ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলো ধ্বংসের হুমকি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ

৫ দিন আগে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে লাখো কোটি টাকার অবকাঠামো ও জনজীবন বিপন্ন হবে। তেহরান সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তবে এ নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেতু ধ্বংসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয় ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনী বলেছে, প্রণালীটি তাদের নৌবাহিনীর ‘দৃঢ় ও কর্তৃত্বপূর্ণ’ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি ইরানের ‘শত্রুদের জন্য’ বন্ধই থাকবে।

 

এর ফলে একদিকে যেমন উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রফতানি হুমকির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ট্রাম্প ইরানকে এ ব্যাপারে একের পর এক ডেডলাইন দেন।

 

সবশেষ আজ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাত ৮টা (ইস্টার্ন টাইম) (বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৩টা) পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এই সময়সীমার মধ্যে তেহরান চুক্তি না করলে কঠোর সামরিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এমন ক্ষমতা আছে যে তারা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দিতে পারে।

 

তিনি বলেন, ‘মানে পুরোপুরি ধ্বংস… রাত ১২টার মধ্যে শেষ করে দেয়া যাবে… আর আমরা চাইলে চার ঘণ্টার মধ্যেই এটা করতে পারি।’ তিনি আরও জানান, এই হামলার লক্ষ্য হতে পারে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। তিনি এটিকে ‘সেতু দিবস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বলেন, ‘আগামীকাল হবে সেতু দিবস’। 

 

আরও পড়ুন: ট্রাম্পের হরমুজ ডেডলাইন আসন্ন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সুরক্ষায় ‘মানবশৃ্ঙ্খল’ গড়ার ডাক ইরানের

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এরই মধ্যে বহু বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, স্কুল, গবেষণা কেন্দ্র ও ঔষধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।

 

গত সপ্তাহে কারাজ শহরের নতুন বি১ সেতু বিমান হামলায় ধ্বংস হয়। তখন নওরোজ উদযাপনের সময় সেতুর নিচে পিকনিকে থাকা আটজন নাগরিক নিহত হন। সেতুটি তখনও অসম্পূর্ণ ছিল। বিশ্লেষকরা এটিকে ইরানের উন্নয়ন ধ্বংস কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন।

 

ইরানের সেতু ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী দেশটিতে প্রায় তিন লাখ সেতু রয়েছে। এর মধ্যে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি সেতু রয়েছে। পারস্য উপসাগর সেতু কেশম দ্বীপে অবস্থিত। ৩.৪ কিমি দীর্ঘ এটি। ভারতে ও রাশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিবহন করিডোরের অংশ। উর্মিয়া লেক সেতু তাবরিজ ও উর্মিয়াকে সংযুক্ত করে। এটি ১.৭ কিমি দীর্ঘ এবং ধ্বংস হলে পরিবহন ও পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে।

 

এছাড়া সাদ্র মাল্টিলেভেল এক্সপ্রেসওয়ে সেতু তেহরান শহরে। দৈনিক লাখ লাখ মানুষ ব্যবহার করে। ধ্বংস হলে নগর চলাচল বিপর্যস্ত হবে। কারুন-৪ আর্ক সেতু শার-ই-কোর্ড ও ইজেহকে সংযুক্ত করেছে। বাঁধের উপর অবস্থিত হওয়ায় বোমাবর্ষণ হলে প্লাবন হতে পারে। গাদির কেবল-স্টেড সেতু আহভাজে অবস্থিত। এটি কারুন নদীর উপর অবস্থিত ইরানের তেল ও স্টিল শিল্পকেন্দ্রকে সংযুক্ত করে।

 

আরও পড়ুন: অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ১০ দফা পরিকল্পনা দিলো ইরান

 

এই সেতুগুলো ধ্বংস করলে শুধু নগর ও প্রাদেশিক যোগাযোগ ব্যাহত হবে না অর্থনৈতিক ক্ষতি, জনজীবনের ঝুঁকি এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ও ঘটতে পারে। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যবেক্ষকরা এই হুমকিকে গুরুতর বলে মনে করছেন। 

 

ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে বোমা হামলার হুমকি যুদ্ধাপরাধ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতা আন্তনিও কস্তা। সোমবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বেসামরিক অবকাঠামো, বিশেষ করে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানো অবৈধ এবং গ্রহণযোগ্য নয়।’ 

 

তিনি আরও বলেন, ‘এই নিয়ম যেমন রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি সব জায়গাতেই প্রযোজ্য।’ সাবেক পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী কস্তা বলেন, ‘ইরানের সাধারণ জনগণই দেশটির সরকারের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। আর যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

 

তিনি যোগ করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর এখন স্পষ্ট—এই সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধান করতে হলে কেবল কূটনৈতিক পথই কার্যকর।’ 

 

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক গত সপ্তাহে ট্রাম্পের হুমকির জবাবে বলেন: ‘যদি সুস্পষ্টভাবে বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী অনুমোদিত নয়।’ 

 

এদিকে ট্রাম্পের এমন হুমকি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রেও। ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের মানসিক স্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও রিপাবলিকানরা তার অবস্থান সমর্থন করছে। তেহরানও হুমকির মধ্যে দৃঢ় প্রতিরোধ বজায় রেখেছে।

 

কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টকে ‘অস্থির ও বিপজ্জনক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইয়াসমিন আনসারী ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। হাকীম জেফ্রিস ও বার্নি স্যান্ডার্সসহ অন্যান্য নেতা ট্রাম্পের হুমকিকে অনৈতিক ও অমানবিক হিসেবে অভিহিত করেছেন।

 

আরও পড়ুন: ইসরাইলে একযোগে ইরান, হিজবুল্লাহ ও হুতির হামলা!

 

সিনেটর এলিসা স্লটকিন বলেছেন, বেসামরিক নাগরিক লক্ষ্যবস্তু হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় এরই মধ্যে স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা কেন্দ্র ও আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে সামরিক কর্মকর্তাদের যুদ্ধাপরাধে অংশ নিতে নির্দেশ দেয়া যায় না। তবে রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম ও কংগ্রেসম্যান ডন বেকন ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করেছেন। 

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন