নারায়ণগঞ্জের সাত খুন: এক যুগেও বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় হতাশ নিহতদের স্বজনরা

১ সপ্তাহে আগে
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও হয়নি। গত ৯ বছর ধরে মামলাটি আপিল বিভাগে ঝুলছে। উচ্চ আদালতের রায় এখন পর্যন্ত কার্যকর না হওয়ায় চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতদের স্বজনরা।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের ১২ বছর পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই অপেক্ষার প্রহর শেষ করে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, মামলাটি নিষ্পত্তির বিষয়ে বর্তমান সরকার ও বিচার বিভাগ অত্যন্ত আন্তরিক।

 

রোজা মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় মৃত্যু হয় নিহত গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের। মায়ের আশ্রয়ে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা ১২ বছরের শিশু রোজা এখন ছবিতেই বাবাকে খোঁজে। মাদরাসায় পড়ুয়া রোজা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, 

 

সবার বাবা তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে-মাদরাসায় নিয়ে যায়। কত জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায়। আমার বাবা নেই বলে আমাকে একাই মাদরাসায় যেতে হয়। বাবার আদর কী জিনিস, আমি জানি না।

 

শুধু রোজা নয়, স্বজন হারানোর কান্না থামেনি নিহত সাত পরিবারের কারও। তাদের বুকফাটা আর্তনাদ যেন শোনার কেউ নেই। বিচারের আশায় বছরের পর বছর পার করছেন তারা। নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ও শিশু রোজার মা নূপুর আক্তার বলেন, ‘আমার সন্তান ৮ মাসের গর্ভে থাকা অবস্থায় আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে মেয়েকে তিল তিল করে বড় করছি। স্বামীহারা হয়ে বারো বছর পার করেছি। কীভাবে আমাদের জীবন চলছে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আমি তো সবই হারিয়েছি, আমার হারানোর আর কিছু নাই। আমি শুধু আমার স্বামীর খুনিদের বিচার দেখতে চাই। আমি ন্যায়বিচার চাই। একে একে বারো বছর পার করেছি। আর কতকাল অপেক্ষা করব।’

 

আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের রায় কার্যকরের দাবিতে স্বজনদের মানববন্ধন

 

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজন। এরপর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে একে একে ভেসে ওঠে তাদের মরদেহ। এ ঘটনায় ফতুল্লা থানায় পৃথক দুটি মামলা করেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। তদন্ত শেষে পুলিশ দুই মামলায় ৩৫ জনকে আসামি করে ২০১৫ সালে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করলে আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।

 

বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রায়ে প্রধান আসামি নূর হোসেন ও র‍্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। পরে আসামিপক্ষ একই বছর হাইকোর্টে আপিল করলে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে অপর আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিশন দাখিল করলে মামলার কার্যক্রম তখন থেকেই স্থবির হয়ে পড়ে বলে জানান মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি।

 

মামলার বাদী ও নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, 

 

সাত খুনের ঘটনার পর বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আমাদের সাত পরিবারের সবাইকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, যদি কোনো দিন বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে তিনি সাত খুনের বিচার করবেন।

 

সেলিনা ইসলাম বিউটি আরও বলেন, ‘এখন তো সেই সুযোগ এসেছে। বিএনপি সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে। আমি প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সাহেবের কাছে আকুল আবেদন করছি, তিনি যেন তার মায়ের দেয়া আশ্বাসটি রক্ষা করেন। তিনি সহযোগিতা করলে আমরা সাত পরিবার এই নৃশংস সাত খুনের বিচার পাব। আমি দাবি করছি হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে দ্রুত যেন তা কার্যকর করা হয়।’

 

আরও পড়ুন: ৫ মামলায় আইভীর জামিনের বিষয়ে আদেশ ৩ মে

 

মামলাটির বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির। তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার ও বিচার বিভাগ এই মামলাটির বিষয়ে খুবই আন্তরিক। আমরা আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে সাত খুন মামলার নিষ্পত্তি হবে।’

 

আদালত সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় ২০১৭ সালে হাইকোর্টের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত ৩৫ আসামির মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন