ট্রাম্পের হরমুজ ডেডলাইন আসন্ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সুরক্ষায় ‘মানবশৃ্ঙ্খল’ গড়ার ডাক ইরানের

২ ঘন্টা আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার ডেডলাইন তথা সময়সীমা দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। এরপরই দেশটির বিদ্যুৎসহ অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হবে।

তবে এই হামলা মোকাবিলায় এবার ভিন্ন ধরনের কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে ইরান। দেশের আপামর জনসাধারণ বিশেষ করে তরুণদের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চারপাশে প্রতীকী ‘মানবশৃঙ্খল’ (হিউম্যান চেইন) তৈরির আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সরকার। 

 

ইরানের ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রণালয় দেশের তরুণ খেলোয়াড়, শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের আজ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) স্থানীয় সময় দুপুর ২টা থেকে বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোর আশপাশে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রতি জনসমর্থন প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এই পদক্ষেপটি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

 

ইরানের যুব বিষয়ক উপমন্ত্রী আলিরেজা রহিমি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, এই (মানবশৃঙ্খল) কর্মসূচিটি তরুণদের নিজেদের প্রস্তাবেই নেয়া হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তরুণ শিল্পী ও যুব সংগঠন প্রস্তাব দিয়েছিল যে আমরা দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চারপাশে একটি মানববলয় বা মানবশৃঙ্খল গড়ে তুলব।’

 

ইরানি মন্ত্রীর মতে, এই প্রতীকী কর্মসূচির নাম দেয়া হয়েছে—‘উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ইরানের তরুণদের মানবশৃঙ্খল।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করি, সারা দেশের তরুণদের অংশগ্রহণে এই মানবশৃঙ্খল গড়ে উঠবে। এটি দেশের অবকাঠামো রক্ষা এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে তরুণদের প্রতিশ্রুতির প্রতীক হবে।’

 

হরমুজ প্রণালী খোলার ডেডলাইন

 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী বলেছে, প্রণালীটি তাদের নৌবাহিনীর ‘দৃঢ় ও কর্তৃত্বপূর্ণ’ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি ইরানের ‘শত্রুদের জন্য’ বন্ধই থাকবে।

 

এর ফলে একদিকে যেমন উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রফতানি হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ট্রাম্প ইরানকে এ ব্যাপারে একের পর এক ডেডলাইন দেন।

 

গত ২১ মার্চ ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, ইরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে না দেয়, তবে তিনি দেশটির বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থাপনা ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেবেন।

 

এরপর ২৩ মার্চ তিনি সুর কিছুটা নরম করে জানান যে, দুই দেশের মধ্যে ‘খুব ভালো ও ফলপ্রসূ আলোচনা’ হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি জ্বালানি অবকাঠামোতে যেকোনো ধরণের সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেন।

 

আরও পড়ুন: অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ১০ দফা পরিকল্পনা দিলো ইরান

 

এরপর গত ২৭ মার্চ তিনি দাবি করেন, ইরানের অনুরোধেই তিনি তেহরানকে দেয়া সময়সীমা বাড়িয়েছিলেন— যাতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে। ট্রাম্প বলেন, ইরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা কিছুদিন বন্ধ রাখতে ৭ দিনের বিরতি চেয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই সময় বাড়িয়ে ১০ দিন করেন, যা গত সোমবার (৬ এপ্রিল) শেষ হওয়ার কথা ছিল।

 

তবে এরপর আরও একদিন বাড়িয়ে আজ মঙ্গলবার রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম) (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৩টা) পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এই সময়সীমার মধ্যে তেহরান চুক্তি না করলে কঠোর সামরিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন ক্ষমতা আছে যে তারা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে।

 

তিনি বলেন, ‘মানে পুরোপুরি ধ্বংস… রাত ১২টার মধ্যে শেষ করে দেয়া যাবে… আর আমরা চাইলে চার ঘণ্টার মধ্যেই এটা করতে পারি।’ তিনি আরও জানান, এই হামলার লক্ষ্য হতে পারে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো।

 

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

 

যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানকে একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দিয়েছে। জবাবে তেহরান যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান করেছে। সোমবার (৬ এপ্রিল) তারা বলেছে, কোনো যুদ্ধবিরতি নয়, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান হতে হবে।

 

সেই লক্ষ্যে তেহরান ১০ দফার শর্ত দিয়ে জানিয়েছে, কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, এই ১০ দফা শর্ত অনুযায়ী স্থায়ী সমাধান চায় তারা। এর মধ্যেই ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছে ইরান। এমনকি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলিতে হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। যদিও তা অস্বীকার করেছে পেন্টাগন।

 

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কাঁপছে ইসরাইলের তাইর দেব্বা, মারাকাহ, কিরিয়াত শমোনা ও সাসা। ইরানের সর্বশেষ দফার হামলায় ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলের অন্তত ২৮টি স্থানে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইরান ক্ষেপণাস্ত্রে ক্লাস্টার বোমা ব্যবহার করায় এ অবস্থা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

আরও পড়ুন: ইসরাইলে একযোগে ইরান, হিজবুল্লাহ ও হুতির হামলা!

 

পাশাপাশি ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল কুয়েতের আলি আল সালেম ঘাঁটি এবং অন্যান্য ঘাঁটি। এতে কয়েকজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। মার্কিন উভচর যুদ্ধজাহাজে হামলার দাবি করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি। যদিও এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী।

 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হামলা চালায় ইরানের সাউথ পার্স পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায়। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ইরানের বৃহত্তম পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় শক্তিশালী আঘাত করেছে ইসরাইল। এটি ইরানের প্রায় ৫০ শতাংশ পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন করে।

 

এছাড়া তেহরান, ইয়াজদ ও ইসফাহানের শিল্প ও সরকারি কেন্দ্রে বিস্ফোরণ হয়েছে। এছাড়া ইরানের যাজদ প্রদেশে পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এছাড়া লেবাননের নাবাতিয়াহ ও টাইর অঞ্চলে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত ৪১টি গ্রামে মানবিক ক্ষতি হয়েছে। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন