ঋতু-মনিকাদের খেলা দেখে বাংলাদেশের প্রথম এশিয়ান কাপ হিরো চুন্নু আপ্লুত

১ সপ্তাহে আগে
দক্ষিণ এশিয়ার মঞ্চে বাংলাদেশের মেয়েদের দাপট নেহাতি কম নয়, দুইবারের চ্যাম্পিয়ন তারা। তবে এশিয়ার মঞ্চটা যে একেবারেই ভিন্ন, সেখানে ভারত-নেপাল-ভুটানের মতো দল নয়; খেলতে হবে চীন-উত্তর কোরিয়া-উজবেকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে। টুর্নামেন্টে রেকর্ড ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীন, তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশ কতটা লড়াই করতে পারবে; মাঠে নামার আগে সেই প্রশ্নটাই হয়তো বারবার উঁকি মারছিল। কিন্তু ঋতুপর্ণা-মনিকারা এ কি করলেন! মানুষের পুরো ধারণাটাই যে পাল্টে দিলেন। তারা প্রমাণ করে দিলেন, শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়; এশিয়ার মঞ্চেও লড়াই করতে জানেন তারা। তাদের এমন লড়ায়ের মানসিকতা দেখে রীতিমতো আপ্লুত বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবার এশিয়ান কাপে খেলা এবং উত্তর কোরিয়ার মতো দলের বিপক্ষে গোল করা আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু। সময় সংবাদকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মেয়েদের খেলা দেখে আমি খুব আপ্লুত, হেড টু হেড খেলেছে তারা।’

নামে-ভারে কিংবা পরিসংখ্যান— চীনের চেয়ে যোজন যোজন পিছিয়ে বাংলাদেশ। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের সামনে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপ খেলতে যাওয়া বাংলাদেশ, লড়াইটা কেমন হবে তা হয়তো আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। কিন্তু সেই অনুমান যে পুরোপুরি ঠিক নয়, তা তো প্রমাণ করেই দিলেন ঋতু-মনিকারা। তারা যে লড়াই করতে জানে। 

 

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) নারী এশিয়ান কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে চীনের বিপক্ষে ২-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। পুরো ম্যাচেই প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে ঋতুপর্ণা-মারিয়া-মনিকারা। 

 

যে দলটা নারী এশিয়ান কাপের রেকর্ড ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন, যে দলটা বিশ্বকাপে খেলে, এমন কি বিশ্বকাপের ফাইনালেও খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে; সেই দলটাই ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের ডেরায় এসে এভাবে কুর্নিশ জানিয়েছে। সেখানেই তো আসলে হেরে গিয়েও জিতে গিয়েছে বাংলার মেয়েরা। 

 

No photo description available.বাংলাদেশ জাতীয় দলের কিংবদন্তি ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু। ছবি: সংগৃহীত

 

তবে মেয়েরা প্রথমবার এশিয়ান কাপে খেললেও বাংলাদেশ কিন্তু প্রথম নয়। এর আগে ১৯৮০ সালে প্রথমবারের মতো এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলেছে বাংলাদেশ ‍পুরুষ ফুটবল দল। সেই দলটার অন্যতম সদস্য ছিলেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু। ১৯৮০ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দল উত্তর কোরিয়া, তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলেছে চোখে চোখ রেখে। ৩ গোল হজম করলেও উত্তর কোরিয়ার জালে বল জড়িয়েছিলেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু। সে ম্যাচে ৬০ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন সালাহউদ্দিন, আর ৯০ মিনিটে দারুণ এক গোল করেছিলেন বাংলাদেশের কিংবদন্তি ফুটবলার চুন্নু। ৪৬ বছর পর আজ সেই এশিয়ার মঞ্চে খেলতে নামলেন বাংলাদেশের মেয়েরা। চীনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে এমন লড়াই করার মানসিকতা দেখে রীতিমতো আপ্লুত হয়েছেন আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু।   

 

আরও পড়ুন: ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে লড়াই করে হারল বাংলাদেশ

 

সময় সংবাদকে চুন্নু বলেন, ‘বাংলাদেশের মেয়েদের খেলা দেখে আমি খুব আপ্লুত, হেড টু হেড খেলেছে তারা। চ্যাম্পিয়ন চীনের মতো দলকে হিমশিম খাইয়ে দিয়েছে এবং (বাংলাদেশের) মেয়েদের খেলা দেখে আমি ভীষণ খুশি। এতটা সুন্দর ফুটবল খেলবে বাংলাদেশের মেয়েরা, সেটা কল্পনা করা যায় না। আমি যেটা বলবো যে, এই মেয়েদের ভবিষ্যৎ খুব সুন্দর।’ 

 

১৯৮০ সালে এশিয়ান কাপে চীনের বিপক্ষে ৬ গোল হজম করেছিল বাংলাদেশ। তবে আজ মেয়েরা হেরেছে মাত্র ২-০ গোলের ব্যবধানে। তাদের মনোবল যে কতটা প্রখর ছিল, সে নিয়েও মেয়েদের প্রশংসা করলেন চুন্নু। ‘আসলে ওরা যে ফুটবলটা খেলেছে সেটা হচ্ছে যে, টিম স্পিরিট যেটাকে বলে... গোছানো ফুটবল, টিম স্পিরিট, মনোবল— সবকিছু তাদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তাদের মনোবল ছিল অত্যন্ত প্রখর, শক্তিশালী এবং তারা জেতার জন্য মাঠে খেলেছে। ঐ ড্র করবো কিংবা হারবো তা না কিন্তু।’ 

 

No description available.নারী এশিয়ান কাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে লড়াই করে ২-০ গোলে হেরেছে বাংলাদেশ। ছবি: বাফুফে

 

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন থেকে ঠিকমতো বেতন-ভাতা কিংবা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও পান না মেয়েরা। এশিয়ান কাপ খেলার আগে ভালো প্রস্তুতির কথা শোনা গেলেও বাফুফে তা করতে পারেনি। তবে ফেডারেশন যদি তাদের ঠিকঠাক যত্ন নেন, তাহলে এই মেয়েরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে আশা চুন্নুর। ‘অবশ্যই, এদেরকে যদি ঠিকভাবে নার্সিং করা হয়, ঠিকমতো পরিচালনা করা হয়, এদের ঠিকমতো সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়— আমি মনে করি এই মেয়েরা অনেক দূর যাবে।’ 

 

উইমেন্স এশিয়ান কাপে ১২টি দল খেলছে তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে। গ্রুপের সেরা দুটি দল এবং তৃতীয় হওয়া সেরা দুই দল খেলবে নকআউট পর্বে। সেরা আটে থাকতে পারলেই সুযোগ থাকবে বিশ্বকাপে খেলার। চীনের বিপক্ষে আজ বাংলাদেশ যদি অন্তত ড্র করতে পারতো, তাহলে সেরা আটে থাকার একটা ভালো সুযোগ থাকতো তাদের সামনে। তবে সুযোগ এখনও শেষ হয়ে যায় নি।   

 

আরও পড়ুন: ঋতু-মনিকাদের দাপটে মুগ্ধ বাটলার, একাদশে মিলিকে দেখে অবাক চীনের কোচ

 

চুন্নু বলেন, ‘এখনও সুযোগ আছে (বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার), এখনও দুইটা ম্যাচ আছে, দুইটা ম্যাচে যদি ঘুরে দাঁড়ায় অবশ্যই সুযোগ আছে এখনও। তারাও (উত্তর কোরিয়া-উজবেকিস্তান) শক্তিশালী দল, কিন্তু এদের বিপক্ষেও চোখে চোখ রেখে খেলবে আমি মনে করি। চীনের সাথে যে ফুটবলটা খেলেছে...ন্যাচরালি অবশ্যই আছে (কোরিয়া-উজবেকিস্তানের সাথে জেতার সুযোগ), তারা সেই ফুটবলটাই খেলবে আজ চীনের সাথে যেটা খেলেছে।’ 

 

No description available.চীনের ডেরায়ও কয়েকবার হানা দিয়েছিল বাংলাদেশ। ছবি: বাফুফে

 

বাংলাদেশের মেয়েদের কাছে দর্শকদের প্রত্যাশাটা অনেক। মেয়েরাও যে সমর্থকদের একেবারে হতাশ করেন তা কিন্তু নয়। দুইবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, এশিয়ান কাপ কোয়ালিফায়ারে দাপট দেখিয়েছে, আজ চীনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে লড়াই করেছে। আশরাফ উদ্দিন চুন্নুর আশা, এই মেয়েরা ভবিষ্যতে আরও ভালো খেলবে। সবশেষে বাংলাদেশের মেয়েদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন কিংবদন্তি এই ফুটবলার। 

 

‘আমি খুব খুশি যে, ৪০ বছর আগে ফাইনাল রাউন্ডে (এশিয়ান কাপের) খেলেছিলাম... পুরুষরা, সেই ৪০ বছর পরে এসে মেয়েরা যে অর্জন করেছে তাতে আমি অভিভূত। দর্শকদের বলবো তাদেরকে ভালোবাসা দিয়ে যাক, সাপোর্ট করুক। দর্শকরা যেভাবে আশা করে, মেয়েরাও কিন্তু সেভাবে খেলছে, এটা যেন অব্যাহত থাকে। মেয়েদের প্রতি রইল আমার শুভেচ্ছা এবং তাদের প্রতি আমার অভিনন্দন। মেয়েরা আজকে ভালো খেলেছে, ভবিষ্যতেও ভালো খেলবে।’

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন