নিজের ক্ষত নিজেই সারাবে মহাকাশযান

১০ ঘন্টা আগে

মানুষের শরীর কোথাও কেটে গেলে কিছুদিন পর যেমন নিজে থেকেই জোড়া লেগে যায়, মহাকাশযানের ক্ষেত্রেও এখন এমনটা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতের মহাকাশযানগুলো হয়তো কক্ষপথে থাকা অবস্থায় নিজেদের ক্ষত বা ফাটল নিজেরাই খুঁজে বের করতে পারবে এবং সারিয়েও তুলতে পারবে। ফলে দীর্ঘ সময়ের মহাকাশ অভিযান হবে আরও নিরাপদ। পাশাপাশি বারবার ব্যবহারযোগ্য রকেটগুলোর আয়ুও বেড়ে যাবে বহুগুণ।

একটি নভোযানকে মহাকাশে দিনের পর দিন থাকতে হয়। তাছাড়া রকেট উৎক্ষেপণের সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি ও তাপমাত্রার ওঠানামায় মহাকাশযানের গায়ে খুব সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে। মহাকাশে বসে এই ফাটল সারানো তো চাট্টিখানি কথা নয়! তাই ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এমন এক প্রযুক্তিতে সমর্থন জোগাচ্ছে, যাতে মহাকাশযান তার নিজের ফাটল নিজেই খুঁজবে এবং মেরামত করবে।

এই চমৎকার প্রজেক্টের নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজেক্ট ক্যাসান্ড্রা’। এখানে কার্বন-ফাইবারের তৈরি এক বিশেষ ধরনের মিশ্র উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যার নাম হিলটেক। মহাকাশযান সাধারণত কার্বন-ফাইবার দিয়ে বানানো হয়। কারণ এটি ওজনে অনেক হালকা কিন্তু ভীষণ মজবুত। তবে নতুন এই হিলটেক এমন এক ধরনের কার্বন-ফাইবার, যার স্তরগুলোর ভেতরে আগে থেকেই একধরনের বিশেষ বা হিলিং উপাদান লুকানো থাকে।

মহাশূন্যে গ্যাস না থাকা সত্ত্বেও মহাকাশযান কীভাবে চলে?প্রজেক্ট ক্যাসান্ড্রাতে কার্বন-ফাইবারের তৈরি এক বিশেষ ধরনের মিশ্র উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, যার নাম হিলটেক। মহাকাশযান সাধারণত কার্বন-ফাইবার দিয়ে বানানো হয়।

ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং! বিজ্ঞানীরা এই কার্বন-ফাইবারের স্তরের ভেতর ফাইবার-অপটিক সেন্সর বসিয়ে দিয়েছেন। এগুলো অনেকটা আমাদের শরীরের স্নায়ুর মতো কাজ করে। কাঠামোর কোথাও কোনো ফাটল বা ত্রুটি দেখা দিলে এরা সঙ্গে সঙ্গে তা ধরে ফেলে।

ফাটল ধরা পড়ার পরই শুরু হয় আসল ম্যাজিক! মহাকাশযানের ওই ফাটল বা ক্ষতের চারপাশে থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের খুব হালকা জালের মতো কিছু হিটার বসানো থাকে। ক্ষত ধরা পড়লেই ওই জায়গাটুকু ১০০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত গরম করে ফেলে। এই তাপে হিলটেক উপাদানের ভেতরে থাকা সেই হিলিং উপাদানটি গলে আঠার মতো ফাটলের ভেতর ঢুকে যায়। এরপর ঠান্ডা হলে তা শক্ত হয়ে ফাটলটিকে আগের মতোই নিখুঁত ও মজবুত করে তোলে!

বিজ্ঞানীরা এর মধ্যেই ছোট ছোট টুকরো থেকে শুরু করে প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার চওড়া প্যানেল পর্যন্ত এই প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালিয়েছেন। তাঁরা দেখেছেন, এই প্রযুক্তি নিখুঁতভাবে ফাটল খুঁজে বের করতে পারে। তাপ ছড়িয়ে দিয়ে ফাটল সারিয়ে তুলতে পারে ঠিকভাবে। গবেষকেরা এরপর মহাকাশযানের বিশাল জ্বালানি ট্যাংকে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফলতা দেখতে চান।

সৌরজগতের কয়টি গ্রহে গেছে মানবসৃষ্ট নভোযানমহাকাশযানে ফাটল ধরা পড়ার পরই শুরু হয় আসল ম্যাজিক! মহাকাশযানের ওই ফাটল বা ক্ষতের চারপাশে থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের খুব হালকা জালের মতো কিছু হিটার বসানো থাকে।

সুইজারল্যান্ডের কম্পেয়ার ও সিএসইএম এবং বেলজিয়ামের কমঅ্যান্ডসেন্স নামে তিনটি প্রতিষ্ঠান ইসার সহায়তায় এই প্রযুক্তি তৈরি করেছে। ইসার কর্মকর্তা বার্নার্ড ডেকোটিগনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি মহাকাশ পরিবহনে বিশাল পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে বারবার ব্যবহারযোগ্য রকেট বা মহাকাশযানের ক্ষেত্রে এটি দারুণ কাজে লাগবে। এতে ফ্লাইটের মাঝখানের সময়ে মহাকাশযানের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কমে যাবে।

কম্পেয়ার-এর গবেষণা ও উন্নয়ন প্রধান সিসিলিয়া স্কাজোলিও এই সাফল্য নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত। তিনি বলেন, ‘মহাকাশযানের প্রপেল্যান্ট ট্যাংক বা জ্বালানি ট্যাংকের মতো যেসব জায়গায় প্রচণ্ড তাপমাত্রার ওঠানামা সহ্য করতে হয়, সেখানে ব্যবহারের জন্য এই প্রযুক্তি একদম উপযুক্ত। এটি আরও হালকা ও সহজে রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য মহাকাশযান তৈরির পথ খুলে দেবে।’

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা

সূত্র: স্পেস ডটকম

মহাকাশযান থেকে মহাশূন্যে গুলি ছুড়লে গুলিটি কি অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে?
সম্পূর্ণ পড়ুন