চলুন জেনে নেই, পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা কেন শরীয়াহ পরিপন্থী কর্মকাণ্ড? সহজভাবে বুঝতে হলে আগে ইতিহাস থেকেই শুরু করি।
ইতিহাস
১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে (৯৯২ হিজরি) মুঘল সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে, জ্যোতির্বিজ্ঞানী আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে দায়িত্ব দিয়ে ১৫৫৬ সালে তাঁর সিংহাসন আরোহণের সময় থেকে এই 'বাংলা পঞ্জিকা' বা 'ফসলি সন' প্রবর্তন করেন। যা হিজরি চন্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছিল। এবং পরে এটি 'বঙ্গাব্দ' বা 'বাংলা সন' হিসেবে পরিচিতি পায়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হিজরি সনের সাথে কৃষিজ ফলনের অমিল দূর করে খাজনা আদায় সহজ করা।
ক্রমবিকাশ
হালখাতা প্রথা: অতীতে বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা। এটি পুরোপুরিই একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। সে সময় বাংলার কৃষকদেরকে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। তার পরের দিন, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা প্রজাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন এবং ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ বা নতুন হিসাবের খাতা খুলতেন। ( উল্লেখ্য, হালখাতা বলতে বুঝায়- পুরো বছরের হিসাবনিকাশ চুকিয়ে নতুন বছরের প্রারম্ভে ব্যবসায়িক যোগসূত্র স্থাপন করা এবং নতুনভাবে হিসাবের জন্য খাতা খোলা।) এ উপলক্ষে তখন মেলা এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।
ছায়ানটের বর্ষবরণ: ১৯৬৭ সালে [মতান্তরে ১৯৬৪] রমনার বটমূলে ছায়ানট বাংলা নতুন বছরকে বরণের মাধ্যমে এই উৎসবের আধুনিক ধারা শুরু হয়। এর আগে এটি তেমন হৈ-হুল্লোড়ভাবে আয়োজিত হতো না।
মঙ্গল শোভাযাত্রা: ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে এটিকে নতুন রুপ দেওয়া হয়।
কেন নববর্ষ উদযাপন হারাম?
১. আকিদাগত বিচ্যুতি ও মঙ্গল শোভাযাত্রা: পহেলা বৈশাখের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বর্তমানে 'মঙ্গল শোভাযাত্রা'কে প্রচার করা হয়। এখানে বিভিন্ন পশুপাখির প্রতিকৃতি ও মূর্তির প্রদর্শন করা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে, এগুলো অমঙ্গল দূর করবে। অথচ ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, একমাত্র আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কোনো বস্তু বা মূর্তি কল্যাণ বা অকল্যাণ (মঙ্গল বা অমঙ্গল) বয়ে আনার ক্ষমতা রাখে না। এ ধরনের বিশ্বাস সরাসরি শিরকের অন্তর্ভুক্ত।
আরও পড়ুন: পড়াশোনার নামে নির্যাতন: কী বলে ইসলাম?
২. অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা: পহেলা বৈশাখে খুব ভোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্স ইনস্টিটিউট থেকে শুরু করে রমনা পার্কে গিয়ে সূর্যের প্রথম প্রহর উপভোগ করে। এবং বিশ্বাস করা হয় “মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা” অর্থাৎ- সূর্যের প্রখর আলোয় বা আগুনে স্নান প্রকৃতির জীর্ণতা, পুরোনো বছরের সব ব্যর্থতা ও ক্লান্তি দূর করে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর প্রতীক। নাউজুবিল্লাহ। যা হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বিশ্বাস।
আমি তাকে ও তার কওমকে দেখতে পেলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য সৌন্দর্যমন্ডিত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত করেছে, ফলে তারা হিদায়াত পায় না। সুরা নামল: ২৪
২. বৈজ্ঞানিক যুক্তি বনাম অন্ধবিশ্বাস: যারা আধুনিকতা ও বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে ইসলামকে পুরনো প্রথা বলে মনে করেন, তারাই আবার নির্জীব প্রতিকৃতির পেছনে মঙ্গল কামনায় মিছিল করছেন-এটি একটি চরম বৈপরীত্য। ইসলাম আমাদের অযৌক্তিক কুসংস্কার ত্যাগ করে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করতে শেখায়।
৩. বিজাতীয় সংস্কৃতি ও জমিদারী প্রভাব: পহেলা বৈশাখের বর্তমান অনেক প্রথা মূলত পশ্চিমবঙ্গের জমিদার শ্রেণির প্রবর্তিত রীতিনীতি দ্বারা প্রভাবিত, যার সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। বাঙালি সংস্কৃতির নামে ভিনদেশী ও বিজাতীয় ধর্মীয় রীতিনীতির সংমিশ্রণ আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে বিনষ্ট করছে।
৪. নৈতিক অবক্ষয় ও পর্দা লঙ্ঘন: এই দিনকে কেন্দ্র করে মেলা ও র্যালিতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (ফ্রি মিক্সিং) চরম আকার ধারণ করে। ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটি সমাজ ও যুবসমাজের চারিত্রিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ।
৫. অপচয় ও অনর্থক কাজ: একদিকে মানুষের আর্থিক সংকট, অন্যদিকে নববর্ষের নামে অপচয় সমাজের দৈন্যদশা ও দ্বিচারিতাকে চরমভাবে ফুটিয়ে তুলে, যা কুরআনের ইসরাফ বা অপচয়ের সংজ্ঞায় পড়ে।
অতএব, একজন প্রকৃত এবং সচেতন মুসলিম হিসেবে পহেলা বৈশাখের এসব শিরকি আকিদা, বিজাতীয় সংস্কৃতি ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে আমাদের সকলকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে আমাদের তরুণ প্রজন্য যেন আবেগের বশবর্তী হয়ে বর্ষবরণের এই অপসংস্কৃতির থাবায় পড়ে নিজেদের ঈমান ও আমল নষ্ট না করি, সে বিষয়ে অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে। এবং সর্বস্তরের মুসলমানদের এই অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন- আমিন।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, খতিব, মাহিনী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, কুমিল্লা।

২ দিন আগে
২








Bengali (BD) ·
English (US) ·