এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি বলেছে, বিপুল সংখ্যক আফগানকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সরকার।
পাকিস্তান সরকার চলতি সপ্তাহে চলমান ‘ইলিগ্যাল ফরেনার্স রিপ্যাট্রিয়েশন প্লান’ (আইএফআরপি)-এর অধীনে প্রুফ অব রেজিস্ট্রেশন (পিওআর) নামে পরিচয়পত্র নিয়ে বসবাসকারী আফগান শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দেয়। ডনের প্রতিবেদন মতে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে।
আফগানিস্তানে ১৯৮০-এর দশকে যুদ্ধ শুরু হলে পরবর্তী চার দশক ধরে বহু আফগান পাকিস্তানে পালিয়ে আসে। এসব আফগানকে শরণার্থী হিসেবে বসবাসের অনুমতি দেয় পাকিস্তান সরকার। এসব শরণার্থীরকে প্রুফ অব রেজিস্ট্রেশন (পিওআর) ও আফগান সিটিজেন কার্ড নামে দুই ধরনের পরিচয়পত্র দেয়া হয়।
আরও পড়ুন: ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে দ্বিতীয় দফার বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা
পাকিস্তানে প্রায় ১৪ লাখ আফগান নাগরিকের কাছে প্রুফ অব রেজিস্ট্রেশন বা পিওআর কার্ড রয়েছে। তাদের এই কার্ডের মেয়াদ চলতি বছরের জুনে শেষ হয়ে যায়। আর সরকারও সেগুলো নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানায়।
চলতি সপ্তাহে (৪ আগস্ট) পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে বলা হয়, নিবন্ধিত শরণার্থীদের ৪ আগস্ট থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ২৫ দিনের ‘অনুগ্রহকালীন সময়’ দেয়া হয়েছে যাতে তারা স্বেচ্ছায় আফগানিস্তানে ফিরে যেতে পারেন।
এই সময়সীমা শেষ হলেও স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন অবিলম্বে শুরু হবে। শরণার্থীদের অনেকেই আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়ার আগে সম্পত্তি বিক্রি বা ব্যবসা গুটিয়ে নেয়ার মতো ব্যক্তিগত বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করার জন্য পাক সরকার আরও অন্তত এক বছর মেয়াদ বাড়াবে বলে আশা করেছিলেন।
পিওআর কার্ড ছাড়াও আরও অন্তত ৮ লাখ শরণার্থীর কাছে আফগান সিটিজেন কার্ড নামে আরেক ধরনের নিবন্ধিত কার্ড রয়েছে। সরকার বলছে, তারাও অবৈধভাবে বসবাস করছে। তাদেরকেও ফেরত পাঠানো হবে।
আরও পড়ুন: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে চীন সফরে যাচ্ছেন মোদি
তবে প্রত্যাবাসনের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই নিবন্ধিত এসব আফগান শরণার্থীদের দেশে ফেরত পাঠানো শুরু করেছে পাকিস্তান বলে গত বুধবার (৬ আগস্ট) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআর।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী ১ সেপ্টম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই পাকিস্তানজুড়ে বৈধভাবে নিবন্ধিত আফগান শরণার্থীদের গ্রেফতার ও ফেরত পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। এভাবে আফগানদের ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করছে পাকিস্তান।
আফগানিস্তানের শরণার্থীদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো বন্ধ করে মানবিক, স্বেচ্ছায়, ধারাবাহিক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে পাকিস্তান সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় ইউএনএইচসিআর। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যম।
পাকিস্তানের মাটি থেকে আফগানদের বিতাড়নের অভিযান প্রথম শুরু হয় ২০২৩ সালে। এরপর চলতি বছরের এপ্রিল থেকে এই অভিযান ফের জোরদার হয়। পাকিস্তান সরকার লাখ লাখ আফগান শরণার্থীর বসবাসের অনুমতিপত্র বাতিল করে এবং জানিয়ে দেয়, সব আফগান শরণার্থীকে পাকিস্তান ছাড়তে হবে। যারা ছাড়বেন না, তাদের গ্রেফতার করা হবে।
আরও পড়ুন: পারমাণবিক বিভীষিকার ৮০ বছর, গভীর শ্রদ্ধায় নিহতদের স্মরণ করল জাপান
সম্প্রতি পাক সরকার দাবি করে, আইএফআরপি প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে ৮ লাখেরও বেশি আফগানকে দেশ ফেরত পাঠানো হয়েছে। অতীতের বিভিন্ন সময়ের সন্ত্রাসী হামলা ও অপরাধের জন্য আফগান নাগরিকদের দায়ী করে আসছে ইসলামাবাদ। তবে আফগানিস্তান এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, শরণার্থীদের এ ধরনের প্রত্যাবাসন একেবারে জবরদস্তিমূলক।
ইউএনএইচসিআর সতর্ক করে বলেছে, এত বিশাল সংখ্যক আফগান শরণার্থীকে তাড়াহুড়ো করে ফেরত পাঠানো হলে দেশটিতে তাদের জীবন ও স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। এতে কেবল আফগানিস্তানে নয়, বরং পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।