আপনি ভোট না দিলে কী হবে?

১ মাস আগে
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের রায় দেবেন কোটি ভোটার। তবে উৎসবের এই আমেজে কোটি কোটি ভোটারের ভিড়ে অনেকের মনে একটি সুপ্ত প্রশ্ন উঁকি দিতে পারে, ‘আমার একটি ভোট না দিলে কী-ই বা হবে?’। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, একটি মাত্র ভোট শুধু ক্ষমতার পালাবদলই ঘটায় না বরং বদলে দিতে পারে ইতিহাস, গড়তে পারে একটি জাতির ভাগ্য।

২০০৮ সালে ভারতের রাজস্থান বিধানসভা নির্বাচনের একটি ঘটনা ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। কংগ্রেসের ভেতরে তখন একটি নাম ঘুরপাক খাচ্ছে— সি. পি. জোশি। শিক্ষিত, পরিচ্ছন্ন ইমেজ, সংগঠনে গ্রহণযোগ্য। ভোটের আগে থেকেই রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছিল, দল জিতলে মুখ্যমন্ত্রী হবেন তিনিই।


ভোট হলো। গণনা শেষে কর্মকর্তারা সংখ্যাটা বারবার মিলিয়ে নিলেন। তারপর ঘোষণা এলো- সি. পি. জোশি পান ৬২,২১৫ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী কল্যান সিং পান ৬২,২১৬। মাত্র এক ভোটে হেরে যান সিং!

 

এমন উদাহরণ ইতিহাসে অনেক আছে। ভোটের শক্তি কেবল সংখ্যায় নয়, এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সংসদ থেকে শুরু করে হোয়াইট হাউস কিংবা ফ্রান্সের পার্লামেন্ট- সবখানেই ‘এক ভোট’ বারবার বড় বড় পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে।

 

২০২৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮তম ডাকসু নির্বাচনে এস এম হল সংসদে সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে সৈয়দ ইয়ানাথ ইসলাম মাত্র ২ ভোটের ব্যবধানে শাহীন আলমের কাছে হেরে যান। শাহীনের প্রাপ্ত ভোট ছিল ১০২, আর ইয়ানাথের ১০০। মাত্র দুই ভোটে পাল্টে গিয়েছিল ফলাফল।

 

২০২১ সাল নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের মেম্বার পদে মো. মোসলেম উদ্দিন ৪৭৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছিলেন ৪৭২ ভোট। মাত্র ১ ভোটের এই ব্যবধান প্রমাণ করে, গণতন্ত্রে কোনো ভোটারই নগণ্য নন।

 

একই বছর চাঁদপুরের শাহরাস্তির টামটা উত্তর ইউনিয়নে দুই প্রার্থী সমান ভোট পাওয়ায় পুনরায় ভোটগ্রহণ করতে হয়েছিল। আবার বরিশালের উজিরপুরের বামরাইল ইউনিয়নে এক প্রার্থী মাত্র ২ ভোটে হেরে গিয়ে প্রতিটি ভোটের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে দেন।

 

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আরেকটি আলোচিত ঘটনা আছে। ১৯৯৯ ভারতীয় লোকসভায় আস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকার মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে (২৭২-২৭৩) পরাজিত হয়। এই একটি ভোটের অভাবে মাত্র ১৩ মাসেই পতন ঘটেছিল একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের।

 

আরও পড়ুন: জাতীয় নির্বাচন /কার পালে হাওয়া, কার কাঁধে ভরসা? জরিপগুলো কী বলছে

 

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া ২০১৭ সালে হাউস অব ডেলিগেটস নির্বাচনে শেলি সাইমন্ডস এবং ডেভিড ইয়ানসি সমান ভোট পান। শেষ পর্যন্ত একটি পাত্রে দুই প্রার্থীর নাম লিখে লটারির (বোল ড্র) মাধ্যমে ইয়ানসিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

 

২০০০ সালে ফ্লোরিডা রাজ্যে জর্জ ডব্লিউ বুশ মাত্র ৫৩৭ ভোটে জয়ী হন। কয়েক কোটি ভোটের বিপরীতে এই ৫৩৭ ভোট ছিল মোট ভোটের মাত্র ০.০১ শতাংশ। এই সামান্য ব্যবধানই বুশকে হোয়াইট হাউসে নিয়ে যায়। ১৯১০ সালে বাফেলোয় কংগ্রেসনাল নির্বাচনে চার্লস বি স্মিথ মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে ডি আলভা এস আলেকজান্ডারকে পরাজিত করেছিলেন।

 

কিছু ভোট কোনো ব্যক্তির জয়-পরাজয় নয়, বরং একটি জাতির রূপরেখা বদলে দিয়েছে। যেমন ফ্রান্স। ১৮৭৫ সালে ফ্রান্সে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবটি ফরাসি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে (৩৫৩-৩৫২) পাস হয়েছিল। সেই একটি ভোট না থাকলে ফ্রান্স হয়তো আজও রাজতন্ত্র থাকতো।

 

১৮৪৫ সালে টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্য করার প্রস্তাব মার্কিন সিনেটে মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়েছিল।

 

আরও পড়ুন: প্রথমবার ভোট দিচ্ছেন? ধাপে ধাপে জেনে নিন পুরো প্রক্রিয়া

 

এক নজরে ঐতিহাসিক ক্ষুদ্র ব্যবধানের পরিসংখ্যান

 

এলাকা/দেশবছরপ্রার্থীর নাম/ঘটনাব্যবধানফলাফল
ভারত (লোকসভা) ১৯৯৯ অটল বিহারী বাজপেয়ী ১ ভোট সরকার পতন
রাজস্থান, ভারত ২০০৮ সি পি জোশি ১ ভোট বিধানসভায় পরাজয়
নীলফামারী, বাংলাদেশ ২০২১ মোসলেম উদ্দিন ১ ভোট মেম্বার নির্বাচিত
ফ্রান্স ১৮৭৫ প্রজাতন্ত্র প্রস্তাব ১ ভোট প্রজাতন্ত্র ঘোষণা
এক্সিটার, যুক্তরাজ্য ১৯১০ হেনরি ডিউক ১ ভোট পার্লামেন্ট জয়
ফ্লোরিডা, ইউএসএ ২০০০ বুশ বনাম গোর ৫৩৭ ভোট বুশ প্রেসিডেন্ট
ভার্জিনিয়া, ইউএসএ ২০১৭ শেলি সাইমন্ডস টাই লটারিতে হার
ডাকসু (এস এম হল) ২০২৫ সৈয়দ ইয়ানাথ ইসলাম ২ ভোট এজিএস পদে হার

 

আপনিই নির্ধারণ করবেন আগামী পাঁচ বছর

 

উপরের ঘটনাগুলো এই বার্তা দেয় যে, গণতন্ত্রে কোনো ভোটারই অপ্রয়োজনীয় নয়। একটি ভোট যেমন একজন যোগ্য ব্যক্তিকে ক্ষমতায় বসাতে পারে, তেমনি একটি ছোট ভুল বা উদাসীনতা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে বিশাল শূন্যতা তৈরি করতে পারে। নির্বাচনে আপনার সেই একটি ভোটই হতে পারে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার চূড়ান্ত হাতিয়ার।

]]>
সম্পূর্ণ পড়ুন