ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ ব্যর্থ কিংবা ‘আত্মঘাতী’ হতে বাধ্য

১১ ঘন্টা আগে
ইসলামাবাদে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ভেস্তে যাওয়াটা কূটনৈতিক অব্যবস্থাপনার চেয়ে বরং দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে ক্রমাগত সংজ্ঞায়িত করে চলা কাঠামোগত অনমনীয়তারই একটি দৃষ্টান্ত। জেডি ভ্যান্সসহ উভয় পক্ষের ঊর্ধ্বতন নেতাদের অংশগ্রহণে উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততার পরও ওই আলোচনা ভেস্তে যায় অধিক দাবি, গভীর অবিশ্বাস এবং পরস্পরবিরোধী কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।

ইসলামাবাদে যা ঘটেছে, তা কোনো প্রক্রিয়াগত ব্যর্থতা ছিল না, বরং উভয় পক্ষেরই অনড় অবস্থানের একটি অনুমেয় পরিণতি ছিল, যা থেকে তারা নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে ইচ্ছুক বা সম্ভবত সক্ষমও নয়।

 

পারমাণবিক ইস্যু

 

চলমান এই অচলাবস্থার মূলে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ। ওয়াশিংটনের জন্য যেকোনো চুক্তির মূল মাপকাঠি হলো চূড়ান্ত স্বচ্ছতা: ইরানকে শুধু পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টাই নয়, বরং দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও ত্যাগ করতে হবে।

 

অর্থাৎ, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামিয়ে আনা এবং বিদ্যমান উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুত ভেঙে ফেলা বা নিষ্ক্রিয় করা।

 

কৌশলগতভাবে এটি অস্থায়ী সংযমের চেয়ে স্থায়ী অস্বীকৃতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের প্রতিফলন। কিন্তু তেহরানের দৃষ্টিতে, এসব দাবি তাদের সার্বভৌমত্বের অস্বীকৃতি। ইরানের নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতা এবং জাতীয় মর্যাদার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে ছাড় দেয়া মানে শুধু নীতিতে আপোস করা নয়; এর অর্থ নীতিতে আত্মসমর্পণ করা।

 

এই মৌলিক মতপার্থক্য পারমাণবিক ইস্যুটিকে একটি প্রযুক্তিগত আলোচনার বিষয় থেকে অস্তিত্বগত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ দিয়েছে। 

 

আরও পড়ুন: বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তেল-গ্যাস বেশি কেন?

 

দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করছে না যুক্তরাষ্ট্র

 

প্রস্তাবিত চুক্তির পরিধি ও উদ্দেশ্য নিয়ে মতবিরোধ এই জটিলতা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সীমিত উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছিল, আর তা হলো: পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করা।

 

তবে, ইরান আরও বিস্তৃত এজেন্ডা নিয়ে আলোচনায় বসেছিল। তারা শুধু উত্তেজনা প্রশমনই চায়নি, বরং পশ্চিমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের পুনর্গঠনও চেয়েছিল, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত আর্থিক সম্পদ ছাড়, সাম্প্রতিক সামরিক হামলার ক্ষতিপূরণ এবং একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি, যেখানে হিজবুল্লাহর মতো মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইসরাইলি অভিযান বন্ধের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

 

আলোচনা কাঠামোর এই অমিলের কারণে প্রাথমিক ঐকমত্যও অর্জন করা সম্ভব হয়নি। যেখানে ওয়াশিংটন সংকট নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেখেছিল, সেখানে তেহরান দেখেছিল সম্পর্কের শর্তগুলো পুরোপুরি পুনর্নির্ধারণের একটি সুযোগ।

 

এছাড়া হরমুজ প্রণালী একটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এই গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ নৌপথটির মধ্য দিয়ে জ্বালানি সরবরাহের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করা একটি কৌশলগত অপরিহার্য বিষয়। ফলস্বরূপ, একটি স্বতন্ত্র ‘আস্থা-বর্ধক পদক্ষেপ’ হিসেবে হরমুজ অবিলম্বে পুনরায় খোলার জন্য চাপ দেয় ওয়াশিংটন।

 

কিন্তু বৃহত্তর চুক্তি ছাড়া সম্মতি দিতে ইরানের অস্বীকৃতি তার কৌশলগত হিসাবকেই তুলে ধরে। এর মাধ্যমে নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তেহরান তার আপেক্ষিক সামরিক ও অর্থনৈতিক অসুবিধাগুলো পুষিয়ে নেয়ারও চেষ্টা করেছে। এর অন্তর্নিহিত বার্তাটিও স্পষ্ট: আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যেকোনো আলোচনায় ইরানের স্বার্থকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

 

এই অর্থে, হরমুজ প্রণালী কেবল একটি সরবরাহগত উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে একটি দর কষাকষির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। 

 

আরও পড়ুন: এবার লোহিতসহ ৩ সাগর অবরোধের হুঁশিয়ারি ইরানের

 

গভীরতর সংকট

 

আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর যে পারস্পরিক দোষারোপের পালা শুরু হয়েছিল, তা এক গভীরতর সংকটেরই ইঙ্গিত।  

 

মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের প্রস্তাবগুলোকে অপর্যাপ্ত ও আন্তরিকতাহীন বলে আখ্যা দিয়েছেন, অন্যদিকে ইরানি প্রতিনিধিরা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে আলোচনার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছাড়াই অতিরিক্ত ও বেআইনি দাবি উত্থাপনের অভিযোগ করেছেন।

 

এই চিত্র নতুন নয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের শুরুতে ওমানে হওয়া আলোচনাগুলোও একই কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। প্রতিবারই সন্দেহ কাজ করেছে যে অপর পক্ষ সৎভাবে আলোচনা করছে না। এই অবিশ্বাসই দুর্বল করে দিয়েছে কূটনীতিকে।

 

বৃহত্তর কৌশলগত প্রেক্ষাপট বর্তমান মুহূর্তকে বিশেষভাবে সংকটপূর্ণ করে তুলেছে। ইরান উল্লেখযোগ্য চাপের মধ্যে এই পর্যায়ে প্রবেশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলাসহ সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোর সম্মিলিত প্রভাব দেশটির সামরিক অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশকে দুর্বল করে দিয়েছে। অভ্যন্তরীণভাবে, সরকার অর্থনৈতিক সংকট, জন অসন্তোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার অস্থিতিশীল প্রভাবের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করে চলেছে।

 

কিছু দুর্বলতা থাকলেও, ইরানের হাতে দর কষাকষির গুরুত্বপূর্ণ উৎসও আছে। দেশটির পারমাণবিক দক্ষতা, আঞ্চলিক প্রক্সিদের নেটওয়ার্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ ব্যাহত করার ক্ষমতা নিশ্চিত করে যে, তেহরানকে সহজে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা যাবে না।

 

এই অসামঞ্জস্যতা, কিছু ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং অন্য ক্ষেত্রে শক্তি– চাপের (ইরানের ওপর) যেকোনো সরল প্রয়োগকে কঠিন করে তুলেছে।

 

আরও পড়ুন: সামরিক পদক্ষেপ নিলে যুক্তরাষ্ট্রের সমস্যা আরও বাড়বে: ইরানের প্রেসিডেন্ট 

 

যুদ্ধ এখন কোন পর্যায়ে?

 

চলমান অচলাবস্থার তাৎক্ষণিক পরিণতি গুরুতর ও সুদূরপ্রসারী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই সীমিত পরিসর ও সময়কালের এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন ক্রমশ অস্থিতিশীল বলেই মনে হচ্ছে। নবায়িত কূটনৈতিক কাঠামোর অভাবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার ঝুঁকিও তীব্র হয়েছে।

 

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছে, ইরান তাদের দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে তারা সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করতে প্রস্তুত এবং এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

 

এর জবাবে, ইরানেরও প্রতিশোধ নেয়ার একাধিক উপায় রয়েছে, যার মধ্যে প্রক্সি নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা থেকে শুরু করে সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে এমন সরাসরি পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত।

 

পুনরায় সংঘাতের (ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের) আশঙ্কা কাল্পনিক নয়, বরং এটি অদূর ভবিষ্যতের একটি ‘প্রবল শঙ্কা’। এর অর্থনৈতিক প্রভাবও সমানভাবে উদ্বেগজনক। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ এবং এর কার্যক্রমে যেকোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে তার তাৎক্ষণিক বৈশ্বিক প্রভাব পড়বে।

 

এতে তেলের দাম বাড়তে পারে, বৃদ্ধি পাবে পরিবহন খরচ এবং প্রধান অর্থনীতিগুলোতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্রতর হতে পারে। ইতোমধ্যেই ভঙ্গুর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশে, এই ধরনের ধাক্কাগুলো ধারাবাহিক প্রভাব ফেলতে পারে, যা অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলবে এবং পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দেবে।

 

অভ্যন্তরীণভাবে, এই অচলাবস্থা ইরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত গতিপথকেও প্রভাবিত করতে পারে। নিষেধাজ্ঞা শিথিল না হলে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়বে, যা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে শাসকগোষ্ঠীর সক্ষমতার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। 

 

আরও পড়ুন: ইরান যুদ্ধের কারণে দারিদ্র্যের মুখে ৩ কোটির বেশি মানুষ: জাতিসংঘ

 

একই সময়ে, কূটনীতির ব্যর্থতা ইরানের অভ্যন্তরের কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে একটি শক্তিশালী বয়ান জোগান দেয় যে, পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থেকে খুব কমই বাস্তব সুফল পাওয়া যায়। এর ফলে আরও সংঘাতমূলক অবস্থানের দিকে পরিবর্তন ত্বরান্বিত হতে পারে, যার মধ্যে পারমাণবিক সক্ষমতার সম্ভাব্য অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে সহযোগিতা হ্রাস অন্তর্ভুক্ত।

 

আঞ্চলিকভাবে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরোক্ষ সংঘাত তীব্রতর হতে পারে, যা একাধিক পক্ষকে জড়িয়ে ফেলবে এবং অস্থিতিশীলতার ভৌগোলিক পরিধি প্রসারিত করবে। এই ধরনের পরিবেশে ভুল হিসাবের শঙ্কা বেড়ে যায়, বিশেষ করে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল এবং পারস্পরিক বিশ্বাস কম থাকে। এমনকি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ না থাকলেও, দীর্ঘস্থায়ী স্বল্প-তীব্রতার সংঘাত যথেষ্ট ঝুঁকি তৈরি করে।

 

দীর্ঘমেয়াদে, ইসলামাবাদে আলোচনার ব্যর্থতা একটি বৃহত্তর প্রবণতাকেই শক্তিশালী করে: কৌশলগত নমনীয়তার অভাবে কূটনীতির কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া। ইরানের জন্য, এই ঘটনাটি পশ্চিমা উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহকে আরও গভীর করবে এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও অসংগতির আখ্যানকে আরও শক্তিশালী করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, এটি বলপ্রয়োগ-নির্ভর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে, যা আপোসের সুযোগ খুব কম রাখে।

 

এর ফলে ঠিক সেই মুহূর্তে কূটনৈতিক পরিসর সংকুচিত হচ্ছে, যখন সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

 

পরিশেষে, এই আলোচনা ভেস্তে যাওয়া এক কঠিন বাস্তবতাকে তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কেবল নির্দিষ্ট নীতিগত বিষয় নিয়ে বিরোধ নয়; এটি গভীরতর ভূ-রাজনৈতিক ও আদর্শগত বিভাজনেরই বহিঃপ্রকাশ। যতক্ষণ না উভয় পক্ষ মূল ধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে এবং প্রকৃত পারস্পরিক পরিকাঠামো অন্বেষণ করতে সদিচ্ছা প্রকাশ করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই ধরনের আলোচনা ব্যর্থ হতেই থাকবে।

 

এই অর্থে, ইসলামাবাদ কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ধারারই ধারাবাহিকতা, যেখানে কূটনীতি সংঘাত সৃষ্টিকারী কাঠামোগত শক্তিগুলোর সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খায়।

 

লেখক: হর্ষ ভি পন্ত (নয়াদিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট)

সূত্র: এনডিটিভি

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন