ছেলেকে লেখা রাহুলের শেষ চিঠিতে অশ্রুসিক্ত ভক্তরা

২ সপ্তাহ আগে
সদ্য প্রয়াত টালিউড অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবরে ভারী হয়ে উঠেছে টালিপাড়ার বাতাস। শুটিংয়ের সময় তার আকস্মিক মৃত্যু যেন কল্পনাকেও হার মানায়। এই মুহূর্তে রাহুলকে যখন শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে, সে সময়ই একমাত্র সন্তান সহজকে লেখা অভিনেতার একটি খোলা চিঠি কাঁদাচ্ছে ভক্তদের।

‘ফাদারস ডে’-তে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেছিলেন রাহুল। অভিনেতার মৃত্যুর পর হঠাৎই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ওই চিঠি। চিঠির প্রতিটি শব্দ আজ ভক্তদের হৃদয়ে বিঁধছে তীরের মতো। অনেক ভক্তই সামাজিক মাধ্যমে চিঠিটি শেয়ার করে লিখছেন ‘হৃদয়ে রক্তক্ষরণের গল্প’।

 

ছেলে সহজকে উদ্দেশ্য করে লেখা টালিউড অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শেষ চিঠি’টি সময়ের পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো-

 

এই চিঠিটা আজকে 'ফাদারস ডে' বলে লিখতে বসা। যদিও তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও 'ফাদারস ডে', 'মাদারস ডে'- এগুলো আলাদা করে জানতো না। কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এসব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত।

 

জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু, যখন তোমার মায়ের বয়স ১৪ বছর, আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। যেহেতু ছোট, তাই আমাদের শট নেয়া হতো সবার শেষে। আমরা দুজন সেটের কোনায় বসে আড্ডা মারতাম।

 

তোমার মা ছিল বেহালার একজন অ্যাকাউন্টস শিক্ষকের মেয়ে, আর আমি খুব সাধারণ এক সরকারি চাকুরের ছেলে। আমরা দুজন ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে। তোমাকে এই গল্প কেন বলছি জানো?

 

যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তা হলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড। যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে, ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা মা।

 

এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয়, আমি তোমাকে অনুরোধ করব প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও। কারণ যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন। উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, বাবা হিসেবে এটুকু আশা করতেই পারি।

 

যে দিন আমরা প্রথম খবর পাই, তুমি আমাদের জীবনে আসছো, আমরা আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। তোমার মা গুচ্ছের সব অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলল। প্রতিদিন আমাকে আপডেট দিত। এখন ওর সাইজ আপেলের মতো, এখন ওর সাইজ আনারসের মতো, আরও কত কী!

 

তারপর যখন তুমি হলে, তোমার মায়ের আরেকটা রূপ দেখলাম। তুমি জানো না হয়তো, তোমার মা তোমাকে কোনদিনও বাজারে পাওয়া বেবিফুড কিনে খাওয়ায়নি। সব নিজের হাতে রান্না করত। তোমার জন্য তোমার মায়ের অনেক সংগ্রাম, অনেক আত্মত্যাগ। তুমি কতটা মনে রাখবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত।

 

গন্ডারের চামড়া ধার নিয়ে তবে সেলিব্রিটি হওয়া যায়, এ আমরা শিখে গেছি। শুধু তোমাকে বলছি, তোমার মায়ের লড়াইয়ের একটা আন্দাজ দেয়ার জন্য। আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মাও রেখেছে। কিন্তু আমি চাইব, তুমি সেই ক্ষতগুলোর যত্ন নিবে। মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে নাও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে।

 

আরও পড়ুন: রাহুলের মৃত্যুর আগে শুটিংয়ে কী ঘটেছিল, জানালেন নির্মাতা

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কোন হরিদাস পাল যে তোমাকে এত জ্ঞান দিচ্ছে? আমি তোর বাপ, দূর সম্পর্কেরই হই, বাপ তো বটে! সেই উপলক্ষে একটু জ্ঞান দেয়ার অধিকার আছে। আমি তোমাকে আমার ভাগের সব কটা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো।

 

আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা, বাংলা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম। সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার।

 

আরও পড়ুন: অভিনেতা রাহুলের মৃত্যু: ময়নাতদন্ত রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন