শিরোনামে খেলার আহ্বান, তা–ও আবার বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান বাস্তবতায়! অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। গত দেড় বছরে ক্ষমতার চেয়ার দখলের একেকটি উপাখ্যান ক্রিকেটটাকে এখানে চরাঞ্চলের লড়াই বানিয়ে দিয়েছে। নোংরা রাজনীতি আর কথার কাদা–ছোড়াছুড়িতে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম যেন অতীতের পল্টন ময়দান! ময়দানে লড়াই হয়, খেলা কি হয়?
খেলার আহ্বান তাই মনে অন্য কিছুর সন্দেহ উদ্রেক করতেই পারে। এ খেলা আবার ‘খেলা হবে’র খেলা না তো! নাকি আরও কোনো খেলা আছে, যার সঙ্গে মাঠের সম্পর্ক অস্তিত্বহীন!
গত কিছুদিন ক্রিকেট নিয়ে ‘খেলাধুলা’ আসলে মাঠের বাইরেই বেশি হচ্ছে। কখনো রাতবিরাতে উপদেষ্টার বাসভবনে, কখনো গুলশানের কোনো হোটেল বা কফি শপে, কখনো মন্ত্রিপাড়ায়, কখনো লন্ডন বা অন্য কোথাও। আবার ফোনে ফোনেও খেলা হচ্ছে, ভিডিও কনফারেন্সে হচ্ছে। সব মিলিয়ে টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টুয়েন্টি ছাড়িয়ে ক্রিকেট যেন বাংলাদেশে আরও বেশি বহুরূপী সংস্করণে আবির্ভূত। ‘ক্রিকেট ইজ আ ফানি গেম’ কথাটায় ‘ফানি’ শব্দের অনুবাদ অনেকটাই ‘হাস্যকর’ হয়ে উঠেছে। ‘খেলাধুলা’ থেকে ‘খেলা’ বাদ দিয়ে শুধু যেন ‘ধুলা’ই উড়ছে ক্রিকেটের মাঠে।
‘আসুন, আমরা এবার খেলায় ফিরি’ জাতীয় আহ্বানকে তাই কোনো ছেলেভোলানো গল্পের শুরু মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু না, কথাটি বলা আসলেই মাঠের খেলায় ফেরার উদাত্ত আহ্বান জানাতে। এত কিছুর মধ্যেও নিশ্চয়ই জেনেছেন নতুন বিসিবি সভাপতি হিসেবে তামিম ইকবালের ‘গদিনশিন’ হওয়ার ঠিক ১০ দিনের মাথায় মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে আজ বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড তিন ওয়ানডের সিরিজ শুরু হচ্ছে। এরপর হবে তিনটি টি-টুয়েন্টি।
বিসিবিতে ‘চলিতেছে সার্কাস’ঢাকা-চট্টগ্রাম মিলিয়ে মাঠে আবার ব্যাট-বলের সত্যিকারের ক্রিকেট ফিরছে। মাঝে পাকিস্তান দল আসার পরও এ রকম সত্যি সত্যি ক্রিকেট খেলা হয়েছে, তার ঠিক আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজও এসে খেলে গেছে। কিন্তু অতি বেশি ধুলার ওড়াউড়িতে ক্রিকেটটা যেন একটু আড়ালেই থেকে গিয়েছিল তখন।
যেভাবেই হোক, তামিম ইকবাল এবং তাঁর সভাসদ দেশের ক্রিকেটের দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিপক্ষ শিবির এখন পর্যন্ত অপ্রত্যাশিত রকমের নিশ্চুপ। আমিনুল ইসলাম নিজেকে এখনো ‘সভাপতি’ দাবি করে সরকারের বোর্ড ‘ভাঙা’কে বেআইনি বলে বিবৃতি দেওয়ার পর আর কোনো দৃশ্যমান হট্টগোল নেই। সে কারণেই হয়তো নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগের দিন অনুশীলন থেকে ব্যাট–বলের ঠকাঠক শব্দ কান পর্যন্ত স্পষ্ট পৌঁছাল। সকালে মাঠে স্কুল ক্রিকেটের ‘প্রোমো’র শুটিংয়ে অংশ নেওয়া খুদে ক্রিকেটারদের দেখেও ভবিষ্যতের তারকা খেলোয়াড়ই মনে হচ্ছিল, ভবিষ্যতের রাজনীতিবিদ বা বোর্ড সভাপতি নয়।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে খেলার আলোচনাতেই থাকতে চেয়েছেন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজসিরিজ–পূর্ব সংবাদ সম্মেলনগুলোতেও একই ব্যাপার দেখা গেল। কেউই খেলা থেকে সরতে চান না। বোর্ডের সাম্প্রতিক অস্থিরতা নিয়ে যতই প্রশ্ন করা হোক না কেন; কোচ ফিল সিমন্স, অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ রঙিন পোশাকের ক্রিকেটের আবহে থেকেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সেসব ‘বল’ ছেড়ে দিলেন। ক্রিকেটের বাইরে আর কিছুকে আলোচনার উপজীব্য হতে না দিয়ে তাঁরাও যেন একই আহ্বান জানাতে চাইলেন—আসুন, আমরা এবার খেলায় ফিরি।
তামিম সভাপতি হওয়ায় যে সুবিধার কথা বললেন মিরাজতামিমকে বিসিবি সভাপতি করা হয়েছে তিন মাসের জন্য। তাঁর বোর্ডের মূল দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন দেওয়া। তার মানে এই নয় যে সামনে আসা দৈনন্দিন কাজগুলো থেকে তাঁরা দৃষ্টি সরিয়ে রাখবেন। তামিমসহ অ্যাডহক কমিটির অনেকেই যেহেতু পরবর্তী নির্বাচনেও অংশ নেবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, এই সময়ে বরং তাঁদের বাড়তি কিছু করার প্রয়াসও থাকবে।
ক্ষমতায় থেকে নির্বাচনে অংশ নিলে দুভাবে নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়ার কাজ সহজ করা যায়। এক. ক্ষমতার অপব্যবহার করে ও দুই. চেয়ারে থাকার সুযোগে ভালো ভালো কাজের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করে। প্রথমটির হাতছানি এড়িয়ে এই তিন মাসে নিজেকে দেশের ক্রিকেটের যোগ্য নেতা প্রমাণে তামিম তাঁর ভালো কাজ ও ইচ্ছার তালিকা যত লম্বা করতে পারবেন, তত তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও বাড়তে পারে।
৭ এপ্রিল বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব নেন তামিম ইকবালতামিমও নিশ্চয়ই এটা মনে রেখেই এগোবেন যে মানুষ কেন জানি সব সময় অতীতকেই বেশি ‘মিস’ করে। আর সেই হারানোর অনুভূতি বর্তমানটাকে করে তোলে অনেক বেশি অতৃপ্ত। মানুষ তখন তিক্ত বর্তমানকে পার করে দিতে চায় ভবিষ্যতে ভালো কিছু পাওয়ার আশায়। মাঠ কিংবা মাঠের বাইরে, বাংলাদেশের ক্রিকেটকে যেখানে রেখেই দেখুন না কেন, তিনটি কালের এই তিন রকম অনুভূতি বুকে বাজবেই। মাঠের সফল খেলোয়াড় তামিম সভাপতি হিসেবে তাঁর বর্তমানে যত বেশি প্রাপ্তির আলো ফেলতে পারবেন, ততই তিনি দেশের ক্রিকেটের জন্য ভবিষ্যতে ভালো কিছু পাওয়ার আশাস্থল হয়ে উঠবেন।
নিউজিল্যান্ড সিরিজ দিয়েই তামিম ইকবাল সভাপতি হওয়ার পর প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলবে বাংলাদেশ দল। সিরিজের সাফল্য–ব্যর্থতা কোনোটার কৃতিত্ব বা দায়ই মাত্রই দায়িত্ব নেওয়া তামিমকে দেওয়া যাবে না। খেলাটাকে শুধু খেলা হিসেবে দেখলে সেভাবে ভাবার সুযোগও নেই। আর খেলাটাকে খেলা ভাবতেই মাঠের খেলায় ফেরাটা জরুরি ছিল, যেটি আজ ফিরছে মিরপুরে।
তাহলে চলুন, আমরাও আবার খেলায় ফিরি।
বারবার বিসিবি সভাপতি বদল, সিমন্স বললেন, ‘এখন আর কিছুই অবাক করে না’







Bengali (BD) ·
English (US) ·