আবদুর রহমানের মতো কক্সবাজার উপকূলের লক্ষাধিক জেলের জীবনে এখন চরম অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। ৩৫ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরলেও এখনও তার কপালে জোটেনি সরকারি ‘জেলে কার্ড’।
আবদুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, ‘সাগরে মাছ নাই, খালি হাতে ফিরতে হয়। এখন পরিবার নিয়ে বাঁচব কী করে? গত পাঁচ মাস ধার-দেনা করে চলেছি। এখন আর কেউ ধার দিতে চায় না। নিষেধাজ্ঞার সময় খাব কী?’
শুধু জেলে নয়, ট্রলার মালিকদের অবস্থাও শোচনীয়। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের কারণে আগে যেখানে ২ হাজার লিটার তেল নিয়ে ট্রলার সাগরে যেত, এখন সেখানে মাত্র ৪০০ থেকে ৬০০ লিটার তেল নিয়ে কূলের কাছেই থাকতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন: জ্বালানি সংকটে লাইটার জাহাজ অচল, চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস ব্যাহত!
ট্রলার মালিক মো. আজাদুর রহমান নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘সবশেষ ৪ লাখ টাকা খরচ করে ট্রলার পাঠিয়েছিলাম, মাছ এসেছে মাত্র ৪০ হাজার টাকার। ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা লোকসান। এভাবে চললে ব্যবসা গুটিয়ে নেয়া ছাড়া উপায় নেই।’
জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির উদ্দিন বাচ্চু জানান, সাগরে প্রায় ৪০০ অবৈধ কাঠের ট্রলিং জাল ব্যবহারের কারণে মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তার নিজের চারটি ট্রলারের মধ্যে একটি বিক্রি করে দিয়েছেন, অন্যগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে।
জেলে ও মালিক সমিতির দাবি, নিষেধাজ্ঞার বর্তমান সময়টি অযৌক্তিক। বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘এখন মাছ ধরার ভরা মৌসুম। ১ জুন থেকে ৪৫ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা দিলে আমাদের এত ক্ষতি হতো না। দেড় মাস আগেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করায় আমরা ধ্বংসের মুখে পড়েছি।’
আরও পড়ুন: কাপ্তাই হ্রদ যেন এখন মাছের খনি
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানিয়েছেন, নিবন্ধিত ৬৪ হাজার ৪২৮ জন জেলের প্রত্যেক পরিবারকে মাসে ৪০ কেজি হারে মোট ৭৭.৩৩ কেজি চাল সহায়তা দেয়া হচ্ছে। জেলে কার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। কেউ বাদ পড়লে আবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবর্তনের বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত, তবে লিখিত প্রস্তাব পেলে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
সাগরে মাছের আকাল আর তীরের এই নিষেধাজ্ঞা–দুইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট কক্সবাজারের প্রায় দুই লাখ মৎস্যজীবী। একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে পরিবারের ভরণপোষণ; দ্রুত পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে উপকূলে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকেরই প্রশ্ন: খাতায়-কলমে চালের বরাদ্দ থাকলেও তা কতজনের ঘরে পৌঁছাবে, আর কার্ডহীন লাখো জেলের ভবিষ্যৎই-বা কী?

১ দিন আগে
১








Bengali (BD) ·
English (US) ·