যুদ্ধের ‘জয়’ খেলাধুলার মতো নয়, যেখানে নির্দিষ্ট সময় শেষে স্কোর দেখে বিজয়ী ঠিক হয়। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তখন সরকারের আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য ও প্রচারণামূলক ভিডিওর পেছনে রয়েছে একটি কঠিন বাস্তবতা। শুধু ‘আমরা জিতেছি’ বললেই হয় না, ইরানকে এমন অবস্থায় আনতে হবে যেন তারা সত্যিই পরাজিত হয়েছে বলে আচরণ করে।
এখানেই ট্রাম্প এক পুরনো ভুলের ফাঁদে পড়েছেন। আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, দ্রুত ও সীমিত সামরিক হামলা দিয়ে দ্রুত রাজনৈতিক ফল পাওয়া যায় না।
সোভিয়েত ইউনিয়ন সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে একই ভুল করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক যুদ্ধেও ভেবেছিল দ্রুত জয় পাবে। আবার রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনও ইউক্রেনে দ্রুত সফলতা আশা করেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ এখনও চলছে। কারণ একটি দেশের মানুষ যখন নিজেদের দেশ ও ঘরবাড়ি রক্ষা করতে নামে, তখন তাদের প্রতিরোধ অনেক বেশি শক্ত হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, হোয়াইট হাউস হয়তো তাড়াহুড়া করে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ইসরাইলের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর আঞ্চলিক লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য থেকে আলাদা হতে পারে। তিনি এমন একটি ইরান চান যা দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং আর হুমকি হয়ে থাকবে না।
আরও পড়ুন: ‘প্রয়োজন হলে’ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ পাহারা দেবে যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প
তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শাহাদাতে পর পরিস্থিতি সহজ হয়নি; বরং এতে যতটা সমাধান এসেছে, ততটাই নতুন সমস্যাও তৈরি হয়েছে। ভেনেজুয়েলার নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর ডেলসি রদ্রিগেজের মতো কোনো বিকল্প নেতা ইরানে অপেক্ষা করে নেই যাকে ট্রাম্প ক্ষমতায় বসাতে পারবেন।
বরং ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা দ্রুত পূরণ করেছে কট্টরপন্থিরা, আর নতুন সর্বোচ্চ নেতা হয়েছেন মোজতবা খামেনি—যাকে চান না বলে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই নিজের মত জানিয়েছিলেন। মোজতবা নিজে নিজে ভিডিও বার্তা ধারণ করার মতো যথেষ্ট সুস্থ কি না তা পরিষ্কার নয়। তবে রাষ্ট্রীয় টিভিতে তার প্রথম বার্তা একজন উপস্থাপক পড়ে শুনিয়েছেন।
এদিকে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) তাদের নিহত কমান্ডারদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব যদি একইভাবে নিহত হতো, তাহলে যেমন প্রতিশোধের মনোভাব তৈরি হতো, ইরানেও এখন ঠিক তেমনই তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এই পরিস্থিতি ট্রাম্পের জন্য দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনাকে কঠিন করে তুলেছে। মাত্র ১৩ দিনের মধ্যেই ইরান এই যুদ্ধকে এক ধরনের সহনশীলতার পরীক্ষায় পরিণত করেছে, এবং এখন পর্যন্ত তারা তা সহ্য করে টিকে আছে।
আরও পড়ুন: ইরাকে মার্কিন বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৪ ক্রু নিহত
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে মাসের পর মাস বোমা হামলা চালাতে পারে। কিন্তু এতে তাদের অস্ত্রভান্ডার কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ বাড়বে এবং মার্কিন সেনাদের হতাহতের আশঙ্কাও বাড়বে।
অন্যদিকে ইরান অবশ্যই ক্ষতি সহ্য করবে। তাদের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার, ড্রোন ঘাঁটি, সেনা ও অবকাঠামো ধ্বংস হবে। কিন্তু এত কিছু হারানোর পরও তাদের বাহিনীর কিছু অংশ টিকে থাকবে, যাতে তারা পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য না হয়।
বহু বছর ধরে আইআরজিসি এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের কাছে এটি শুধু যুদ্ধ নয়, এক ধরনের আদর্শিক দায়িত্ব। বোমা, ড্রোন বা মানুষ কমে যেতে পারে, কিন্তু লড়াইয়ের ইচ্ছা শেষ হবে না। ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধেও একই শিক্ষা দেখা গেছে।
ইরানের ভেতরে সরকারকে সমর্থন নিয়ে বিভক্তি আছে। কিন্তু যখন কোনো দেশ আকাশ থেকে বোমাবর্ষণের শিকার হয়, তখন অনেক সময় ভিন্নমত থাকা মানুষও একসঙ্গে দাঁড়িয়ে যায়। ধারণা করা হয়েছিল যে ধারাবাহিক নির্ভুল হামলা ইরানের জনগণের মধ্যে বড় বিদ্রোহ সৃষ্টি করবে। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা যাচ্ছে এই ধারণা বাস্তবসম্মত ছিল না।
ফলে ইরানে ট্রাম্পের কাছে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’ বা শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য অনেকটাই বদলে গেছে। সেই জায়গায় এখন তার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে কীভাবে এই যুদ্ধের শেষ টানা যায়।
আরও পড়ুন: সিএনএনের বিশ্লেষণ / ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের না জেতার সাত কারণ
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশশক্তির সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিমান হামলা দিয়ে কোনো দেশের সামরিক ক্ষমতা কমানো বা কিছু শীর্ষ নেতাকে সরানো সম্ভব হলেও ইরানের ক্ষেত্রে এখনো পর্যন্ত তা সরকারকে নীতি বদলাতে বাধ্য করতে পারেনি, কিংবা সরকার পরিবর্তনও ঘটাতে পারেনি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব হামলার কার্যকারিতা কমে যেতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। কারণ সামরিক লক্ষ্যবস্তু কমতে থাকলে সেগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের জীবন ও অবকাঠামোর সঙ্গে মিশে যায়।
অন্যদিকে ইরানের হিসাবটা ভিন্নভাবে কাজ করছে। তারা চাইলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বা আক্রমণ করতে পারে। এতে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে থাকতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে।
তখন প্রতিবাদ জানিয়ে অনেকেই বলতে পারে, ট্রাম্পের উচিত ছিল আগেই এই পরিস্থিতির সম্ভাবনা বোঝা। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়তো সময়ের সঙ্গে কমে যেতে পারে, কিন্তু কেবল এই হামলা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাই তাদের জন্য এক ধরনের সাফল্য।
এদিকে ট্রাম্প এখন প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধ শেষ করা ও বিজয়ের কথা বলছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি সংঘাত শেষ করতে চান। কিন্তু যুদ্ধের সময় বার্তার ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যখন প্রকাশ্যে বারবার যুদ্ধ শেষ করার কথা বলছেন, তখন প্রতিপক্ষ বুঝে যাচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন সংঘাত থেকে বের হতে চাইছে।
আরও পড়ুন: ইরানি শাসকদের হত্যা করা ট্রাম্পের কাছে ‘মহান সম্মানের’ বিষয়!
ফলে ইরানের শাসকদের জন্য পরিস্থিতি এখন অনেকটা পরিষ্কার। তাদের জন্য ‘জয়’ মানে হয়তো পুরোপুরি জেতা নয়, কিন্তু অন্তত পরাজিত না হওয়া। আর সেই লক্ষ্য অর্জনের পথ হলো শুধু টিকে থাকা।
ধরা যাক, আবারও কোনো শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হলো, যেমন আগে আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। তাতে ইরানের প্রতিরোধ কমার বদলে আরও শক্ত হতে পারে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাও এমন ছিল।
সেখানে তালেবান নেতাদের নিয়মিত হত্যার অভিযান চালানো হলেও যুদ্ধ শেষ করা আরও কঠিন হয়ে গিয়েছিল। কারণ পরে আলোচনার জন্য সামনে আসে নিহত নেতাদের আরও ক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ অনুসারীরা।
এখনই এই সংঘাতকে ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ বলা যাচ্ছে না। যুদ্ধ শুরু হয়েছে মাত্র ১৩ দিন। সম্ভবত নীরব কূটনীতি বা দুই পক্ষের ক্লান্তি মিলিয়ে আগামী কয়েক সপ্তাহে সহিংসতা ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে, এমনভাবে যাতে উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয় দাবি করতে পারে।
এরপর ইরানের শাসকগোষ্ঠী আবার নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করার চেষ্টা করবে। তারা হয়তো আরও কট্টর, আরও কঠোর হয়ে উঠবে। কারণ তারা দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পুরো সামরিক শক্তি তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করতে পারে এবং সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু তবুও সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি। তাদের জন্য এটাও এক ধরনের বড় মানসিক বিজয়।
আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্যে কি কর্তৃত্ব বিস্তারের শেষ চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র?
সম্ভবত রাশিয়া ও চীন ইরানকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। হয়তো আগের মতো খুব শক্তিশালী নয়, কিন্তু অন্তত এতটা স্থিতিশীল হবে যে প্রতিপক্ষকে আবার আঘাত করার সক্ষমতা রাখবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ভবিষ্যতে আবারও নতুন হামলার কথা ভাবতে হতে পারে, যদি তারা শক্তি ফিরে পাওয়া তেহরানকে দুর্বল করতে চায়। এতে পরিস্থিতি অনেকটা ইউরোপের সামনে থাকা ইউক্রেনের সংকটের মতো হতে পারে।
রাশিয়া যেমন ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে নাশকতা ও সাইবার হামলার মতো অসম যুদ্ধ কৌশল ব্যবহার করছে, তেমনভাবেই ইরানও ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে ছোট ছোট চাপের মধ্যে রাখতে পারে। তারা এমনভাবে আঘাত করতে পারে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়, কিন্তু আবার সরাসরি বড় যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকিও না থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে গুরুতর সিদ্ধান্ত হলো সেনাদের যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো। এই ভুল শুধু ট্রাম্পেরর নয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
আরও পড়ুন: ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ঠেকাতে পারল না চীন-রাশিয়া
এরপর তার উত্তরসূরি বারাক ওবামা ভেবেছিলেন, আরও চেষ্টা করলে আফগানিস্তানে জয় পাওয়া সম্ভব। আর তার উত্তরসূরি জো বাইডেনের আমলে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশৃঙ্খল প্রত্যাহার দেখিয়ে দিয়েছে যে, সেখানে ওয়াশিংটনের ব্যর্থতা কতটা বড় ছিল।
ইরানে ট্রাম্প মাত্র ১২ দিন পরই ‘বিজয়ে’র ঘোষণা দিয়েছেন, কিন্তু সেই বিজয় এখনও বাস্তবে নিশ্চিত হয়নি এবং প্রতিপক্ষও তা মেনে নেয়নি। ফলে এখন ট্রাম্প এমন এক কঠিন অবস্থায় পড়েছেন যেখানে তাকে দুইটি বিপরীত বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে চলতে হচ্ছে।
একদিকে তিনি যেকোনোভাবেই নিজেকে বিজয়ী হিসেবে দেখাতে চান, আর অন্যদিকে ইরান দৃঢ়ভাবে লড়াই চালিয়ে যেতে চায় এবং থামতে রাজি নয়। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দুই পক্ষের ক্লান্ত হয়ে পড়ার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া যেন আর কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা নেই। কিন্তু শুধু ক্লান্তির অপেক্ষা করা আসলে কোনো শক্ত কৌশল নয়, তবু আপাতত সেটাই একমাত্র পথ বলে মনে হচ্ছে।
]]>
৪ সপ্তাহ আগে
৭








Bengali (BD) ·
English (US) ·