পদ্মা-যমুনার সংযোগেও পশ্চিমাঞ্চলের রেলসেবা অন্ধকারে!

৩ সপ্তাহ আগে
রাজশাহী থেকে খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সৈয়দপুর- বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ যেন অব্যবস্থাপনার অনন্ত নাট্যমঞ্চ। প্রতিদিন লাখো যাত্রী এ রেলপথে যাতায়াত করলেও, তাদের জীবনে স্বস্তির বদলে নেমে আসে আতঙ্ক, হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। সময়মতো ট্রেন চলে না, খাবারের মান খারাপ, টয়লেট ব্যবহারের অযোগ্য, নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। এ চিত্র যেন গত এক দশকের স্থায়ী বাস্তবতা।

অথচ এ রেলপথে যুক্ত হয়েছে যুগান্তকারী দুটি সংযোগ- পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতু। এতে করে পশ্চিমাঞ্চল এখন ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু রেলসেবার মান এতটাই নিম্নে যে সেই সম্ভাবনাও যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। পশ্চিমাঞ্চলে রেলসেবা আজও পড়ে আছে অবহেলার অন্ধকার গহ্বরে।


রাজশাহী রেলস্টেশন থেকে ঢাকাগামী একটি আন্তঃনগর ট্রেনের ক্যাটারিং কোচে গিয়ে দেখা যায়, পরিবেশ এতটাই নোংরা যে দাঁড়ানোই দুষ্কর। যাত্রীদের অভিযোগ, মেনুতে অনেক খাবারের নাম থাকলেও বাস্তবে পরিবেশন করা হয় শুধু তেলে ভাজা ব্রেড, যেটিকে ‘স্যান্ডউইচ’ নামে বেশি দামে বিক্রি করা হয়।


নাজিম নামে এক ক্ষুব্ধ যাত্রী বলেন, খাবারের মান এত খারাপ যে বাধ্য হয়ে স্টেশন থেকে বা বাইরের হোটেল থেকে কিনে খাই। ট্রেনে এসব খাবার খেলে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।


অন্যদিকে, ট্রেনভর্তি হকারের ভিড়ে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন, অনেক সময় হকারদের ছদ্মবেশে পকেটমার ও ছিনতাইকারীরা ট্রেনে প্রবেশ করে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ট্রেনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মীরা সময়মতো সহায়তা করতে পারেন না।


রিয়াজ আহমেদ নামে এক যাত্রী বলেন, গত সপ্তাহে আমার মোবাইল ফোন ছিনতাই হয়। অভিযোগ করলেও কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ট্রেনের ভিতরে নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই।


ট্রেনের শারীরিক কাঠামোও জরাজীর্ণ। কোথাও নড়বড়ে দরজা-জানালা, কোথাও অস্বাস্থ্যকর টয়লেট। ট্রেন চলার সময় অতিরিক্ত ঝাঁকিতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। অনেক রুটে রেললাইনের অবস্থা এতই খারাপ যে, তা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।


আরও পড়ুন: সৈয়দপুরে রেললাইন থেকে ২ হাজার স্লিপার চুরি


মো. জাহিদ হাসান এক যাত্রী বলেন, টয়লেটের অবস্থা এমন যে চোখ-মুখ বন্ধ করে ঢুকতে হয়, তাও অনেক সময় সম্ভব হয় না। আর ট্রেন যখন চলে, তখন এমন ঝাঁকি লাগে যে দাঁড়িয়ে থাকা দায়। সত্যি বলতে, পুরো যাত্রা একটা ভয় নিয়ে করতে হয়, না জানি কখন কী হয়।


পশ্চিমাঞ্চল রেল জোনের চিফ অপারেটিং সুপারিন্টেন্ডেন্ট মো. আহসান উল্লাহ ভুঁইয়া বলেন, যাত্রীসেবা ও খাবারের মান উন্নয়নে কাজ চলছে। রেললাইন নিয়ে অভিযোগ থাকলে সেগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে। তবে চুরি বা ছিনতাইয়ের দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বর্তায়। প্রতিটি স্টেশন ও ট্রেনে নিরাপত্তাকর্মী থাকলেও কিছু ঘটনা ঘটে যাচ্ছে।


বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী স্টেশন থেকে প্রতিদিন ৪০টি যাত্রীবাহী ট্রেন ছেড়ে যায়। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারসিটি, লোকাল, শাটল ও কমিউটার ট্রেন। অথচ অধিকাংশ ট্রেনেই সময়সূচি মানা হয় না। যাত্রীরা স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকেন অথচ কোনো ঘোষণা বা দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না।


আরও পড়ুন: তুলে ফেলা হচ্ছে যমুনা সেতুর পরিত্যক্ত রেললাইন, প্রশস্ত হবে দুই লেন


পশ্চিমাঞ্চলীয় রেলপথে পদ্মা ও যমুনা সেতুর সংযুক্তি নতুন দিগন্ত খুলে দেয়ার কথা ছিল। এই অঞ্চলের ব্যবসা, কৃষি ও পর্যটন খাতে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও রেলসেবার মান সেই সম্ভাবনার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।


রাজশাহীর সচেতন মহলের নাগরিকরা বলছেন, রেলপথকে আধুনিক করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত বাজেট, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। না হলে বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্ভোগ আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।


রাজশাহীর সামাজিক সংগঠক সুজাউদ্দীন আহমেদ বলেন, পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ শুধু একটি যাতায়াত মাধ্যম নয়, এটি সম্ভাবনার রুট। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে এই রুটের একটি গভীর যোগ রয়েছে। অথচ এতবড় একটি রেলনেটওয়ার্ক থাকার পরও আমরা যেটুকু সেবা পাচ্ছি, তা ন্যূনতমের চেয়েও কম। আমরা টিকিটে কর দিই, সার্ভিস চার্জ দিই। কিন্তু তার বিনিময়ে পাচ্ছি অবহেলা। কিন্তু যদি সেবার মান উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তবে এই সম্ভাবনা কেবল দুঃস্বপ্ন হয়ে থাকবে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন