ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের পেছনে রেলওয়ের কর্মীদের কয়েক স্তরের গাফিলতি

২ সপ্তাহ আগে

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকায় ভয়াবহ ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে রোববার (২৯ মার্চ) সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, কুমিল্লার উপপরিচালক মো. মেহেদী মাহমুদ আকন্দের কাছে ১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরীসহ সদস্যরা।

প্রশাসনের এই তদন্ত প্রতিবেদনে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পেছনে রেলওয়ে বিভাগের কর্মীদের কয়েক স্তরে দায়িত্ব অবহেলার তথ্য উঠে এসেছে। ঘটনার পর থেকে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ শুধু গেটম্যানদের ওপর দায় চাপিয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি রেলওয়ের আরও একাধিক ধাপে কর্মরত কর্মীদের অবহেলার তথ্য পেয়েছে। দুর্ঘটনার নেপথ্যের কারণ হিসেবে ঘটনাস্থল পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ের চার গেটম্যান ছাড়াও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর লেভেল ক্রসিংয়ের দুই গেটম্যান, লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী মাস্টার, ট্রেনের দুজন চালক বা লোকোমাস্টার, বাসের চালকের অদক্ষতা ও পরিবহনের সঠিক সিদ্ধান্ত না থাকা এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নির্মাণকাজে অবহেলার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ বিস্তারিত উল্লেখ করার পাশাপাশি মোট আটটি সুপারিশও করা হয়েছে। রোববার রাত আটটার দিকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী প্রথম আলোকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন ২১ মার্চ দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। ট্রেনটি বাসটিকে ইঞ্জিনের মুখে করে টেনেহিঁচঁড়ে প্রায় ৭০০ মিটার দূরে দৈয়ারা নামক স্থানে নিয়ে থামে। এতে বাসটি দুমড়েমুচড়ে প্রাণ হারান তিন শিশুসহ ১২ জন। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন বাসটির চালকসহ অন্তত ১৫ জন। হতাহতরা সবাই ছিলেন বাসটির যাত্রী। এ ঘটনায় নিহত এক বাস যাত্রীর স্বজনের করা মামলায় এখন পর্যন্ত ওই রেলক্রসিংয়ের তিনজন স্থায়ী ও অস্থায়ী গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ।

কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় প্রধান আসামি হেলাল গ্রেপ্তার

দুর্ঘটনার পর ৬ সদস্যবিশিষ্ট দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ৫ সদস্যবিশিষ্ট পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। তিনটি কমিটিকেই তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ঈদের ছুটি শেষে গত মঙ্গলবার প্রথম কর্মদিবসে কার্যক্রম শুরু করে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি। রোববার ছিল তৃতীয় কর্মদিবস। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেন জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত কমিটির সদস্যরা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী ছাড়া কমিটির অপর চার সদস্য হলেন বিআরটিএর সহকারী পরিচালক ফারুক আলম, ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার ওসি আবদুল মমিন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কুমিল্লার সহকারী পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন এবং রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা আসিফ খান চৌধুরী।

তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব অবহেলার তথ্য

জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্যরা দুর্ঘটনার নেপথ্যে নানা গাফিলতির তথ্য তুলে ধরেছেন। এতে বলা হয়েছে ঘটনার রাতে ওই রেলক্রসিংয়ে মূলত দায়িত্ব ছিল মো. হেলাল ও মো. মেহেদী হাসানের। কিন্তু তাঁরা নিজেরা দায়িত্ব পালন না করে আরেক শিফটে দায়িত্ব পালন করা কাউসার হোসেন ও নাজমুল হোসেনকে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে দায়িত্ব পালন করতে বলেন। কিন্তু কাউসার-নাজমুল সেই দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁরা ঘটনার সময় লেভেল ক্রসিংয়ের গেট ফেলেননি। যার কারণে ঘটেছে ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা। এখানে চারজনেরই দায়িত্বহীনতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

কুমিল্লায় ২১ মার্চ দিবাগত রাতে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে ১২ জন নিহত হন। দুর্ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যাত্রীদের নানা জিনিসপত্র

তদন্ত প্রতিবেদনে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর লেভেল ক্রসিংয়ের দুই গেটম্যানের অবহেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, ট্রেনটি বিজয়পুর লেভেল ক্রসিং অতিক্রম করার পর সেখানে দায়িত্বে থাকা দুই গেটম্যান পরবর্তী লেভেল ক্রসিং পদুয়ার বাজারের গেটম্যানদের কল করার কথা। কিন্তু তাঁরা এখানে কল করেনি।
প্রায় একই ধরনের অবহেলা করেছেন লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার। তিনিও এই ক্রসিংয়ে কল দেননি। নিয়মানুযায়ী তিনি ক্রসিংয়ের গেটম্যানদের না পেলে ট্রেনের চালককে অবহিত করার কথা। কিন্তু এখানে সেটি করা হয়নি।

ট্রেনের দুজন চালক বা লোকোমাস্টারের অবহেলার কথাও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে গেটম্যানেরা সবুজসংকেত দিয়ে থাকেন চালককে। কিন্তু এখানে যেহেতু গেট ফেলা হয়নি, তাই সবুজসংকেত দেওয়া হয়নি। এরপরও চালক ট্রেনের গতি কমাননি। তিনি সংকেত না পেয়ে গতি কমালে দুর্ঘটনা ঘটলেও হয়তো এত প্রাণহানি ঘটত না। এখানে চালকদের অদক্ষতা ও অবহেলা রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনাকবলিত বাসটির চালকের অদক্ষতা ও পরিবহনটির সঠিক সিদ্ধান্ত না থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ক্রসিংয়ে ওঠার আগে চালকের উচিত ছিল দুই পাশ ভালোভাবে খেয়াল করা, সেটা তিনি করেননি। ওই স্থানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার লেন রেলওয়ে ওভারপাস রয়েছে। বাসটি মূলত ওভারপাস দিয়ে চলাচল করার কথা। চালক সেটি না করে নিচে দিয়ে যাওয়ায় এতগুলো মানুষের প্রাণ গেছে। এ ক্ষেত্রে পরিবহন কর্তৃপক্ষ যেসব যুক্তি দেখিয়েছে, তা তদন্ত কমিটির কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। বাসটি কীভাবে চলবে, এ নিয়ে পরিবহনটির সঠিক সিদ্ধান্ত না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মধ্যরাতে কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে উঠে পড়া বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষ, নিহত ১২

পদুয়ার বাজার এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ইউলুপ নির্মাণকাজ চলছে। সওজের নির্মাণকাজের জন্য রেলক্রসিংয়ের পাশে দুটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। যেগুলোর কারণে রেললাইন ওই ক্রসিং থেকে ভালোভাবে দেখা যায় না। এখানে সওজ ও রেলওয়ের সমন্বয়হীনতার তথ্য উঠে এসেছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

যেসব সুপারিশ করা হয়েছে

তদন্ত প্রতিবেদনে ভবিষ্যতের জন্য আটটি বিষয়ে সুপারিশ করেছে কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে গেটম্যানদের বিষয়ে রেলওয়ের নিয়মিত তদারকি। পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে বিদ্যুৎ–সংযোগ না থাকায় সেখানে ওয়ার্নিং বেলসহ লাইট জ্বলে না। দ্রুত সেখানে বিদ্যুৎ–সংযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে সওজ ও রেলওয়ে বিভাগের সমন্বয় থাকার কথা বলা হয়েছে সুপারিশে। প্রতিটি রেলক্রসিংয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া রেলক্রসিংগুলো অটোমেডেট বা স্বয়ংক্রিয় করার কথা বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির সুপারিশে গেটম্যানদের কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। গেটম্যানদের কক্ষে তাঁদের চেয়ার-টেবিল দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কারণ, পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যরা গিয়ে সেখানে লেপ-তোশকসহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দেখতে পেয়েছেন।

কুমিল্লার এই দুর্ঘটনার পর একজন গেটম্যান মাদকাসক্ত বলে আলোচনায় আসে। এ জন্য তদন্ত কমিটির সুপারিশে প্রতি মাসে অন্তত একবার গেটম্যানদের ডোপ টেস্ট করার কথা বলা হয়েছে। কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাঁকে চাকরিচ্যুত করার কথা বলা হয়েছে সুপারিশে।

তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গুরুত্বসহকারে তদন্ত কাজটি শেষ করেছি। তদন্তে যেসব ধাপে অবহেলা প্রতীয়মান হয়েছে, সেগুলোর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন আমাদের এমন প্রাণহানি আর দেখতে না হয়, এ জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ৮টি সুপারিশ করা হয়েছে।’

নিহত ১২ জনের মধ্যে আছেন মা–দুই মেয়ে, স্বামী-স্ত্রী
সম্পূর্ণ পড়ুন