ছারছীনা দরবারের ফয়েয-সিক্ত খলিফা আরও অনেকেই ছিলেন কিন্তু নেতৃত্ব প্রদানের অসাধারণ গুণটি কায়েদ ছাহেব হুজুরের মধ্যে এতই সমুজ্জ্বল ছিল যে, স্বয়ং পীর ছাহেব রহ. তাঁকে এ নামে অভিহিত করাই যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করেছেন, এমনকি ‘আমার কায়েদ বিশ্ব বিজয় করবে’ বলেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। আর ‘কায়েদ’ হিসেবে ভূমিকা পালনের অপূর্ব সুযোগও জুটেছিল তাঁর ভাগ্যে। মরহুম পীর নেছারুদ্দীন রহ.-এর খলীফারূপে তিনি এমনিতেই বরণীয় হয়ে উঠেছিলেন। মরহুম এমদাদ আলী মাস্টার সাহেবের (১৯৪৯) পর তিনিই হয়ে উঠেছিলেন ছারছীনা দরবারের নির্বাহী প্রশাসক। ছারছীনার ছাত্রজীবনেই হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. গওছে যমানের হাতে মুরীদ হয়ে কামালিয়ত অর্জন করেন এবং ছাত্রজীবন শেষে কলকাতা থেকে ফিরে ছারছীনা মাদরাসায় যখন অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন, তখন তাঁর স্থির বুদ্ধি, কর্মকুশলতা এবং আন্তরিক নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে পীর ছাহেব কেবলা তাঁকে খেলাফত প্রদান করেন।
কথিত আছে, ষোলো শতকের শেষের দিকে সুদূর আরব থেকে ১৭জন মুসলমান এ দেশে ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেন। তাদেরই একজন ঝালকাঠিতে বসতি স্থাপন করেন। তিনিই ছিলেন কায়েদ ছাহেব হুজুরের পূর্বপুরুষ। তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে মরহুম কুরবান মুন্সির নাম প্রসিদ্ধ। তিনি পবিত্র মক্কায় জান্নাতুল মুয়াল্লায় সমাধিস্থ রয়েছেন। শের্ক-বেদয়াত উচ্ছেদ এবং ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তার পূর্বপুরুষদের অবদান সর্বজন স্বীকৃত। পূর্বপুরুষের এই রক্তধারা বহন করে ১৯১১খ্রিস্টাব্দে পিতা মৌলভী মফীযুর রহমান রহ. ও মাতা মরহুমা জিনাতুননেছা-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন হযরত আল্লামা মুহম্মদ আযীযুর রহমান নেছারাবাদী কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ.। তাঁর পিতামাতা উভয়ই ছিলেন আল্লাহ তায়ালার নেককার বান্দা ও বান্দি। পিতা মৌলভী মফীযুর রহমান রহ. একদিকে ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ রহ.-এর অধঃস্তন পুরুষ হযরত রশীদ উদ্দীন আহমদ ওরফে পীর বাদশা মিয়া রহ.-এর খলীফা, অন্যদিকে ছিলেন মিশনারী অপতৎপরতারোধী সিংহপুরুষ সূফী মুন্সি মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ রহ.-এর অন্যতম সহযোদ্ধা। সুতরাং জন্মসূত্রেই হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. ছিলেন বাতিলের আতঙ্ক ও তরীকায় নিমগ্ন সিদ্ধপুরুষ।
আরও পড়ুন: নিরন্তর সংগ্রামী চেতনার পথিকৃৎ ছিলেন মুফতি আমিনী রহ.
হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. যে যুগে জন্মগ্রহণ করেন, সে যুগে মুসলিম শিক্ষার জন্য স্থাপিত যে দু’চারটা প্রতিষ্ঠান ছিল, তাও ছিল অনেক দূরে-দূরে অবস্থিত। অগত্যা জন্মস্থান ঝালকাঠি জেলার বাসন্ডা গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেই কায়েদ ছাহেব হুজুরকে পাড়ি জমাতে হয় দ্বীপদেশ ভোলায়। সেখানকার আলিয়া মাদরাসা থেকে নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশুনা সমাপ্ত করে তিনি চলে যান ছারছীনা আলিয়া মাদরাসায়। সেখান থেকে জামাতে উলা (ফাযিল) পর্যন্ত হাদীস, তাফসীর, ফেকহ, উসূল ও তাছাওফের ওপর গভীর জ্ঞান লাভ করে উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা গ্রহণের জন্য চলে যান কলকাতায়। ভর্তি হন ঐতিহাসিক কলকাতা আলিয়া মাদরাসায়। ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ আলেমগণের সাহচর্যে সেখানে তিনি ১৯৪২ সালে গোল্ড মেডেলসহ টাইটেল তথা সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। শামসুল উলামা মাওলানা ইয়াহইয়া শাহ সারামী, শাসমুল উলামা মাওলানা বেলায়েত হুসায়ন বীরভূমী, শামসুল উলামা মোল্লা সফীউল্লাহ সরহদী ওরফে মোল্লা সাহেব, বাহরুল উলূম মাওলানা মুহাম্মদ হুসায়ন সিলেটী প্রমুখ উপমহাদেশের দিকপাল আলেমগণ তখন কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষাদানে রত ছিলেন। সুতরাং কায়েদ ছাহেব হুজুরের ব্যক্তিত্ব গঠনে যে উক্ত বুযর্গ ওস্তাদগণের বিরাট ভূমিকা ছিল তা বলাই বাহুল্য।
কলকাতায় ছাত্রাবস্থায় থাকাকালীন শের্ক-বেদয়াত এবং ইসলাম প্রচারের মানসে (১৯৪১সালে) ‘আঞ্জুমানে আল-ইসলাহ’ নামক একটি সংগঠন কায়েম করেন। পরে কলকাতার পাঠ সমাপ্ত হলে তাঁর পীর ও মুর্শিদ গওছে যমান হযরত নেছারুদ্দীন আহমদ রহ.-এর নির্দেশে ছারছীনায় ফিরে এসে শিক্ষকতায় যোগদান করেন এবং পীর ছাহেবের অনুমতি নিয়ে উক্ত সংগঠনের কার্যক্রম জোরদার করেন। অতঃপর তৎকালীন সরকারের শ্যেনদৃষ্টি পতিত হওয়ায় একসময় (১৯৪৫সালে) ফুরফুরা শরীফের তৎকালীন পীর হযরত মাওলানা শাহ সূফী আব্দুল হাই ছিদ্দীকী রহ. ছারছীনায় তশরীফ আনলে ঘটনা জ্ঞাত হয়ে সংগঠনের নাম ‘হিযবুল্লাহ জমিয়াতুল মুজাহিদীন’ রাখার প্রস্তাব করেন। পরবর্তীতে (১৯৫০সালে) এ সংগঠনের নাম ‘জমিয়তে হিযবুল্লাহ’ রাখা হয়—যা অদ্যবধি কার্যক্ষম রয়েছে।
শের্ক ও বেদয়াতের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন সিপাহসালার। মৃত্যু অথবা জেল-যুলুম উপেক্ষা করে শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধের আন্দোলনে নেতৃত্বদানে কখনো পিছপা হতেন না। তিনি ঝালকাঠির কালীপূজার মেলা, সুগন্ধিয়ার উরসের মেলা, হযরত খানজাহান আলী রহ.-এর মাযারের মেলা, কুমিল্লার ঠাণ্ঠা কালী মন্দিরের মেলাসহ অসংখ্য বেদয়াতী কার্যক্রম বন্ধের আন্দোলনে সফল নেতৃত্ব দান করেন।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ছারছীনার তৎকালীন পীর হযরত শাহ আবু জাফর মুহাম্মদ সালেহ রহ. ও শতাধিক ভক্তের সঙ্গে হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুরও স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন। এ কারাবরণের পূর্বে তিনি প্রায়ই বলতেন—‘রসূলুল্লাহ শি‘য়াবে আবু তালিবে কারাবরণ করেন, আয়েম্মায়ে মুজতাহিদীন ও তরীকতের অনেকেই কারাবরণ করেছেন; আমি কিছুদিন কারাবরণ করে সুন্নত পালন করতে চাই।’ তিনি নিজ বুযর্গীকে যতই লুকানোর চেষ্টা করেছেন, আল্লাহ তায়ালা ততই তাঁকে এভাবে বিশ্বমানবের সামনে প্রকাশ করে দিয়েছেন। দীর্ঘ সাড়ে দশ মাস কারাবরণের পর বেকসুর মুক্তি পেয়ে তিনি সামাজিক অবক্ষয় রোধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন। সে সময় দাড়ি, জুব্বা ও টুপিওয়ালা লোকজনের রাস্তায় চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এ অবস্থা নিরসনে তিনি মাঠে নেমে পড়েন।
আরও পড়ুন: হযরত শাহ সুফি ছদর উদ্দিন আহমদ আশ-শহীদ (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী
১৯৭৪ সালের ২০ ডিসেম্বর রাত ৯টায় ঝালকাঠি শহরের রাস্তায় তিনি ‘নারায়ে তাকবীর—আল্লাহু আকবার’ ধ্বনির মিছিল নিয়ে নেমে পড়েন। স্বাধীনতা লাভের পর প্রকাশ্যে ‘নারায়ে তাকবীর—আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তারই নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো শোনা যায়।
সুদ-ঘুষ, মদ জুয়া, বেপর্দেগী, বেহায়াপনা, অত্যাচার, অবিচার, শের্ক, বেদয়াত ও যুলুমের বিরুদ্ধে তিনি যে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন, আজীবন সে আন্দোলন থেকে তাকে বিচ্যুত করা যায়নি। তিনি প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সাহেবের শাসনামলে সকল প্রকার অপরাধমূলক কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে ৭ দফা সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা সরাসরি স্বয়ং প্রেসিডেন্টের কাছে পেশ করেন। এ সময় সরকারি মদদে জেলায় জেলায় আনন্দমেলার নামে অনৈসলামিক কার্যকলাপ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। কায়েদ ছাহেব হুজুরের দুর্বার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার বাধ্য হন আনন্দমেলা বন্ধের ঘোষণা জারি করতে। তিনি শুধু অনৈসলামিক কার্যকলাপ বন্ধের আন্দোলন করেই ক্ষান্ত হননি, সাথে সাথে তিনি পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন গড়ার আহ্বান অব্যাহত রাখেন।
তিনি ১৯৪৩ সাল থেকেই সর্বদলীয় ওলামা-মাশায়েখ, ইমাম এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশপ্রেমিক নেতৃবৃন্দকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে ‘ইত্তেহাদ মায়াল ইখতেলাফ’ তথা ‘মতানৈক্যসহ ঐক্য’-এর এক যুগান্তকারী দর্শন পেশ করেন এবং এই দর্শনের আলোকেই বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। শুধু তাই নয়, দেশ-জাতি ও উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে ১৯৯৭সালে ‘হিযবুল্লাহ জমিয়তুল মুছলিহীন’ নামক এমন একটি দ্বীনী সংগঠন কায়েম করেন—যেখানে মতভিন্নতা সত্ত্বেও দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেকোনো সমস্যার মোকাবেলায় সবাই ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি নিয়ে সম্মুখে অগ্রসর হতে পারে। ১৯৭৪ সালে ঝালকাঠি স্টেডিয়ামে সর্বদলীয় ইসলামী মহাসম্মেলন এবং ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে নেছারাবাদে অনুষ্ঠিত ঐক্যের মহাসম্মেলনগুলোয় দল-মত নির্বিশেষে সর্বশ্রেণির নের্তৃত্ব ও গণমানুষের বিপুল উপস্থিতি তাঁর ঐক্যের ফরযিয়াত রক্ষার অনন্য নজির হয়ে আছে।
তিনি তাঁর গোটা জীবনে একটা মুস্তাহাবেরও খেলাফ করেছেন বলে জানা যায় না। আর—“বুঝ হবার পর থেকে এই পর্যন্ত একটা মিথ্যা কথা বলেছি বলেও মনে পড়ে না”—বৃদ্ধাবস্থায় এমন স্বতঃস্ফূর্ত ঘোষণা যেই মর্দে-মুজাহিদ দিতে পারেন তাঁর জন্যেই বোধকরি বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীসে-কুদসীর এই বাণী—‘আল্লাহ তায়ারা এরশাদ করেন, যখন কোনো বন্দা (নফল এবাদত করতে-করতে) আল্লাহর মাহবুব বন্দায় পরিণত হয় তখন তার অবস্থা এরূপ দাঁড়ায় যে, আমি তার মুখ হয়ে যাই—যে মুখ দিয়ে সে কথা বলে; আমি তার চোখ হয়ে যাই—যে চোখ দ্বারা সে দেখে; আমি তার কান হয়ে যাই—যে কান দিয়ে সে শোনে; আমি তার হাত হয়ে যাই—যে হাত দ্বারা সে ধরে; আমি তার পা হয়ে যাই—যে পা দিয়ে সে হাঁটে।’—সুতরাং ‘কায়েদ ছাহেব হুজুর যা বলেন তা করেন কিংবা আল্লাহর পক্ষ থেকে তা-ই-হয়ে যায়’—এ আশঙ্কার কারণে চিরদিনই ভণ্ড, যালেম ও দুর্নীতিবাজদের এক সাক্ষাৎ মহাতঙ্কের নাম ছিলো—‘কায়েদ ছাহেব!’
হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. তাঁর ধ্যান-জ্ঞান, চিন্তা-চেতনা, যোগ্যতা, প্রতিভা, সময়—সবকিছুকে উজাড় করে দিয়েছিলেন দ্বীনী তাহরীকে। নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়াই ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। হয় মন্ত্রের সাধন, নয় শরীর পতন—এর বাস্তব উদাহরণ কায়েদ ছাহেব হুজুর। আর এর সবকিছু ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য| তাঁর সবকিছুতে ছিল লিল্লাহিয়াত।
তাছাওফের পরিভাষায় আধ্যাত্ম সাধনার উচ্চপর্যায়ের দুটি স্তরের একটির নাম ফানাফিল্লাহ, আরেকটি বাকাবিল্লাহ। ফানাফিল্লা’র স্তরে পৌঁছে সাধক আল্লাহর অস্তিত্বের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। তখন অবস্থা আর নিজের আয়ত্তে থাকে না। এই আত্মলীন অবস্থায় মজযূবিয়ত প্রাধান্য লাভ করে। অনেক সময় সে যে কী করছে, কী বলছে তা নিজেও জানে না। এর পরবর্তী স্তর বাকাবিল্লা’র, এখানে এসে সাধক স্থিত হয়। তাঁর মধ্যে ফিরে আসে স্বাভাবিক অবস্থা। একে বলে সালেকিয়ত। কায়েদ ছাহেব হুজুর নেছারাবাদে স্থিত হওয়ার পর এ দু’অবস্থার মধ্যে অবস্থান করতেন। কখনো ফানাফিল্লায়, কখনো বাকাবিল্লায়, কখনো মজযূব, কখনো সালেক। এ সময় তাঁর থেকে প্রকাশ পেতে থাকে অতি প্রাকৃতিক ঘটনা, যাকে বলে কারামত। তাঁর ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং ভয় ও সমীহ মিলে এক স্বতন্ত্র ইমেজ। মানুষ আসতে থাকে দলে-দলে তাঁর কাছে। বেড়ে যেতে থাকে ভক্ত-অনুরাগী-অনুসারীর সংখ্যা। মূলত আওলিয়ায়ে কেরামের জীবনে সাধারণত দুটি অবস্থা দেখা যায়। তাদের শুরুর জিন্দেগী অভাব-অনাটনের, যাকে বলা হয় ফাকাকাশি, এবং শেষের জীবন প্রাচুর্যের, যাকে বলা হয় ফতহুল গায়েব। কায়েদ ছাহেব হুজুরের জীবনেও তাই দেখা যায়। তাঁর খানকা পরিণত হয় দেশী-বিদেশী ভক্তের মিলনমেলায়।
আরও পড়ুন: যুগ শ্রেষ্ঠ শিক্ষা সংস্কারক আল্লামা সুলতান যওক নদভী
মোটকথা, ঈমান-ইয়াকীন, আমল-আখলাক, এখলাস-এহসান, তাকওয়া-পরহেযগারী, এবাদত-বন্দেগী, রিয়াযত-মুজাহাদা, আল্লাহর মুহব্বত-মা‘রেফত, সততা-সত্যবাদিতা, প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, প্রচণ্ড মেধা, গভীর পাণ্ডিত্য, অপরিসীম সাহসিকতা, কর্মে অটলতা-অবিচলতা, দারুণ বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, সূক্ষ্মদর্শিতা, সাহিত্য সাধনা, লেখনী-গবেষণা, ধৈর্যশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা, পরোপকার, আতিথেয়তা, দয়া-দাক্ষিণ্য, উদারতা-কোমলতা, ন্যায়-ইনসাফ, সৃষ্টির সেবা, সমাজকেন্দ্রিকতা, কর্মমুখিতা, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন, অন্যায়-অসত্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম প্রভৃতি গুণাবলী তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে মানবতার সুউচ্চ মাকামে। তাঁর পুরো জীবনের ভিত্তিই ছিল—০১. এখলাস, ০২. এহসান, ০৩. আল্লাহ তায়ালার মুহব্বত ও মা‘রেফত, ০৪. নিজেকে মিটিয়ে দেয়া, ০৫. সৃষ্টির সেবা, ০৬. ফাযায়েল অর্জন এবং ০৭. রাযায়েল বর্জন।
মন্দ খাসলতের সাথে হুজুর কেবলার এত দূরত্ব ছিল, মনে হয় যেন আল্লাহ তায়ালা এসব থেকে পবিত্র করেই তাঁর অন্তরকে সৃষ্টি করেছেন। ক্বলবে সালীম যাকে বলে তা যেন পুরোমাত্রায় হুজুর কেবলার মধ্যে ছিল। ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর নিয়ে যিনি সন্তুষ্ট, মাত্র ২৫ টাকার মাসিক বেতন সত্ত্বেও বেতন বৃদ্ধির আবেদন তো নয়ই বরং বেতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রশ্ন শুনে যিনি কেঁদে ফেলেন, হেরস বা তমা‘ তথা লোভ-লালসা বা দুরাশার সাথে তার কী সর্ম্পক? মাত্র ২৫ টাকার মাসিক আয় দিয়ে যিনি নিজের সংসারে ১০ টাকা খরচ করে বাকি টাকা থেকে ১০ টাকা ভাইয়ের সংসারে আর ৫ টাকা ভাতিজার পড়াশুনার পিছনে খরচ করেন, কার্পণ্য তাঁর কাছে আসবে কি করে? যিনি বোর্ডিংয়ের নুনের মূল্য পরিশোধ না করে সেই নুন দিয়ে খানা খান না, হারাম বা অবৈধ জিনিসের লিপ্সা তাঁকে কিভাবে স্পর্শ করতে পারে? সদা যিনি নিজের দোষ-ত্রুটি তালাশে ব্যস্ত, সর্বদা যিনি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের মুহব্বতে বিভোর, প্রতিটি মুহূর্তকে যিনি মূল্যবান গণীমত মনে করে সদ্ব্যবহার করতে সচেষ্ট; গীবত বা পরনিন্দার মতো অনর্থক ও ধ্বংসাত্মক চরিত্রের সাথে তাঁর কী সম্পর্ক থাকতে পারে?
মিথ্যাকে তিনি প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করতেন। পুরো জীবনটাই ছিল মিথ্যা থেকে পবিত্র। একবার জযবার হালতে হুজুর বলে ফেলেছিলেন, “আল্লাহ পাক এই মুখের দোয়া কেন কবুল করবেন না? এই মুখ তো চল্লিশ বছরেও একটি মিথ্যা বলেনি।” এমনও বলেছিলেন—“বুঝ হবার পর থেকে এই পর্যন্ত একটি মিথ্যা কথা বলেছি বলেও মনে পড়ে না।” হাসাদ বা হিংসার সাথে তাঁর ছিল না দূরতম সর্ম্পকও। মানুষের কল্যাণ সাধন ছিল যার জীবনের পবিত্র সাধনা, হাসাদ বা হিংসার মতো আত্মিক ব্যাধি তাঁকে কিভাবে স্পর্শ করতে পারে?
ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসা নামে দেশব্যাপী খ্যাত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নেছারাবাদে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মানবসেবায় নিবেদিত অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান; রচনা করেন অর্ধশত গ্রন্থ। জাতি-ধর্ম-বর্ণের মানুষের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি কামনায় গঠন করেন—আদর্শ সমাজ বাস্তবায়ন পরিষদ। দুর্নীতি ও বেকারত্বমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণ করেন নানান কার্যকরী পদক্ষেপ| বাসণ্ডা নাম পরিবর্তন করে তিনিই তাঁর পীরের নামে নিজ গ্রামের নামকরণ করেন নেছারাবাদ—যা আজ উপশহরে পরিণত হওয়া অনন্য এক নাম।
হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ.। ছবি: সংগৃহীত
তাঁর অনেক ভক্ত-অনুরক্তের প্রাণের আকুতি ছিলো—কেবলমাত্র তাঁরই মুরীদ হওয়ার। কিন্তু ২০০২ সালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি কখনো নিজের পক্ষ থেকে কাউকে মুরীদ করেননি বরং তাঁর পীর ও মুর্শিদ হযরত নেছারুদ্দীন আহমদ রহ. এবং পরবর্তীতে তাঁর স্থলাভিষিক্ত পীর ছাহেবানের পক্ষ থেকেই মুরীদ করেছেন। অবশেষে ২০০২ সালে নেছারাবাদের জনাকীর্ণ বার্ষিক মাহফিলে দেশ-জাতি ও উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণের উদ্দেশ্যে ‘সুন্নিয়া তরীকা’ প্রবর্তনের ঘোষণা দেন এবং নিজের পক্ষ থেকে বায়াত গ্রহণ শুরু করেন; আর এর মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় তাঁর অসংখ্য ভক্ত-অনুসারীর দীর্ঘদিনের দাবি ও শেষরাতের কান্নার।
তিনি কতবড় উচ্চমাপের আরেফ ও আধাত্মিক রাহবর ছিলেন সে বিষয়ে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হল।
০১. আব্দুল ওয়াহেদ দরবেশ ছিলেন গওসে যমান হযরত নেছারুদ্দীন আহমদ রহ.-এর একজন মুরীদ ও মজযূব ওলী। বিভিন্ন সময়ে তার দ্বারা অনেক কারামত প্রকাশ পেয়েছে। তিনি হুট-হাট যাকে-তাকে একথা-ওকথা বলে ফেলতেন আর তা লেগেও যেতো। এ জন্য তাকে সবাই সমীহ করে চলতো কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন কেবল গওসে যমানের অন্যতম প্রধান খলীফা হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ.। তিনি দরবেশকে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে ভর্ৎসনা করতেন, এমনকি বেত্রাঘাতও করতেন।
একবারের ঘটনা। হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. তাঁর জযবার হালতে কী এক কারণে ওয়াহেদ দরবেশকে লাঠি দিয়ে মারলেন। এতে দরবেশ প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে কায়েদ ছাহেব হুজুরের ওপর বদদোয়া দিলেন—‘ও আমারে পিটাইছে, ওর হাত লাগবে, ওর মুখ লাগবে, ওর পা লাগবে’ ইত্যাদি।
ঘটনার আকস্মিকতায় গোটা ছারছীনা স্তব্ধ। কায়েদ ছাহেব হুজুর জযবার হালতে মানুষ পিটান এটা প্রসিদ্ধ কিন্তু তাই বলে ওয়াহেদ দরবেশকে? ছারছীনার ছাত্র-শিক্ষক-মুহেব্বীন থেকে শুরু করে আপামর মানুষ—যারা ঘটনা শুনেছেন তাদের সবার মুখ মলিন; যদি তাদের প্রিয় মানুষ কায়েদ ছাহেব হুজুরের ওপর ওয়াহেদ দরবেশের বদদোয়া লেগে যায়, যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে কী উপায় হবে! সবার প্রার্থনা—আয় খোদা! কায়েদ ছাহেব হুজুরের যেন কোন ক্ষতি না হয়!
এ অবস্থায় হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর রহ. সবার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বুঝতে পেরে সবাইকে মসজিদে বসালেন এবং সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন— ‘তোমরা যা মনে করছো—ওয়াহেদ দরবেশকে পিটাইছি, আযীযুর রহমানের কিছু একটা হবে, তা মনে করো না। আযীযুর রহমানের ডান পকেটে না, বাম পকেটে ওরকম কয়েক’শ ওয়াহেদ দরবেশ থাকে। তোমরা কিছু মনে করো না। ওয়াহেদ দরবেশের বদদোয়ায় আযীযুর রহমানের কিছু হবে না।’
বাস্তবিক পক্ষেই ওয়াহেদ দরবেশের বদদোয়ায় হুজুরের কিছুই হয়নি বরং ওয়াহেদ দরবেশই সংশোধিত হয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
০২. ২০০১ সালে হযরত কায়েদ ছাহেব হুজুর তাঁর জীবনের শেষ হজ্ব পালন করেন। ঐ বছর আরাফার দিনের ঘটনা। আরাফার দিন হুজুর হঠাৎ তাঁবু থেকে উধাও হয়ে যান। তাঁর সফরসঙ্গীরা আরাফার মাঠ জুড়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে পাগলের মতো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন। এই বৃদ্ধ বয়সে তিনি কোথাও গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেন কি-না কিংবা পথ হারিয়ে অন্য কোথাও চলে গেলেন কি-না এসব নিয়ে তারা যখন অস্থির হয়ে পড়ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ করে হুজুরকে তাঁবুতে ফিরতে দেখে উপস্থিত সবাই হতবাক হয়ে গেলেন। হুজুর কোথায় গিয়েছিলেন, প্রত্যেকের মুখেই এই এক প্রশ্ন। সবার পীড়াপীড়িতে শেষে বলতে বাধ্য হলেন—‘প্রতিবছর আরাফার দিন, আরাফার ময়দানে সারাবিয়শ্বের গওস-কুতুব, ওলী-আবদাল, আওতাদ-আখইয়ারগণের বৈঠক হয় এবং এখানে বসে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়; আমি সেই ˆবঠকে ছিলাম।’ আল্লাহু আকবর!
আরও পড়ুন: কালজয়ী দীপ্তিময় কর্মবীর ছিলেন মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা আতহার আলী রহ.
০৩. একসময় তাঁর এলাকা ডাকাতের আড্ডাখানা হিসেবে কুখ্যাত ছিল। তিনি এলাকাবাসীদের মাধ্যমে ডাকাতদের বলে পাঠালেন যে, ‘০৭দিনের মধ্যে আমার কাছে এসে তওবা না করলে আল্লাহর পক্ষ থেকেই ফয়সালা হবে।’ অতঃপর ডাকাত সর্দারসহ তিনজন তাঁর খেদমতে উপস্থিত হয়ে তওবা করলো। অবশিষ্ট যারা ডাকাত দলভুক্ত ছিল, তারা ০৭দিনের মধ্যেই গুলি ও গণপিটুনিতে নিহত হল। এটা তাঁর বিশেষ কারামত হিসেবে স্বীকৃত।
মহান আল্লাহর রঙে রঙিন, তাঁর চরিত্রে চরিত্রবান, ক্ষণজন্মা এই ইমামুত তরীকত মুজাদ্দেদে মিল্লাত আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে অলৌকিকতায়পূর্ণ দীর্ঘহায়াত অতিবাহিত করে, অবশেষে রফীকুল আ‘লার নিকট উপনীত হন ২০০৮ এর ২৮ এপ্রিল, সোমবার সকাল ৭টা ১৫ মিনিটে। ইন্নালিল্লাহি অ-ইন্না ইলাইহি রজিঊন! তাঁর প্রতিষ্ঠিত নেছারাবাদ দরবার কমপ্লেক্সের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে তাঁর শেষ শয্যা রচিত হয়। আল্লাহ তাঁর জীবনের কার্যক্রম কবুল করুন এবং জান্নাতে সুউচ্চ মাকাম দান করুন!
এন্তেকালের পর তাঁর সুযোগ্য, সুবিজ্ঞ, সুদক্ষ উত্তরসূরী একমাত্র ছাহেবজাদা, আমীরুল মুছলিহীন হযরত মাওলানা মুহম্মদ খলীলুর রহমান নেছারাবাদী মহান পিতার লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে আত্মনিয়োগ করেন। একদিকে তিনি এক্বামতে দ্বীন ও তাবলীগে দ্বীনের খেদমতের নিমিত্ত জমিয়াতুল মুছলিহীনের মাধ্যমে ইত্তেহাদ মায়াল ইখতেলাফের দাওয়াত নিয়ে অবিরাম ছুটে চলছেন দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে; অন্যদিকে নেছারাবাদে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক প্রতিষ্ঠান, গড়ে উঠতে থাকে সুরম্য অট্টালিকারাজি, উপশহরে পরিণত হয় নেছারাবাদ। ছাত্র-শিক্ষক-ভক্ত মিলে গড়ে ওঠে এক আলীশান দরবার। আল্লাহ তায়ালা কায়েদ ছাহেব হুজুরের এ দরবার ও দ্বীনী তাহরীককে কেয়ামত পর্যন্ত সুন্নতের ওপর জারি রাখুন, আমীন!
]]>
৬ দিন আগে
৩








Bengali (BD) ·
English (US) ·