গাজায় এক লাশের খোঁজে ২০০ কবর তছনছ ইসরাইলি বাহিনীর

৪ সপ্তাহ আগে
একটি মৃতদেহ উদ্ধারের জন্য ইসরাইলি সেনাবাহিনী পুরো একটা ট্যাঙ্ক বহর নামায়। মোতায়েন করে কিলার ড্রোন আর ‘বিস্ফোরক রোবট’। পুরো একটি আবাসিক এলাকাকে ঘোষণা করা হয় ‘কিল জোন’। একে একে খুঁড়ে ফেলা হয় প্রায় ২০০ কবর। অভিযানের নিহত হয় আরও চারজন বেসামরিক মানুষ।

এই বিশাল সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিলেন রান গিভিলি। দুই বছরেরও বেশি আগে নিহত এক ইসরাইলি পুলিশ কর্মকর্তা, যাকে গাজায় থাকা শেষ ইসরাইলি বন্দি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। গত সোমবার (২৬ জানুয়ারি) তার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। একে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরেন।

 

কিন্তু গিভিলির দেহ যেখান থেকে যত্নসহকারে তুলে নেয়া হয়, সেখান থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরেই রয়েছে আরেকটি ভয়াবহ বাস্তবতা। ফিলিস্তিনিদের নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গাজায় এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি মরদেহ। পরিচয়হীন, নীরবে পচে যাওয়া সেই দেহগুলোর জন্য নেই কোনো রাষ্ট্রীয় অভিযান, নেই আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।

 

আরও পড়ুন: লেবাননে ইসরাইলি হামলায় টিভি উপস্থাপক নিহত

 

অনেক পরিবার আজও জানে না, তাদের প্রিয়জন বেঁচে আছেন নাকি মৃত। তাদের জন্য নেই বিস্ফোরক রোবট, নেই ফরেনসিক দল, নেই বৈশ্বিক সংবাদ শিরোনাম।

 

গাজা শহরের তুফ্ফাহ এলাকার আল-বাতশ কবরস্থান খুঁড়ে ফেলার ঘটনা এখন এক নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছে। একটি ইসরাইলি মরদেহ যেখানে পুরো সেনাবাহিনীর মনোযোগ পায়, সেখানে হাজারো ফিলিস্তিনি দেহ যুদ্ধবিধ্বস্ত এক ভয়ংকর প্রাকৃতিক দৃশ্যের অংশ হয়ে পড়ে থাকে।

 

কবরের চারপাশ ঘিরে ‘কিল জোন’

 

গাজার এক সাংবাদিক খামিস আল-রিফি ইসরাইলি এই অভিযানের সময় এর ভয়াবহতার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রথমে বিস্ফোরক রোবট ও বিমান হামলা চালিয়ে ট্যাঙ্কের জন্য পথ পরিষ্কার করা হয়। এরপর কবরস্থানের চারপাশে এমন নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয় যে, নড়াচড়া করলেই গুলি।

 

ওই সময় ইসরাইলের ঘোষিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা বাফার জোনের কাছেই ছিলেন আল-রিফি। এই ইয়েলো লাইনকে তিনি কামান ও হেলিকপ্টারের আগুনে তৈরি হওয়া এক ‘আগুনের দেয়াল’ বলে অভিহিত করেন। জানান, এর ভেতরে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটগুলো দুই দিন ধরে মাটি খুঁড়ে কবরগুলো উলটপালট করে দেয়।

 

আরও পড়ুন: ট্রাম্পকে মাদুরো-স্টাইলে ধরে আনার হুমকি ইরানের!

 

আল-রিফি জানান, প্রায় ২০০ কবর খোঁড়া হয়েছে। একটির পর একটি মরদেহ বের করে পরীক্ষা করা হয়, যতক্ষণ না ইসরাইলি দেহটি পাওয়া যায়।’ অভিযান শেষে বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গিভিলির দেহ হেলিকপ্টারে করে ইসরাইলে নিয়ে গিয়ে সম্মানের সঙ্গে দাফন করা হয়। আর ফিলিস্তিনি মরদেহগুলো বুলডোজারের দয়ার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়।

 

ফিলিস্তিনি এই সাংবাদিক বলেন, ‘ইসরাইলি সেনারা চলে যাওয়ার পর মানুষ গিয়ে দেখে, মরদেহগুলো এলোমেলোভাবে আবার মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। কিছু দেহ মাটির ওপরেই পড়ে ছিল।’

 

‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবরস্থান’

 

নিখোঁজ ব্যক্তিদের জাতীয় কমিটির মুখপাত্র আলা উদ্দিন আল-আক্লুক আগেই বলেছিলেন, গাজা এখন ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবরস্থান’। তার ভাষায়, বহু মানুষ নিজেদের ঘরের ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে আছে, শেষ মর্যাদাটুকুও পায়নি।

 

তিনি বলেন, একদিকে ইসরাইলি বন্দিদের উদ্ধারে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিএনএ ল্যাব ব্যবহার করা হচ্ছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের মরদেহ উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী উদ্ধারযন্ত্র পর্যন্ত ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না।

 

আরও পড়ুন: গাজায় আর কোনো ইসরাইলি বন্দি নেই: সামরিক বাহিনী

 

ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভের মহাসচিব মুস্তাফা বারঘুতি বলেন, ‘যেকোনো পরিবারেরই তাদের মৃতকে দাফন করার অধিকার আছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের মানুষ হিসেবে সমান সম্মান না দেয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর।’

 

নতুন করে আরও কবর

 

এই অভিযানের সবচেয়ে নির্মম দিক হলো, এটি নতুন করে আরও প্রাণও কেড়ে নিয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সকালে স্থানীয়রা ধ্বংসস্তূপে নিজেদের স্বজনদের কবরের অবস্থা দেখতে গেলে আবারও গুলি চলে। এতে চারজন নিহত হন। নিহতদের একজন ছিলেন সাংবাদিক খামিস আল-রিফির আত্মীয় ইউসুফ আল-রিফি। তিনি শুধু কবরস্থানের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে গিয়েছিলেন।

 

২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধের এক যন্ত্রণাদায়ক অধ্যায় শেষ করতে গিয়ে ২০২৬ সালে ইসরাইল নতুন কবর খুঁড়তে বাধ্য করেছে। এই অভিযান যেন পুরো যুদ্ধেরই প্রতিচ্ছবি। এক পক্ষের জীবন ও মৃত্যুর পবিত্রতা রক্ষা করা হয়, আরেক পক্ষের অস্তিত্বের মূল্য চুকাতে হয় নীরবে।

 

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
 

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন