গভীর রাতে রামু উপজেলার খুনিয়া পালং ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ খুনিয়া নামক স্থানে পাহাড়ের ঢালে একরামের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একরাম মিয়া ও তার ছয় বছরের ছেলে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। এছাড়া ২টি বসতি, ১টি গোয়ালঘর ও গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বন্যহাতির পালটি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি দাবি- মূলত খাদ্যের সন্ধানে পাহাড় থেকে নেমে এসেছিল ৩ সদস্যের বন্য হাতির পাল।
এদিকে হাতির আক্রমণে নিহত ছেনোয়ারা বেগমের স্বামী একরাম মিয়ার বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ রাতের বিভীষিকা।
তিনি জানান, রাতে হঠাৎ করেই বন্যহাতির দল তাদের বাড়ির পাশে এসে পড়ে এবং আঙিনার কাঁঠাল খেতে থাকে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত ঘরের ভেতরে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণ পর হাতিগুলো সরে গেলে তার স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে বাইরে বের হন। তিনি তাকে বারবার নিষেধ করলেও স্ত্রী আবার বাইরে যান।
একপর্যায়ে হাতির মুখোমুখি হয়ে পড়েন তিনি। তখন কীভাবে হাতির আক্রমণ হয়েছে, তা একরাম মিয়া নিজে দেখেননি। পরে আশপাশের লোকজনের ডাক শুনে বাইরে বের হয়ে তিনি খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। প্রথমে স্ত্রীর ওড়না খুঁজে পান সুপারি গাছের পাশে। এরপর বাড়ির কাছেই স্ত্রীর মরদেহ এবং ঘরের পেছনে সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেন।
তিনি বলেন, ঘটনাটি গভীর রাতে ঘটে। হাতির আক্রমণে তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল-মাথা ও শরীর ক্ষতবিক্ষত, হাত-পা ভেঙে যায়, এবং রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন তারা।
একরাম মিয়া জানান, ঠিক কীভাবে হাতির আক্রমণে তাদের মৃত্যু হয়েছে, তা তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনায় তিনি স্ত্রী ও সন্তানকে হারিয়ে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি- ক্ষুধার্ত হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে ঘরবাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি গাছের আম-কাঁঠাল খেয়ে ফেলে। আক্রান্ত পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের জমিতে বসবাস করছিল।
আরও পড়ুন: বন্য হাতির আক্রমণে প্রাণ গেল ঘুমন্ত মা-মেয়ের
প্রত্যক্ষদর্শী হাকিম উল্লাহ বলেন, ‘বাড়ির পাশে আমগাছের দিকে হাতির দল আসতেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কয়েকজন লোক দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করেন। আর হাতি আমার বাড়ির দিকে এসে গোয়ালঘর আক্রমনে। এসময় ৩টি গরু ৩ দিকে চলে যায়। আমি একটি গাছের পেছনে অবস্থান নেয়। আর আমার স্ত্রী ঘরের ভেতরে চৌকির নিচে আশ্রয় নেন। কিছুক্ষণ পর হাতির দল সরে গেলে তিনি বাইরে এসে লোকজনকে ডাক দেন।’
তার অভিযোগ, মূলত আম ও কাঁঠাল খেতে এসে হাতিরা তাণ্ডব চালিয়ে ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে দেয়। কিন্তু এখনও কোনো সরকারি সহায়তা বা ক্ষতিপূরণ পাননি তারা।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা রাতভর ঘুমাতে পারি না। এশার পর থেকেই পাহারা দিতে হয়, একটু শব্দ হলেই দৌড়ে বের হতে হয়। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়া জরুরি।’
রামু থানার পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল সম্পন্ন করে। বিকেলে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে বারবার একই ঘটনা-বন্য হাতির আক্রমণে ঝরছে প্রাণ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রশ্ন, কবে মিলবে স্থায়ী সমাধান?
খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জয়নাল আবেদীন বাবুল জানান, ভোরে ৩টি বন্যহাতি এলাকায় প্রবেশ করে। এসময় এক ব্যক্তি হাতি তাড়ানোর জন্য ঘর থেকে বের হলে, তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে বাইরে আসেন। তখন হাতির আক্রমণে মা ও সন্তান গুরুতরভাবে আহত হয়ে মারা যান। তবে পরিবারের অপর সদস্যরা কোনোভাবে পালিয়ে বাঁচতে সক্ষম হন।
জয়নাল আবেদীন বাবুল আরও জানান, খাদ্যসংকটের কারণেই বন্য হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। খাবারের অভাবে তারা খাটাল ও ধানক্ষেতে আক্রমণ করছে। সরকার যদি হাতির খাদ্যসংস্থানের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিত, তাহলে হয়তো এ ধরনের ঘটনা কমে আসত।
কক্সবাজার (দক্ষিণ) বন বিভাগের ধোয়াপালং বন রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, খাদ্যের সন্ধানে হাতির পাল লোকালয়ে নেমে এসেছিল। ঘটনার পর পালটিকে বনে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই সংঘাত বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি-নয়তো এমন ট্র্যাজেডি থামবে না বলেই আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

৫ দিন আগে
২








Bengali (BD) ·
English (US) ·