চিনি না খেলেও সুগার বেশি থাকে যে কারণে

২ সপ্তাহ আগে

চিনি না খেয়েও কেন রক্তে সুগার বাড়ে, এ প্রশ্ন অনেকের। এর পেছনে লিভারের গ্লুকোজ উৎপাদন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও স্ট্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও হরমোনের ভারসাম্য বুঝলেই সমাধানের পথ পরিষ্কার হয়। এটি একটি সাধারণ কিন্তু জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

আমি চিনি খাই না। তাহলে আমার রক্তে চিনির মাত্রা এত বেশি কেন? এমন প্রশ্ন আমরা হরহামেশাই করে থাকি। বিশেষ করে চিকিৎসককেই করা হয়।
আসলে আপনি সবকিছু ঠিকঠাক করছেন। চিনি ছেড়ে দিয়েছেন। রুটি-পাউরুটি খাওয়া বাদ দিয়েছেন। অনেক দিন ধরে কোনো মিষ্টিজাতীয় খাবার খাননি। তারপরও রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখে মনে হয়, কী হচ্ছে এটা? আমার ব্লাড সুগার তো এখনো বেশি!

চিনি না খেয়েও বাড়ে ইনসুলিন

চিকিৎসক হয়তো আপনার দিকে এমনভাবে তাকাবেন যেন আপনি লুকিয়ে মিষ্টি বা তেমন কিছু খাচ্ছেন বলেই এমন হচ্ছে। অথচ আপনি সত্যিই কিছুই করছেন না।
আপনাকে দেখাব, আসলে কী হচ্ছে। এই পুরো ধাঁধার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনেকেই জানেন না।

অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, তাঁদের রক্তে চিনির মাত্রা শুধু যা খাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে—চিনি, স্টার্চ ইত্যাদি। কিন্তু এটা অর্ধেক সত্য।

চলুন, আপনাকে লিভারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আপনার লিভারের ৫০০টি কাজ আছে। এটি শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়, কিন্তু এটি আসলে একটা চিনির কারখানা। শরীরের একটা ছোট অংশের জন্য চিনি একান্ত দরকার। মস্তিষ্কের কিছু অংশ, কিডনি এবং আরও কিছু টিস্যু, যেগুলো সরাসরি চিনির ওপর নির্ভর করে। তাই আপনি চিনি না খেলেও, লিভার নিজে থেকে চিনি তৈরি করে।

যখন কেউ খুব কম চিনি বা কম কার্বোহাইড্রেটের ডায়েট করে, তখন শরীর চর্বি থেকে শক্তি নেয়, যে চর্বি খাবার থেকে আসে এবং শরীরের নিজের চর্বি থেকে। আর লিভার চিনি তৈরি করে এমন জিনিস থেকে যা আসলে চিনি নয়। এটি চর্বি থেকে চিনি বানায়, প্রোটিন থেকে চিনি বানায় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশকে সরবরাহ করে।

তাহলে আমার রক্তে চিনি কেন বেশি?

আসলে এই চিনি তৈরির প্রক্রিয়ার একটা ‘অফ সুইচ’ আছে। সেই অফ সুইচ হলো ইনসুলিন। যদি ইনসুলিন পর্যাপ্ত না থাকে, তাহলে লিভার অবিরাম চিনি তৈরি করতেই থাকবে।

এখানে একটা দ্বন্দ্ব দেখা যায়। যদি আমি কার্বোহাইড্রেট না খাই, তাহলে ইনসুলিন কমে যাবে। তাহলে তো শরীর আরও বেশি চিনি তৈরি করবে!

ব্যাপারটা হলো, এই হরমোনকে অনেক বছর ধরে (১০-১৫ বছর) অতিরিক্ত উত্তেজিত করা হয়েছে। ফলে কোষগুলো এত বেশি ইনসুলিনের আঘাত সহ্য করেছে যে তারা এই ‘অফ সুইচ’কে আর গুরুত্ব দেয় না। এর ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। লিভার তখন ভাবে, ‘অফ সুইচ’ তো কাজ করছে না, তাহলে আরও বেশি চিনি তৈরি করি।

আরও সহজ করে বলি, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে লিভার অতিরিক্ত চিনি তৈরি করে। দীর্ঘদিন (১০-২০ বছর) ধরে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট খেলে এই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স হয়। কারণ, ইনসুলিন সেই চিনিকে রক্ত থেকে পরিষ্কার করে ফেলে। এভাবে ১০-২০ বছর ধরে অনেক চিনি খাওয়া যায়, ডায়াবেটিসও হয় না। কিন্তু ইনসুলিনের মাত্রা খুব বেশি থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা সাধারণত ফাস্টিং ইনসুলিন পরীক্ষা করেন না।

একদিন এমন অবস্থা হয় যে ইনসুলিন আর কাজ করে না। তখন ইনসুলিনের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে রক্ত থেকে চিনি পরিষ্কার করা যায় না এবং লিভারের ‘অফ সুইচ’ও বন্ধ হয় না। তখনই রক্তে গ্লুকোজ বাড়তে শুরু করে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তের ৮০% চিনি আসে এই লিভার থেকেই। এ জন্য মেটফর্মিনের মতো ওষুধ লিভার ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ওপর কাজ করে। কিন্তু এটা শুধু লক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে, মূল কারণকে ঠিক করে না।

স্ট্রেসও ক্ষতিকর

আপনার যদি চিনি না খাওয়ার পরও ব্লাড সুগার বেশি থাকে, তাহলে দুটো কারণ হতে পারে:
১. ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: লিভার থেকে অতিরিক্ত চিনি তৈরি হচ্ছে।
২. অতিরিক্ত স্ট্রেস: স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল রক্তে চিনি ছাড়ছে।
আগের দিন চিনি বা মিষ্টি না খেলেও সকালে ঘুম থেকে উঠে মাপার পর ব্লাড সুগার বেশি দেখালে এটাকে বলে ডন ফেনোমেনান। এর পেছনে কর্টিসল এবং লিভারের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দায়ী। সকাল আটটার দিকে কর্টিসলের সবচেয়ে বড় স্পাইক হয়।

কীভাবে এটি ঠিক করবেন?

স্ন্যাকিং বন্ধ করতে হবে

১. লো-কার্ব ডায়েট করা। শুধু চিনি নয়, স্টার্চও কমাতে হবে।
২. স্ন্যাকিং একদম বন্ধ করা, বিশেষ করে রাতে। দিনে দুই-তিনবার খাওয়াই যথেষ্ট। আমি পরামর্শ দেব দুইবেলা খাওয়ার জন্য। সকালের নাশতা বাদ দিন। দুপুর ১২টায় খান, তারপর সন্ধ্যা ৬টায় খান। খাওয়ার পর রান্নাঘর বন্ধ।
৩. স্ট্রেস কমান। ভালো ঘুমান, নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করুন, রোদে বের হন।
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সারাতে সময় লাগে। যদি আপনার ফাস্টিং ইনসুলিন ১২-এর বেশি থাকে, তাহলে কয়েক মাস লাগতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ, কারও কয়েক মাস, আবার কারও এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।
মূল কথা: ইনসুলিনকে দীর্ঘদিন কম রাখতে হবে, যাতে রিসেপ্টরগুলো আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।

লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকেজলসডটকম

সম্পূর্ণ পড়ুন