জো ও মো দুই নাবিক। নির্জন এক দ্বীপে তারা আটকা পড়েছে। দেখতে দেখতে কেটে গেল বেশ কয়েক বছর। একদিন জো সাগরতীরে একটা বোতল কুড়িয়ে পেল। সেটা ছিল একটা নতুন কোকা–কোলার বিশাল সাইজের বোতল। বোতলটা তোমার ধারণার চেয়ে বড়! দেখেই জোর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল! সে চিৎকার করে উঠল, ‘হায় হায় মো! আমরা তো সাইজে ছোট হয়ে গেছি!’
এই মজার কৌতুক থেকে আমরা একটা দারুণ জিনিস শিখতে পারি। জিনিসটা কী? কোনো কিছুর আকার বা সাইজ কতটুকু, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করলেই কেবল সেটা বোঝা যায়। ‘গালিভারস ট্রাভেলস’ গল্পের কথা মনে আছে? লিলিপুটরা গালিভারকে ভেবেছিল বিশাল এক দৈত্য। আবার ব্রোবডিংনাগ নামে দৈত্যদের দেশে গালিভার হয়ে গিয়েছিল ছোট্ট একটা পোকার মতো। কারণ সবাই গালিভারকে নিজেদের সঙ্গে তুলনা করেছিল।
আচ্ছা, একটি টেনিস বল কি অনেক বড় নাকি খুব ছোট? একটি পরমাণুর সঙ্গে তুলনা করলে এটি বিশাল বড়। কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা করলে? তখন এটি একদম ধূলিকণার মতো ছোট! অর্থাৎ, কোনো জিনিস বড় নাকি ছোট, তা নির্ভর করে সেটি কোন বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে তার ওপর।
উনিশ শতকের বিখ্যাত ফরাসি গণিতবিদ জুলস হেনরি পয়েনকার। ফরাসি উচ্চারণে জুলস অঁরি পঁয়কারে। রিলেটিভিটি বা আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অনেক বিষয় তিনি আগে থেকেই অনুমান করেছিলেন। তিনি একবার দারুণ একটা থট এক্সপেরিমেন্টের কথা বলেছিলেন। থট এক্সপেরিমেন্ট কী জানো? এটি এমন এক পরীক্ষা, যা শুধু মনের কল্পনায় করা যায়, বাস্তবে নয়।
ব্ল্যাকহোল কখন ব্ল্যাকহোলকে খেয়ে ফেলতে পারেহেনরি পয়েনকারের থট এক্সপেরিমেন্ট হলো: ধরো তুমি রাতে গভীর ঘুমে আছ। এই সুযোগে মহাবিশ্বের সবকিছুর আকার আগের চেয়ে ঠিক এক হাজার গুণ বড় হয়ে গেল! সবকিছু মানে কিন্তু সবকিছু। ইলেকট্রন, পরমাণু, আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য, তোমার বিছানা, তোমার বাড়ি, পৃথিবী, সূর্য, অন্যান্য নক্ষত্র, এমনকি তুমি নিজেও! সকালে ঘুম থেকে উঠে তুমি কি বুঝতে পারবে, কোনো কিছু বদলে গেছে কি না? এমন কোনো পরীক্ষা কি তুমি করতে পারবে, যা দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে তোমার আকার সত্যিই বড় হয়েছে?

পয়েনকারে নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, না! এমন কোনো পরীক্ষাই নেই। আসলে মহাবিশ্ব ঠিক আগের মতোই মনে হবে। কোনো কিছু বড় হয়েছে, এমন কথা বলার কোনো মানে নেই। বড় মানে হলো অন্য কিছুর তুলনায় বড় হওয়া। কিন্তু এখানে তো তুলনা করার মতো আর অন্য কিছু নেই! একইভাবে, পুরো মহাবিশ্ব যদি হঠাৎ ছোট হয়ে যায়, তা-ও আমরা বুঝতে পারব না।
তার মানে, আকার বা সাইজ হলো আপেক্ষিক। কোনো বস্তুর আকার একদম নিখুঁতভাবে মাপার কোনো পরম বা অ্যাবসোলিউট উপায় নেই। মাপতে হলে আমাদের স্কেল বা অন্য কোনো মাপকাঠির সঙ্গে তুলনা করতে হয়।
কিন্তু ১ মিটার আসলে কতটুকু? শুরুতে এর একটি অদ্ভুত মাপ ছিল। পৃথিবীর বিষুবরেখা থেকে যেকোনো এক মেরু পর্যন্ত যে দূরত্ব, তার ১ কোটি ভাগের ১ ভাগকে বলা হতো ১ মিটার। এরপর প্যারিসের এক ভূগর্ভস্থ কক্ষে রাখা একটি প্লাটিনামের দণ্ডের দৈর্ঘ্যকে ১ মিটার ধরা হতো। আর এখন ১ মিটারের সংজ্ঞা কী জানো? আলো শূন্যস্থানে ১ সেকেন্ডের ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ ভাগের ১ ভাগ সময়ে যতটুকু দূরত্ব যায়, সেটাই হলো ১ মিটার।
এখন প্রশ্ন হলো, ১ সেকেন্ড সময়টা তাহলে কতটুকু? মাইক্রোওয়েভের কারণে উত্তেজিত একটি সিজিয়াম পরমাণু যখন ৯,১৯২,৬৩১,৭৭০ বার কাঁপে, সেই সময়টাই হলো ১ সেকেন্ড!
আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃত্যুএখন ধরো, মহাবিশ্বের সবকিছুর আকার হঠাৎ সমান অনুপাতে বড় বা ছোট হয়ে গেল। এমনকি ১ সেকেন্ডে আলো যতটুকু পথ যায়, তা-ও বদলে গেল। তখনো কি কোনো পরীক্ষা দিয়ে এই পরিবর্তন ধরা যাবে? মোটেই না!
সময়ের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে আসতে কি অনেক বেশি সময় লাগে নাকি খুব কম সময়? ছোট শিশুদের কাছে এক ঈদ থেকে আরেক ঈদের মাঝখানের সময়টাকে অনন্তকাল মনে হয়! কিন্তু একজন ভূতত্ত্ববিদ, যিনি কোটি কোটি বছরের হিসাব নিয়ে কাজ করেন, তাঁর কাছে এক বছর তো চোখের পলকের মতো।
আসলে দূরত্বের মতো সময় মাপারও কোনো পরম উপায় নেই। অন্য কোনো সময়ের সঙ্গে তুলনা না করে আমরা সময় মাপতে পারি না। আমরা এক বছর কীভাবে মাপি? পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে যে সময় নেয়, তা দিয়ে। এক দিন মাপি কীভাবে? পৃথিবী নিজের অক্ষে একবার লাটিমের মতো ঘুরতে যে সময় নেয়, তা দিয়ে। আর এক ঘণ্টা? ঘড়ির বড় কাঁটা একবার ঘুরে আসতে যে সময় নেয়, তা-ই। সময় সব সময় অন্য কোনো সময়ের সঙ্গে তুলনা করেই মাপা হয়।

এইচ জি ওয়েলসের লেখা একটি বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন গল্প আছে। নাম ‘দ্য নিউ অ্যাকসিলারেটর’। এখানেও সেই দুই নাবিকের মতো একই ধরনের শিক্ষা আছে। তবে এবার বিষয়টি আকার নিয়ে নয়, সময় নিয়ে।
গল্পে এক বিজ্ঞানী এমন এক উপায় আবিষ্কার করেন, যা দিয়ে তিনি তাঁর শরীরের সব কাজ দ্রুত করে ফেলতে পারেন। তাঁর হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দন হয়, মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে ইত্যাদি। এরপর কী হলো বুঝতে পারছ? বিজ্ঞানীর কাছে মনে হলো, পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেছে! তিনি বাইরে হাঁটতে বের হলেন। খুব ধীরে ধীরে পা ফেললেন। কারণ, জোরে হাঁটলে বাতাসের ঘর্ষণে তাঁর প্যান্টে আগুন ধরে যেতে পারে! রাস্তাঘাট সব মানুষের মূর্তিতে ভরে গেছে। দুজন মানুষ হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত ধরে রেখেছে। পার্কে একটি ব্যান্ড গান গাইছে, কিন্তু বিজ্ঞানীর মনে হচ্ছে যেন খুব নিচু স্বরে ঘরঘর শব্দ হচ্ছে। একটি মৌমাছি শামুকের গতিতে উড়ে যাচ্ছে!
যাহোক, এবার চলো আরেকটি থট এক্সপেরিমেন্ট করি। ধরো, কোনো একমুহূর্তে মহাবিশ্বের সবকিছু খুব ধীরে চলতে শুরু করল, অথবা খুব দ্রুত। কিংবা হয়তো কয়েক লাখ বছরের জন্য সবকিছু একেবারে থেমে গেল! এরপর আবার চলা শুরু করল। তুমি কি এই পরিবর্তন বুঝতে পারবে? আসলে এমন কোনো পরীক্ষাই নেই, যা দিয়ে এটি প্রমাণ করা যায়। এমন পরিবর্তন হয়েছে বলাটাই অর্থহীন। দূরত্বের মতো সময়ও হলো আপেক্ষিক।
যে বছর আইনস্টাইনকে চিনতে শুরু করল বিশ্ববাসীআমাদের দৈনন্দিন জীবনের আরও অনেক ধারণাই আপেক্ষিক। যেমন ধরো, ওপর ও নিচ। পুরোনো দিনের মানুষ কিছুতেই বুঝতে পারত না, পৃথিবীর উল্টো দিকের মানুষেরা কেন মাথা নিচের দিকে দিয়ে ঝুলে থাকে না! কেন তাদের সব রক্ত মাথায় চলে আসে না? আজকাল শিশুরা যখন প্রথম শোনে পৃথিবীটা গোল, তখন তাদেরও একই প্রশ্ন জাগে।

পৃথিবীটা যদি কাচের তৈরি হতো, আর তুমি যদি টেলিস্কোপ দিয়ে সোজা অপর প্রান্তে তাকাতে, তবে তুমি সত্যিই দেখতে পেতে মানুষ উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে! তাদের পা কাচের সঙ্গে লেগে আছে। অর্থাৎ, তোমার সাপেক্ষে তাদের উল্টো মনে হতো। আবার তাদের সাপেক্ষে তোমাকেও উল্টো মনে হতো! পৃথিবীতে ওপর মানে হলো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে বাইরের দিক। আর নিচ মানে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিক। কিন্তু মহাকাশে পরম ওপর বা নিচ বলে কিছু নেই। কারণ, সেখানে তুলনা করার মতো কোনো গ্রহ নেই, যাকে আমরা প্রসঙ্গকাঠামো হিসেবে ধরতে পারি।
কল্পনা করো, সৌরজগতের ভেতর দিয়ে একটি মহাকাশযান উড়ে যাচ্ছে। দেখতে একদম বিশাল একটি ডোনাটের মতো। এটি অনবরত ঘুরছে, যাতে কেন্দ্রাতিগ বলের কারণে সেখানে কৃত্রিম অভিকর্ষ বা মহাকর্ষ তৈরি হয়। নভোচারীরা সেই ডোনাটের ভেতরের দিকে পৃথিবীর মতো হাঁটতে পারে। সেখানে নিচ মানে হলো নভোযানের কেন্দ্র থেকে বাইরের দিক। আর ওপর মানে কেন্দ্রের দিক। অর্থাৎ পৃথিবীর ঠিক উল্টো!
তার মানে, মহাবিশ্বে আসলে পরম ওপর বা নিচ বলে কিছু নেই। এগুলো সবই নির্ভর করে মহাকর্ষ বল কোন দিকে কাজ করছে, তার ওপর। তুমি যখন ঘুমাচ্ছ, তখন যদি পুরো মহাবিশ্ব উল্টে যায়, তা বলাও অর্থহীন। কারণ, তখন মহাবিশ্ব উল্টে গেছে কি না, তা মাপার জন্য বাইরের কোনো নির্দিষ্ট কাঠামোই থাকবে না।
আইনস্টাইন যেভাবে নোবেল পেলেনআরেক ধরনের আপেক্ষিক পরিবর্তন হলো আয়নার প্রতিবিম্ব। ইংরেজি R অক্ষরটাকে আয়নায় দেখলে কেমন দেখায় তা তো তুমি জানোই। কিন্তু হঠাৎ যদি পুরো মহাবিশ্ব আয়নার প্রতিবিম্বের মতো উল্টে যায়, তুমি কি ধরতে পারবে? এমন বিষয়ের ওপরে এইচ জি ওয়েলসের একটি গল্প আছে। নাম ‘দ্য প্ল্যাটনার স্টোরি’। সেখানে শুধু একজনের কাছে পুরো পৃথিবীটা উল্টে গিয়েছিল। তখন তার কাছে মনে হয়েছিল, পুরো জগৎটাই উল্টে গেছে! তাকে বই পড়ার জন্য আয়নার সামনে ধরতে হতো। ঠিক যেমন ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের’ অ্যালিস উল্টো লেখা পড়ার জন্য আয়নার সাহায্য নিয়েছিল। কিন্তু তুমি নিজে এবং তোমার চারপাশের সবকিছুরই দিক যদি পরিবর্তন হয়ে যায়, তবে তা বোঝার কোনো উপায় নেই। এমনটা বলাও একেবারেই অর্থহীন।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো, গতি কি পরম? কোনো বস্তু স্থির আছে নাকি নড়াচড়া করছে, তা নিশ্চিতভাবে বোঝার কি কোনো উপায় বা পরীক্ষা আছে? গতিও কি আরেকটি আপেক্ষিক ধারণা? অন্য বস্তুর সঙ্গে তুলনা ছাড়া কি গতি মাপা যায় না? নাকি গতির মধ্যে বিশেষ কোনো ব্যাপার আছে, যা তাকে অন্যান্য আপেক্ষিক বিষয় থেকে আলাদা করেছে?
পরের অধ্যায়ে যাওয়ার আগে একটু থেমে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখো। ঠিক এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিখ্যাত ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ বা ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’ তৈরি করেছিলেন। এই তত্ত্ব এতটাই যুগান্তকারী এবং সাধারণ বুদ্ধির বাইরের ব্যাপার যে আজও হাজার হাজার বিজ্ঞানীর এটি বুঝতে কষ্ট হয়!
তুমি যদি বয়সে ছোট হও, তবে বড়দের চেয়ে তোমার একটি বড় সুবিধা আছে। বড় বিজ্ঞানীদের মগজে পুরোনো চিন্তার শক্ত শিকড় তৈরি হয়ে গেছে। তোমার মগজে এখনো তেমন কিছু তৈরি হয়নি। তবে তোমার বয়স যা-ই হোক না কেন, তুমি যদি তোমার মগজের পেশিগুলো একটু খাটাতে রাজি থাকো, তবে আপেক্ষিকতার এই অদ্ভুত নতুন জগতে নিজেকে মানিয়ে নিতে তোমার কোনো অসুবিধাই হবে না!
আইনস্টাইন আমার আইনস্টাইন








Bengali (BD) ·
English (US) ·