‘রাস্তাঘাটে আমাকে দেখে অনেকেই হাসাহাসি করে। বিশেষ করে কম বয়সীরা এটা বেশি করে। অনেক সময় টিটকারিও শুনতে হয়। আগে মন খারাপ হতো, এখন সয়ে গেছে। আমিও মানুষ, পার্থক্য শুধু একটাই—খর্বাকৃতির হয়ে জন্মেছি। তবে এটুকু বুঝতে পারছি, আয়–রোজগার করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তাহলে অন্তত পরিবারের কাছে বোঝা হয়ে থাকতে হবে না। পড়াশোনাটা চালিয়ে যাচ্ছি, নিজেকে প্রস্তুত করছি।’
কথাগুলো বলছিলেন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মাটিয়ান খারিপাড়া গ্রামের খর্বাকৃতির (বামন) নারী মেরিনা আক্তার (২৬)। তাঁর উচ্চতা ৩৯ ইঞ্চি। বাবা সৈয়দ আলী দিনমজুর ও মা নুরনাহার বেগম গৃহিণী। চার ভাই–বোনের মধ্যে মেরিনা তৃতীয়। উচ্চতা ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় খুব বেশি পার্থক্য নেই তাঁর। সম্প্রতি তিনি স্নাতক (ডিগ্রি) শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন। তবে মেরিনার পড়ালেখার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁর বাবা। চাকরি করে সংসারে সহায়তা করতে চান মেরিনা। যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির প্রত্যাশা তাঁর।
মাটিয়ান গ্রামে তিন শতক জমিতে টিনের চালাযুক্ত দুই কক্ষের একটি ছাপরাই সৈয়দ আলীর পরিবারের একমাত্র আশ্রয়। পাশেই টিনের ছাউনির রান্নাঘর। গতকাল বুধবার বিকেলে মেরিনার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের বারান্দায় কয়েকজন খুদে শিক্ষার্থী বসে আছে। মেরিনা আসতেই বই খুলে শুরু হয় পড়াশোনা।
আলাপচারিতায় মেরিনা জানান, নিজের পড়াশোনা ও সংসারের কাজের পাশাপাশি তিনি সকাল–বিকেল তিনটি ব্যাচে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পড়ান। সেখান থেকে কিছু আয় হয়। এ ছাড়া বাড়ির পাশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হাতের লেখা শেখান, সেখান থেকে মাসিক দুই হাজার টাকা পান। পাশাপাশি সরকার থেকে প্রতিবন্ধী ভাতাও পান। সব মিলিয়ে যতটা সম্ভব সংসারে বাবাকে সহযোগিতা করেন এবং নিজের পড়ালেখার খরচও চালান।
১৯৯৯ সালে জন্ম মেরিনার। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কাশিডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে জিপিএ ৩.৫০ পেয়ে মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর ধুকুড়ঝাড়ী কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ২০২৬ সালে বিরল সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কয়েক দিন আগে দিনাজপুর সরকারি কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন।
মেরিনা বলেন, ‘মাস্টার্সে ভর্তি হতে প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে টাকা দিয়েছে। বুঝতেছি বাবার জন্য চাপ হচ্ছে, কিন্তু তারপরও বাবা উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন।’
কম্পিউটারে অফিস প্রোগ্রাম, এমএস ওয়ার্ড ও এক্সেলের কাজ জানেন মেরিনা। ২০২৩ সালে বিরল উপজেলা থেকে কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। ঋণ করে একটি কম্পিউটার কিনেছিলেন, তবে সম্প্রতি সেটির সিপিইউ নষ্ট হয়েছে। তিনি জানান, কম্পিউটারে টাইপ করা ও এক্সেলের কাজ মোটামুটি জানলেও কাজের সুযোগ না থাকায় চর্চা কম হয়।
আত্মবিশ্বাসী মেরিনা বলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় পরিবারের বোঝা হয়ে আছি। কিন্তু আবার অনেকেই যখন ভালো করে কথা বলে, খোঁজখবর নেয়, উৎসাহ দেয়—তখন ভীষণ ভালো লাগে। মনে শক্তি পাই। যেভাবেই হোক পড়ালেখাটা শেষ করব। একটা চাকরি পেলে মা–বাবার পাশে দাঁড়াব।’
মেরিনার কলেজশিক্ষক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘মেরিনা পড়ালেখায় ভালো। এখন তো মাস্টার্স পড়ছে। খর্বাকৃতির হলেও অন্যদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। পরিবারে দারিদ্র্য আছে। আমরা বিভিন্ন সময়ে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।’
মেয়েকে নিজের কষ্ট বুঝতে দিতে চান না বাবা সৈয়দ আলী। তিনি বলেন, ‘ওরা চার ভাই–বোন। মেরিনাই শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধী। বাকি সবার বিয়ে দিয়েছি। মেরিনার বিয়ের বয়স হয়েছে। বিয়ের সম্বন্ধ এলেও মেয়েকে বিয়ে দিতে ভয় হয়। শুধু মনে হয়, সংসারজীবনেও শান্তি আসবে তো মেয়েটার? যদি একটা কর্ম শুরু করতে পারে, তাহলে অন্তত চিন্তামুক্ত হতে পারব।’








Bengali (BD) ·
English (US) ·