পুলিশ জানিয়েছে, বোমাটি ঘিরে রেখে নিষ্ক্রিয় করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের রামু উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম লটউখিয়ার ঘোনা তচ্ছাখালীর গ্রাম। সরেজমিনে গিয়ে এবং গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাহাড়বেষ্টিত গ্রামে কোনো এক সময় পাহাড়ের মাটি কাটতে গিয়েই বড় আকৃতির একটি ধাতব বস্তু খুঁজে পায় স্থানীয়রা। অচেনা বস্তুটি এনে গ্রামের পুকুর পাড়েই রাখা হয়।
এরপর একটানা ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ধাতব বস্তুতে কাপড় ধোঁয়া থেকে শুরু করে চলে লাকড়ী কাটার কাজও। কিন্তু গেল ৩ মাস আগে পাহাড়ি ঢলের মাটিতে ভরাট হয়ে যায় পুকুরটি। এরপর ধাতব বস্তুটি সরিয়ে আনা হয় স্থানীয় বাসিন্দা রোকসানা আক্তারের বসতির পাশে। আর ৩ দিন আগে গ্রামবাসি জানতে একটি কোন ধাতব বস্তু নয়; এটি অবিস্ফোরিত ভয়ংকর এক বোমা।
তচ্ছাখালী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল গফুর (২০) বলেন, ‘আমি ২০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এই সময়ে সব সময়ই বস্তুটি এখানে পড়ে থাকতে দেখেছি। আমরা তখন এখানে গোসল করতাম, কাপড় ধুতাম-কিন্তু কখনো মনে হয়নি এটি বিপজ্জনক কিছু। গত ৩ মাস আগে পুকুরটি ভরে যাওয়ার কারণে বস্তুটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরিয়ে নেয়া হয়। আমরা সবাই এটিকে একটি সাধারণ লোহার যন্ত্র হিসেবেই মনে করতাম। পরে জানতে পারি এটি আসলে একটি বোমা। তখন থেকেই আমরা ভয় পেয়ে এর আশপাশে আর যাই না।
আরও পড়ুন: তবে কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবিস্ফোরিত বোমাতেই এতোদিন কাপড় ধুয়েছে রামুবাসী?
রোকসানা আকতার (২৫) বলেন, ‘আগে আমরা এটাতে কাপড়চোপড় ধুতাম। তাই এটাকে আমরা বোমের ঝিরি বলে ডাকতাম। এখানে কাপড় ধোয়া, কম্বল ধোয়া-ভয় ছাড়াই সবকিছুই করতাম। তখন এখানে একটি পাখার মতো অংশও ছিল, তাই আমাদের কোনো ভয় ছিল না। কিন্তু এখন যখন শুনছি এটা আসলে বোমা, তখন থেকেই আমাদের ভয় কাজ করছে।’
এতদিন বোমাতে কাপড় ধোঁয়ার কাজ করতেন জেনে হতবাক গ্রামবাসী। এরপর থেকে আতংক বিরাজ করছে সবার মাঝে। তাদের দাবি, দ্রুত এটি গ্রাম থেকে সরিয়ে নিয়ে নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করা হোক।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিক বলেন, ‘এত বড় একটি বোমা দেখে আমাদের খুব ভয় লাগছে। এতদিন ভয় লাগেনি, কিন্তু বোমা শুনার পর থেকে খুব ভয় হচ্ছে।’
আরেক বাসিন্দা ইরফান বলেন, ‘এখানে একটি পাথরের মতো একটি জিনিস পাওয়া গিয়েছিল। তখন কেউ জানত না যে এটি আসলে একটি অবিস্ফোরিত বোমা। মানুষ এখানে কাপড়-চোপড় ধুত। পরে সেনাবাহিনী এসে এটি পরীক্ষা করে লাল কাপড় দিয়ে ঘিরে রেখে যায়। আমাদের অনুরোধ, এটি এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে আমাদের জন্য ভালো হবে। কারণ এখানে ছোট ছোট বাচ্চা আছে, আশপাশে অনেক মানুষ বসবাস করে। এটি এখানে থাকলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এমনকি মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে।’
এদিকে গ্রামবাসির মাধ্যমে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় পুলিশ। এরপর বোমাটির চারপাশ ঘিরে দেয়া লাল পতাকা। এরপর সেনাবাহিনীকে অবহিত করলে ঘটনাস্থলে যায় তারা। পুলিশ জানায়, বোমা নিষ্ক্রিয় করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, বোমার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। প্রাথমিকভাবে বোমা সদৃশ্য মনে হওয়ায় বিষয়টি ক্যান্টনমেন্টের বোম ডিসপোজাল ইউনিটকে জানানো হয়। তারা এসে পরিদর্শন করে ধারণা দেয়, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বোমা হতে পারে। এরপর লাল কাপড় দিয়ে এলাকাটি ঘিরে রাখা হয়েছে যাতে কেউ কাছে না যায়।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের মাধ্যমে আর্মি হেডকোয়ার্টারে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশনার জন্য জানানো হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়া গেলে বোমাটি নিষ্ক্রিয় বা অপসারণের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এদিকে স্থানীয় জনগণকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন কেউ ঘেরা এলাকার ভেতরে প্রবেশ না করে।’
অলক বিশ্বাস আরও বলেন, ‘বস্তুটির সঙ্গে একসময় পাখার মতো অংশ ছিল, যা বিভিন্ন সময়ে স্থানীয়রা খুলে নিয়ে গেছে। তারা বুঝতে পারেনি এটি একটি বোমা। দীর্ঘদিন ধরে এটিকে নিত্যনৈমিত্তিক কাজে-কাপড় কাচা বা শুকানোর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। পরে বিষয়টি জানার পর আমরা সবাইকে সতর্ক করি এবং এলাকাটি ঘিরে ফেলা হয়। এতে একটি বড় বিপদ থেকে আমরা স্থানীয় জনগণকে রক্ষা করতে পেরেছি।’
পুলিশ জানায়, বোমাটির আকার প্রশস্ত গ্যাস সিলিন্ডারের মতো, তবে দৈর্ঘ্য আরও বেশি। বহু আগেই স্থানীয়রা বোমার পাখা কেটে নিয়ে গিয়েছে, তাই বস্তুটির আসল পরিচয় কেউ বুঝতে পারেনি। তবে পড়ে থাকতে থাকতে পুরো বোমাটির গায়ে মরিচা ধরে গেছে।’

৪ সপ্তাহ আগে
৮







Bengali (BD) ·
English (US) ·