গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে বেঁচে আছে প্রাচীন ‘সারী’ ধর্ম

৩ সপ্তাহ আগে
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে রাজাহার ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘রাজা বিরাট’। এই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলে গড়ে ওঠা সাঁওতাল পল্লীতে আজও বেঁচে আছে শতবর্ষী ঐতিহ্য, আদি ‘সারী’ ধর্ম এবং প্রকৃতির প্রতি অগাধ বিশ্বাস। আধুনিকতার ভিড়ে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও তারা নিজেদের সংস্কৃতিকে আগলে রেখেছেন।

সাঁওতাল পল্লীতে ঢুকলেই চোখে পড়ে মাটির দেয়াল আর টিনের চালের চমৎকার সব বাড়ি। অভাবের মাঝেও তারা ঘরের দেয়ালে আলপনা ও কারুকাজ করতে ভোলেননি। তাদের অন্যতম এক ঐতিহ্য হলো তীর-ধনুক। বাঁশ রোদে শুকিয়ে এবং বিশেষ লতা দিয়ে তৈরি এই ধনুক আজও তাদের পশু শিকার ও আত্মরক্ষার প্রধান হাতিয়ার।

 

এই ঐতিহ্য নিয়ে জুলিয়াস সরেন বলেন, ‘আমাদের জন্মের আগে থেকে বাপ-দাদারা এটি ব্যবহার করে আসছেন, আমরাও করছি। এই ধনুকে সাধারণ রশি ব্যবহার করলে ছিঁড়ে যাবে, কিন্তু এই বিশেষ লতা দিলে সহজে ছিঁড়বে না। আমরা কামারের কাছে গিয়ে বলে দিই, আমাদের কোন ধরনের তীর লাগবে।’

 

সাঁওতালদের আতিথেয়তা অত্যন্ত চমৎকার। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে কাঁসার থালা ও ঘটিতে জল এনে পরম ভক্তিভরে পা ধুয়ে দেয়া তাদের প্রাচীন রীতি। পা ধোয়ানোর সময় তারা এক মজার অভিনয় করেন।

 

এ প্রসঙ্গে শ্যামবালা হেমব্রম জানান, ‘কুটুম (অতিথি) এলে আমরা এভাবেই পা ধুয়ে দিয়ে সালাম দিই। আমরা বলি যে, অতিথির পায়ে দশ পায়ের কাঁকড়া আছে। এই কাল্পনিক কাঁকড়া ছাড়ানোর বিনিময়ে আমরা অতিথির কাছে বকশিশ চাই। না দেয়া পর্যন্ত আমরা পা ছাড়ি না।’

 

আরও পড়ুন: ব্রহ্মপুত্রের বালুচরে মূল্যবান ‘ভারী খনিজ’, জাগছে নতুন আশা

 

সাঁওতালদের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ‘বাহা পরব’। তাদের ধর্মে কোনো সুনির্দিষ্ট দেবদেবী নেই; তারা গাছপালা, জল আর আগুনকেই সব মনে করেন। প্রকৃতি থেকেই মানুষের সব প্রাপ্তি বলে তাদের বিশ্বাস।

 

পূজা সম্পর্কে পুরোহিত বলেন, ‘১৪ পুরুষ ধরে বাপ-দাদারা এই পূজা করে আসছেন, আমরাও করছি। এই পূজাতে অনেক উপকার হয়, গ্রামে বসন্ত বা কলেরার মতো রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আমাদের কোনো সুনির্দিষ্ট দেবদেবী নেই, গাছপালা আর প্রকৃতিই আমাদের সব।’

 

শালগাছের নিচে ‘মরেক তুরুই’ বা সত্যের সন্ধান পাওয়ার বিশ্বাস থেকেই এই প্রকৃতি পূজার উদ্ভব। এ নিয়ে পুরোহিত বিমল মুর্মু বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা শালগাছের নিচে সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই আমরা প্রকৃতির পূজা করি। আমাদের বিশ্বাস, গাছপালা, জল, আগুন সবকিছুর মধ্যেই প্রাণ আছে এবং তারাই আমাদের রক্ষা করে।’

 

আরও পড়ুন: মরা করতোয়ার পাড়ে পানির হাহাকার

 

পূজার একটি বিশেষ অংশ হলো ‘হাড়িয়া’। এটি সাঁওতালদের নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি পানীয়। ‘মাঞ্জিহী বঙ্গা’র উদ্দেশ্যে এই হাড়িয়া উৎসর্গ করে নারী-পুরুষ সবাই উৎসবে মাতোয়ারা হন। বাঁশি, ধামসা ও মাদলের তালে নিজেদের ভাষায় গান আর নাচে পুরো পল্লী উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।

 

এই আদিবাসী সংস্কৃতির প্রসারে মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর কবীর তনু বলেন, ‘সংস্কৃতি বা ধর্ম মন্ত্রণালয় শুধু হিন্দু বা মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবেই পৃষ্ঠপোষকতা করবে, তা তো নয়। এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের আদিম সংস্কৃতিও আমাদের সম্পদ। তাদের এই বাহা পরব বা প্রকৃতি পূজাতেও সরকারি সহায়তা দেয়া উচিত, যাতে এই ঐতিহ্য হারিয়ে না যায়।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃতিকে ঈশ্বর মেনে সাঁওতালদের এই জীবনবোধ আমাদের মাটির কাছাকাছি থাকার গভীর মমতা শেখায়।’

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন