দুই সীমান্তে গেরুয়া চাপে পড়ল বাংলাদেশ

১ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভার নির্বাচনে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ছাড়া ভারতের কেন্দ্রীয় প্রায় সব সংস্থার বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

স্বাভাবিক কোনো নির্বাচন নয়—যুদ্ধের চেহারা নিয়েছিল ভোট। অসম যুদ্ধ ছিল সেটা। মমতা ও তাঁর দলকে এই অসম যুদ্ধ দিশেহারা করে ছেড়েছে। এই ভোটের মধ্য দিয়ে স্পষ্টত পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নতুন একটা পর্বে প্রবেশ করলো।

ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথম এ রাজ্যে সরকার পরিচালনার সুযোগ বিজেপির নাগালে। ২৯ এপ্রিল ২০২৬ রাত থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বুথ ফেরত সমীক্ষা বিজেপির উত্থানের যে অনুমান করেছিল তা অসত্য হয়নি। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যে বিজেপি একটি আসনও পায়নি তারা ১৫ বছর শেষে দেড়শ আসনের সীমা অতিক্রম করলে দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণপন্থার জন্য নিঃসন্দেহে ৪ মে ঐতিহাসিক দিন হয়ে থাকবে।

কেউ কেউ বলছেন, উত্তর ভারতের কাছে বাঙালিত্ব বেশ কোণঠাসা হলো এবার। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, ‘মেয়ে’র পাশে শক্তভাবে দাঁড়াল না কেন ‘বাংলা’? সে কি তৃণমূলের দোষে, নাকি গেরুয়া শিবিরের ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কারণে? এসব নিয়ে অনুসন্ধানী আলোচনা শুরু হয়েছে। ভোটের ফল সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের দিকেও বিবিধ উদ্বেগ ছড়াচ্ছে।

ভারতীয় রাষ্ট্র বনাম পশ্চিম বাংলা: ২০২৬ দেখছে এক নজিরবিহীন নির্বাচন

আবেগের চোরাস্রোত

সমকালীন ভারতে আর কোনো রাজ্যের নির্বাচন এতটা উত্তেজক ছিল না—এবার ২০২৬ সালে যা হলো। পশ্চিমবঙ্গের কোনো নির্বাচনও বাংলাদেশে এত মনোযোগ কাড়েনি অতীতে। এতসব আকর্ষণের কারণ, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিমবঙ্গ বিজয়কে মর্যাদার লড়াই বানিয়ে ফেলেছিল।

নরেন্দ্র মোদি গত চার মাসে চারবার পশ্চিমবঙ্গ এসে বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রচার চালিয়েছেন। এসব প্রচারণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল রাস্তার ধারে মুড়ি-চানাচুর খাওয়া থেকে শুরু করে গঙ্গায় নৌভ্রমণও। বাংলাভাষীদের মন পেতে টিম–বিজেপি জনসংযোগের কোনো হাতিয়ারের বাদ রাখেনি। সঙ্গে ছিল অর্থের বিপুল খেলা।

সব মিলে অচিন্তনীয় একটা ঘূর্ণিঝড় তুলতে পেরেছিল তারা। অমিত শাহর নানা বক্তব্যে সেই ঝড় বাংলাদেশেও শঙ্কা ছড়িয়েছে। সীমান্তে কাঁটাতার সত্ত্বেও দুদিকে আবেগের একটা চোরাস্রোতও টের পাওয়া গেল এবারকার উদ্বেগ থেকে। কিন্তু তিস্তাচুক্তিতে বাধা দিয়েও মমতার জন্য সীমান্তের এদিকে সহানুভূতি কেন? হয়তো সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরোধিতার কারণে, হয়তো এসআইআর নিয়ে ভোটাধিকার হারানো মানুষদের বেদনা ও উদ্বেগে সমব্যথী হয়ে।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: নাগরিক হয়েও আমরা কেন ভোট দিতে পারলাম না

আঞ্চলিক দলগুলোর জন্য বিজেপির লাল বার্তা

ভারতে এ মুহূর্তে ৩১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ২১টিতে বিজেপি একক বা জোটগতভাবে ক্ষমতায় আছে। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় তাদের আসন আছে ২৪৫টি।

পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় নির্বাচনে হারলেও বিজেপির সর্বভারতীয় প্রভাবে সামান্যই নড়চড় হতো। তারপরও আরএসএস পরিবার পশ্চিমবঙ্গে আরেক ধাপ এগিয়ে তাদের চলমান শতবর্ষ উদ্‌যাপন উৎসবকে পূর্ণতা দিতে চেয়েছিল। প্রত্যাশার চেয়েও ভালোভাবে পূরণ হলো সেই স্বপ্ন। দক্ষিণ এশিয়ায় এক শতাব্দীর গেরুয়া অগ্রযাত্রা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির পশ্চিমবঙ্গে নতুন উচ্চতায় উঠল।

মমতার পরাজয় নিশ্চিতভাবে আঞ্চলিক ভারতীয় শক্তিগুলোকে যার যার অঞ্চলে আসন্ন অসম যুদ্ধের কথা জানাচ্ছে। দিল্লিতে কেজরিওয়াল, ইউপিতে মায়াবতী, অন্ধ্রে চন্দ্রবাবু নাইডু প্রমুখের জন্য নিশ্চিতভাবে পশ্চিমবঙ্গের ভোটের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

তবে পশ্চিমবঙ্গের এবারকার ভোট স্থানীয় বামপন্থীদের জন্য আশাজাগানিয়া। আসনের হিসাবে না হলেও, ভোটের হিসাবে তারা পুরোনো জায়গাগুলো খানিকটা ফিরে পাচ্ছে বলে সাক্ষ্য মিলছে। তৃণমূলের পরাজয়ের পাশাপাশি বামদের ভোটকে বিবেচনায় নিলে আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গের যে ইমেজ তৈরি হয় তাতে তৃতীয় শক্তির উত্থানের ইঙ্গিত আছে। তবে এ মুহূর্তে তৃণমূলবিরোধী সহিংসতার শঙ্কা ভাবাচ্ছে স্থানীয় সমাজকে।

‘পরিবর্তনে’র পক্ষে রায়

এই লেখা তৈরির সময় সরকার গঠনের লক্ষণরেখার চেয়েও অনেক বেশি এগিয়ে বিজেপি। গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল ২১৫ আসন পেয়েছিল। বিজেপি পেয়েছিল ৭৭। এবার তৃণমূলের আসন বড় দাগে কমল। নির্বাচনে বিজেপির স্লোগান ছিল ‘পরিবর্তন’। পশ্চিমবঙ্গবাসীর বড় অংশ তাতে সায় দিয়েছে।

মমতার ১৫ বছরের ধারাবাহিক শাসনে সুশাসনের ঘাটতি ছিল। সন্ত্রাস ও মাস্তানির পাশাপাশি অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় উন্নয়নঘাটতি মমতাকে প্রকৃতই ‘পরিবর্তনে’র মুখে ফেলেছে। তবে ভোটের প্রবণতা পাল্টিয়েছে মূলত এসআইআর নামে পরিচিত ভোটার হালনাগাদের কারিগরি। বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে এসআইআর দিয়ে বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল বলে ক্রমাগত অভিযোগ করেছে তৃণমূল। ফলাফল জানাচ্ছে গেরুয়া কৌশল ব্যর্থ হয়নি।

নানা তুচ্ছ অসংগতি দেখিয়ে লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যেসব জেলায় তৃণমূল শক্তিশালী এসআইআরের ছোবল সেখানেই বেশি ছিল। বিজেপি তাতে মোটাদাগে লাভবান হয়েছে। ভোটের ফল যে ভোটের আগেই বদলে দেওয়া যায় এসআইআর তার নজির গড়ল। বিজেপির এই পাটিগণিতে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যপন্থী ভোটাররা যে প্রতিবাদী হয়েছেন ব্যালটের হিসাব তেমন সাক্ষ্য দেয় না, প্রাতিষ্ঠানিক মুসলমান বিদ্বেষে তারাও গা-ভাসালেন বলেই মনে হচ্ছে।

আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের ভোট নিয়ে বাংলাদেশের ভাবনার কারণ কী

পশ্চিমবঙ্গের বিভক্তি আসন্ন?

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের এই ভোট নানা কারণে ঐতিহাসিক। বিভিন্ন রাজ্যে থাকা মানুষ পকেটের অর্থ খরচ করে জোয়ারের মতো ভোট দিতে এসেছিলেন। বিজেপিমুখী এই জোয়ার পশ্চিমবঙ্গকে খণ্ড–বিখণ্ড হওয়ার ঝুঁকিতেও ফেলেছে।

গেরুয়া শিবিরের ঘোষিত একটা লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে দার্জিলিং ও কোচবিহারকেন্দ্রিক আরেকটি রাজ্য করা। তারা ক্ষমতায় এলে সেটা ঘটবে। উত্তরের জেলাগুলোতে পৃথক রাজ্যের দাবি জনপ্রিয়ও বটে। এসব অঞ্চলে একচেটিয়া ভোট পেয়েছে তারা। সে রকম হলে পশ্চিমবঙ্গ সীমিত হয়ে পড়বে মালদা থেকে পূর্ব মেদিনীপুরের ছোট্ট ভূখণ্ডে। জাতীয় রাজনীতিতে তখন এই রাজ্য বেশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে। এর অর্থনৈতিক তাৎপর্যও হবে বিপুল। চা ও পর্যটনশিল্প হারালে পশ্চিমবঙ্গ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে যাবে।

জোড়া ঘাসফুলের বিরুদ্ধে পদ্মফুলকে পছন্দের ফল তাই কেবল লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার হারানো নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও বদলে যাওয়া। মমতার সঙ্গে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের বিবাদে বিজেপিবিরোধী ভোট তিন ভাগ হওয়ার আরও নানা তাৎপর্য দেখা যাবে শিগগিরই।

‘জাতীয় দল’ হওয়া হলো না তৃণমূলের

২০২৩ এর আগে কয়েক বছর জাতীয় দলের মর্যাদা পেলেও তৃণমূল সেটা ধরে রাখতে পারেনি। ভারতে নিয়ম রয়েছে, কোনো দলকে জাতীয় দল হতে হলে অন্তত চারটি রাজ্যে ন্যূনতম ছয় শতাংশ করে ভোট পেতে হয়। কয়েকটি লোকসভা আসনেরও শর্ত আছে এ ক্ষেত্রে। তৃণমূলের লোকসভায় প্রয়োজনীয় আসন থাকলেও (সবাই পশ্চিমবঙ্গের) অন্য রাজ্যগুলোর প্রাপ্ত ভোট কম।

বাংলাদেশের উদ্বেগ বাড়ল যে কারণে

এটা ইতিমধ্যে সবার জানা, মমতার প্রতিপক্ষ এবার কেবল বিজেপি ছিল না। ছিল রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীসহ নির্বাচন কমিশনও। দুর্নীতির তদন্তের কথা বলে রাষ্ট্রীয় অনেক সংস্থাকেও নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল তৃণমূল সংগঠকদের বিরুদ্ধে। এভাবে বহু পক্ষের বিরুদ্ধে লড়ে মমতা যে হেরে গেলেন তাতে বাংলাদেশের জন্য বহুবিদ ঝুঁকির কারণ ঘটেছে।

এসআইআরে যে লাখ লাখ মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে নেওয়া হলো, নবান্নে বসে শুভেন্দু অধিকারী কিংবা তাঁর মতো কেউ তাদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পুশ ইন করতে চাইলে ঢাকার নতুন সরকারের ভূমিকা কী হবে বোঝা মুশকিল? এ রকম সরকারের আমলে নিশ্চিতভাবে পশ্চিমবঙ্গে নাগরিক পরিসরে সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা দশা বাড়বে। আবার সেখানে সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত এই দিকের অনুরূপ শক্তিকেও অনিবার্যভাবে পুষ্ট করবে।

আসামেও একই সময় ধর্মীয় পরিচয়বাদী রাজনীতির একচেটিয়াত্ব সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি অশুভ চাপ তৈরি করবে। নির্বাচনে সেখানেও ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ তাড়ানোর রাজনীতি বিপুলভাবে সফল হয়েছে। মুসলমানপ্রধান নির্বাচনী এলাকার আয়তন কমিয়ে-বাড়িয়ে ১২৬ আসনের বিধানসভায় ৯৯ আসন পেতে যাচ্ছে বিজেপি জোট। বাংলাদেশ নিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মার আক্রমণাত্মক কথাবার্তা নিশ্চিতভাবে বাড়বে আগামীতে।

  • আলতাফ পারভেজ গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

সম্পূর্ণ পড়ুন