জানা যায়, প্রায় ২২ লাখ ভোটারের এ জেলার অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ কৃষি। তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, করতোয়া ও ঘাঘট নদীর চরের উর্বর কৃষি জমিতে বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক উৎপাদনের কারণে অনেকে গাইবান্ধাকে ভুট্টা-মরিচের জেলা বলেও চেনেন।
এ জেলা কৃষি ও রসমঞ্জুরীর জন্য যেমন পরিচিত, তেমনি পরিচিত উন্নয়ন বঞ্চনার কারণে। পুরো জেলায় নেই কোনো কৃষি ভিত্তিক বা ভারী শিল্প কারখানা। এক সময় হাজারো শ্রমিকের জীবিকা প্রদানকারী রংপুর চিনিকল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। বিভিন্ন আন্দোলন, সভা, মানববন্ধন কিছুই খুলে দিতে পারেনি বহু বছরের এ শিল্প প্রতিষ্ঠানটি। শুধু মিলেছে আশ্বাস।
কৃষি উৎপাদন যতই হোক, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা গাইবান্ধার সবচেয়ে বড় সংকট। গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা, ভাঙা ব্রিজ আর নদীপথ নির্ভর চলাচল। সব মিলিয়ে প্রতিদিন যাতায়াতে ভোগান্তির শেষ নেই। পণ্য পরিবহনে বাধা থাকায় কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন জেলাবাসী।
আরও পড়ুন: ময়লা ফেলার জায়গা নেই নীলফামারী পৌরবাসীর
জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বালাসিঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত একটি সেতু বা টানেলের দাবি বহু দশকের পুরোনো। এই সংযোগ পথ তৈরি হলে উন্নত হবে পণ্য পরিবহন, বাড়বে কর্মসংস্থান, একইসঙ্গে বদলে যাবে দুই তীরের মানুষের জীবনযাত্রা। তবুও তা রয়ে গেছে শুধু কাগজের প্রতিশ্রুতিতে। এখানে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা খরচ করে একটি লঞ্চঘাট নির্মাণ হলেও নদীর নাব্যতা সংকটে তা নষ্ট হচ্ছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও পিছিয়ে উত্তরাঞ্চলের এ জেলা। একটি মেডিকেল কলেজ, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি উঠে বারবার। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়নে নেননি কোনো উদ্যোগ। বিশেষায়িত হাসপাতাল না থাকায় দূরদূরান্তে যেতে হয় চিকিৎসার জন্য। চরাঞ্চলে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ।
গাইবান্ধায় গ্রামীণ কাঁচা রাস্তা, ভাঙা ব্রিজ আর নদীপথ নির্ভর চলাচল। সব মিলিয়ে প্রতিদিন যাতায়াতে ভোগান্তির শেষ নেই। পণ্য পরিবহনে বাধা থাকায় কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হন। ছবি: সময় সংবাদ
যুব সমাজের কর্মসংস্থান বাড়াতে গোবিন্দগঞ্জের কাটামোড় এলাকায় একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের ঘোষণা এসেছিল কয়েক বছর আগে। সাইনবোর্ড ঝুলেছে, কিন্তু জমির মালিকানা নিয়ে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিরোধে ঝুলে আছে এর বাস্তবায়ন।
আরও পড়ুন: রংপুরে ৩৮ কোটি টাকায় নির্মিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সের বেহাল দশা
তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও করতোয়া বেষ্টিত গাইবান্ধা প্রতিবছর তীব্র নদী ভাঙনের মুখে পড়ে। এক ঝড়ে ভেসে যায় ভিটে-বাড়ি, বদলে যায় স্থায়ী ঠিকানা। শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলে মাইলের পর মাইল হেঁটে পাড়ি দিতে হয় মৌলিক প্রয়োজনেও। জেলার অর্থনীতির চাকা সচল রাখলেও এই মানুষগুলোর ভাগ্যের খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্পায়ন, পর্যটনসহ সব ক্ষেত্রে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এ জনপদের উন্নয়নে উদ্দ্যোগ নেয়নি কেউ। দেশের সব জেলায় চলমান যে উন্নয়ন হয়েছে সেখানেও বারবার বৈষম্যর শিকার হয়েছেন এ জেলার মানুষ। নির্বাচন আসলে উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে জনপ্রতিনিধিরা ভোট নিয়ে আর খোঁজ রাখেননি তাদের।
আরও পড়ুন: নির্মাণের ৩ বছরেও চালু হয়নি মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্ট ট্রেনিং স্কুল
স্থানীয় উন্নয়ন কর্মী মো. আশরাফুল আলম জানান, দীর্ঘ বঞ্চনার শিকার এ জেলার শিল্পায়ন, কৃষি, যোগাযোগ, পর্যটন সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ না হলে এ জেলার স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়।
গাইবান্ধার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেও রয়েছে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা। ব্রহ্মপুত্রের তীর, তিস্তাপাড়, চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, গোবিন্দগঞ্জের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান সব মিলিয়ে এখানে গড়ে উঠতে পারে নদী কেন্দ্রিক পর্যটন শিল্প।
তিনি আরও জানান, শিল্প, শিক্ষা, যোগাযোগ, চিকিৎসা সব ক্ষেত্রেই গাইবান্ধার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের অপেক্ষায় রয়েছেন। কৃষির অপার সম্ভাবনা, চরাঞ্চলের মানুষের অবদান, আর পর্যটনের বিশাল ক্ষেত্র যদি সুপরিকল্পিত উদ্যোগে কাজে লাগানো যায়, তবে বদলে যেতে পারে এই জেলার সামগ্রিক চিত্র।

৩ সপ্তাহ আগে
৫








Bengali (BD) ·
English (US) ·