণ করে নিজ এলাকায় দাফনের ব্যবস্থা করেন। এ জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে শুরু করে কাফন-দাফনের সব ধরনের খরচ বহনের আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল। প্রয়োজন ছিল শুধু একজন সন্তানের শেষবারের মতো বাবার পাশে এসে দাঁড়ানোর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা হয়নি।
এর আগে শুক্রবার (১ মে) সকালে লাশ গ্রহণের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার পক্ষ থেকে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হয়। দেবিদ্বার থানার পুলিশ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, গত ১০-১২ বছর ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই এবং তারা মরদেহ গ্রহণেও অনাগ্রহী।
আইনি সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও মানবিকতার জায়গা থেকে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করা হয়। আশা ছিল, হয়তো শেষ মুহূর্তে রক্তের সম্পর্কের টান জেগে উঠবে। কিন্তু সেই আশাও শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়। মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে খোকন মিয়াকে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে দাফন করা হয়।
আরও পড়ুন: ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতেই নিশাতকে হত্যা করেন প্রতিবেশী
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন বলেন, ‘আমরা মানবিকতার জায়গা থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, যেন অন্তত পরিবারের কেউ এসে শেষ বিদায় জানায়। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে দাফনের সব ব্যয় বহনের প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি। এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদের মরদেহ গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাই আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হয়।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা বলেন, ‘কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হয়। পরে দেবিদ্বার থানার পুলিশ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, তারা খোকন মিয়ার লাশ গ্রহণ করতে পারবেন না।’
বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘আইনগত ও মানবিক দুই দিক বিবেচনায় রেখে ব্যবস্থা নেয়া হয়। পরিবারের অনাগ্রহের কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মাধ্যমে খোকন মিয়ার মরদেহ দাফন করা হয়।’
]]>
১৯ ঘন্টা আগে
১








Bengali (BD) ·
English (US) ·